প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৯
এমন অভিযান তো বারবার প্রয়োজন

নদী শুধু জলপ্রবাহের নাম নয়; নদী একটি জনপদের প্রাণ, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম আধার এবং মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অথচ অপরিকল্পিত শিল্পবর্জ্য ও অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডে আমাদের নদীগুলো প্রতিনিয়ত দূষণের শিকার হচ্ছে। চাঁদপুর শহরের পুরান বাজার এলাকায় ডাকাতিয়া নদীতে ধানের তুষ, ছাই ও ধান সিদ্ধের গরম পানি ফেলে দূষণ সৃষ্টির দায়ে দুটি অটোরাইস মিলকে মোট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করার ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এমন অভিযান শুধু এক দিনের কার্যক্রম হয়ে থাকলে চলবে না; নদী বাঁচাতে এ ধরনের অভিযান বারবার প্রয়োজন।
২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত মেসার্স মনজিল অটো রাইস মিলকে ৫০ হাজার টাকা এবং মেসার্স নিউ মেঘনা অটোরাইস মিলকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। একই সঙ্গে নদীতে ফেলা বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং দূষণ বন্ধে মিল কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এর সংশ্লিষ্ট ধারা লঙ্ঘনের দায়ে নেওয়া এ ব্যবস্থা স্পষ্ট করে যে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার থাকলেও পরিবেশ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, নদীর মতো একটি প্রাকৃতিক সম্পদকে বর্জ্য ফেলার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা কেন বন্ধ হচ্ছে না? উৎপাদন ও মুনাফার স্বার্থে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নদীতে তুষ, ছাই কিংবা অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলে, তবে তার ক্ষতির বোঝা শুধু নদীকে বহন করতে হয় না; ভুক্তভোগী হয় আশপাশের মানুষ, জলজ প্রাণী এবং সামগ্রিক পরিবেশ। নদীর পানি দূষিত হলে জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়, পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। নদী ভরাট ও দূষণের পরিণতি একসময় গোটা জনপদকেই ভোগ করতে হয়।
এ বাস্তবতায় শুধু জরিমানা আদায় করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। জরিমানা অপরাধের জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তি হলেও দূষণ বন্ধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মিলগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কি না, নদীতে পুনরায় বর্জ্য ফেলছে কি না এবং প্রশাসনের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাধ্য করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি নির্দেশনা ও সচেতনতাও নিশ্চিত করা জরুরি।
ডাকাতিয়া নদী চাঁদপুরের পরিবেশ ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ নদীকে দূষণমুক্ত রাখা কোনো একক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; প্রশাসন, শিল্পমালিক, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশকর্মী—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নাগরিকদেরও নদীতে বর্জ্য ফেলা বা দূষণের ঘটনা দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অন্যদিকে প্রশাসনকে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
আমরা মনে করি, পরিবেশ রক্ষায় লোকদেখানো তৎপরতা নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। একটি নদীকে দূষণমুক্ত রাখা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাই চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীসহ দেশের অন্যান্য নদী ও জলাশয় রক্ষায় এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে। জরিমানার বার্তা যেন শুধু দুটি অটোরাইস মিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে—পরিবেশ দূষণ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। তাই এমন অভিযান শুধু প্রয়োজনীয় নয়, বরং নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এটি হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ এবং আপসহীন।






