বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১১

নওফেলের শান্তির বার্তা: অতীতের দায় কি এত সহজে মুছে যায়?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
নওফেলের শান্তির বার্তা: অতীতের দায় কি এত সহজে মুছে যায়?
ক্যাপশন :সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

একটি সুসংগঠিত সংবাদ সম্মেলন। সাবলীল, শুদ্ধ উচ্চারণের ইংরেজি বক্তৃতা। বিভাজন নয়—ঐক্য, সহিংসতা নয়—শান্তি, বিশৃঙ্খলা নয়—সুশৃঙ্খল ও মানবিক বাংলাদেশ। জনাব মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সাম্প্রতিক বক্তব্য শব্দের দিক থেকে প্রায় নিখুঁত। উপস্থাপনা পরিমিত, সুর গম্ভীর, আহ্বান আপাতদৃষ্টিতে দেশপ্রেমিক। একজন শ্রোতা হিসেবে কেউ হয়তো মুগ্ধ হতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শব্দগুলো কি বাস্তবতার কষ্টিপাথরে টিকবে?

৫ আগস্টের আগের সেই উত্তাল, রক্তাক্ত ও অস্থির দিনগুলোতে এই প্রজ্ঞা, এই সহনশীলতা, এই দূরদর্শিতা কোথায় ছিল? যে জাতীয় ঐক্যঅহিংসার কথা আজ এত সাবলীল ও আন্তর্জাতিক মানের ইংরেজিতে উচ্চারিত হচ্ছে, ক্ষমতার চূড়ান্ত উচ্চতায় থাকাকালীন তার ন্যূনতম চর্চা কি দেখা গিয়েছিল? উত্তর একদম স্পষ্ট—না। দেশ যখন গভীর গণঅসন্তোষ, ছাত্র-জনতার ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণের চরম অভাব ছিল। জনগণের মনের ভাষা পড়ার কোনো আন্তরিক চেষ্টাই করা হয়নি। বরং নিজেদের ক্ষমতা ও অবস্থান টিকিয়ে রাখার হিসাব-নিকাশই একমাত্র অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল। যদি সেই সংকটময় মুহূর্তে আজকের এই বক্তব্যের আলোকে বিভাজন এড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংলাপ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সত্যিই প্রাধান্য দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো দেশকে ৫ আগস্টের মতো চরম সামাজিক বিস্ফোরণ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতো না। আজকের শান্তির আহ্বান তখনকার নীরবতা ও অনমনীয়তাকে আরও তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

নওফেল সাহেবের নিজের রাজনৈতিক পথও এই প্রশ্ন থেকে মুক্ত নয়। তরুণ, সুশিক্ষিত ও আধুনিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তাঁকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, বাস্তব নীতি বাস্তবায়নে তার প্রতিফলন ছিল প্রায় বিপরীত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন জাতীয় কারিকুলাম পরিবর্তন, পাঠ্যপুস্তকে বিতর্কিত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তি এবং তড়িঘড়ি একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো দেশজুড়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করেছিল। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তোয়াক্কা না করে একমুখী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা তাঁর দূরদর্শিতাকে শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরবর্তীতে গণআন্দোলনের চরম মুহূর্তেও সাধারণ ছাত্র ও জনগণের আন্দোলনকে সঠিকভাবে অনুধাবন করার পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক অনমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। সেই অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক করে তোলে।

ক্ষমতা হারানোর পর, কিংবা সংকটজনক রাজনৈতিক বাঁকে দাঁড়িয়ে দূর থেকে এখন সাবলীল ভাষায় দেশাত্মবোধ ও মানবিকতার বয়ান তৈরি করা সহজ। কিন্তু এটি কি কেবল রাজনৈতিক আত্মপক্ষ সমর্থনভাবমূর্তি উদ্ধারের এক সুবিধাজনক প্রয়াস? সুভাষণ ও আন্তর্জাতিক ভাষার মেলবন্ধন রাজনৈতিক অঙ্গনে সাময়িক শোভা বর্ধন করতে পারে। কিন্তু অতীতের নীতিনির্ধারণী ভুল ও সিদ্ধান্তের দায় এড়িয়ে কোনো ভবিষ্যৎমুখী বার্তা জনগণের মনে গভীর ও স্থায়ী আস্থা তৈরি করতে পারে না। আজকের ইতিবাচক শব্দমালা যেন কেবল ক্ষমতাহীন রাজনীতির এক সুবিধাজনক ঢাল হয়ে না ওঠে—এই হিসাব জনগণ খুব ভালো করেই রাখে।

রাজনীতির মূল্যায়ন ঘটে না কোনো সুবিন্যস্ত বক্তব্যের অলংকারে। মূল্যায়ন ঘটে সংকটের মুহূর্তে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতির কষ্টিপাথরে। ইতিহাস কোনো নেতার অলংকারময় ভাষণে ভোলে না। ইতিহাস মনে রাখে—সংকটকালে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কাকে রক্ষা করেছিলেন, এবং জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কি না। আজকের শান্তির বার্তা যতই সাবলীল হোক, অতীতের সেই দায় এত সহজে মুছে যায় না।

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়