শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯

এ হুঁশিয়ারি কার্যকর হোক শতভাগ

অনলাইন ডেস্ক
এ হুঁশিয়ারি কার্যকর হোক শতভাগ

ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় মাছ নয়, এটি আমাদের নদী, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার বন্ধ রাখা কেবল সরকারি নির্দেশনা নয়—এটি ভবিষ্যৎ ইলিশ সম্পদ রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসন এবার মা ইলিশ সংরক্ষণে যে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার করলে কমপক্ষে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং নিবন্ধিত জেলে কার্ড বাতিলের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতে নজরদারি, খালের মুখ বন্ধ, বরফকলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, চেকপোস্ট ও কুইক রেসপন্স টিম গঠনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কতোটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন মূল বিষয়।

কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শুধু প্রশাসনের অভিযান দিয়ে মা ইলিশ রক্ষা করা কঠিন। নদীতে জাল ফেলা একজন জেলেকে আটক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এর পেছনে থাকা অবৈধ জাল সরবরাহকারী, মাছ পরিবহনকারী, মজুদদার ও ক্রেতা-বিক্রেতার বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করতে না পারে—এ নিশ্চয়তাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রশাসনের ওপর কোনো ধরনের অনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে বরং নিজ এলাকার জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতা-কর্মী ও জনগণকে মা ইলিশ রক্ষায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে পারেন। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বও কম নয়। কোন্ এলাকায় কারা নদীতে যায়, কোথায় অবৈধ জাল মজুদ হয় কিংবা কারা নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে মাছ কেনাবেচা করে—এসব বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাস্তব জ্ঞান প্রশাসনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাও এখানে বিশেষভাবে প্রয়োজন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কাউকে ছাড়িয়ে নেওয়া, অভিযানে বাধা দেওয়া কিংবা অবৈধ মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হলে প্রশাসনের সব উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের উচিত প্রকাশ্যে ও কার্যকরভাবে ঘোষণা করা—মা ইলিশ রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচ্য হবে না।

তবে শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার সময়ে চাঁদপুরের ৪১ হাজার ৩৯০ জন নিবন্ধিত জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ঋণের কিস্তির চাপ থেকে জেলেদের সুরক্ষা এবং বিকল্প আয়-রোজগারের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একজন জেলে যাতে ক্ষুধার তাড়নায় আইন ভাঙতে বাধ্য না হন, সেটিও প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ।

মা ইলিশ রক্ষায় আইন হবে কঠোর, কিন্তু প্রয়োগ হবে নিরপেক্ষ—এটাই হওয়া উচিত এবারের অভিযানের মূলনীতি। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণ—সব পক্ষের সম্মিলিত সদিচ্ছা ছাড়া এই অভিযান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না।

চাঁদপুরকে ‘ইলিশের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত রাখতে হলে আজকের মা ইলিশকে বাঁচাতেই হবে। তাই জেলা প্রশাসনের দেওয়া হুঁশিয়ারি যেন শুধু সভার বক্তব্য হয়ে না থাকে। আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রভাবশালী হলেও ছাড় দেওয়া যাবে না, আবার অসহায় জেলের মানবিক প্রয়োজনও উপেক্ষা করা যাবে না। সবার দায়িত্বশীল সহযোগিতায় এবারের অভিযান হোক দৃশ্যমানভাবে সফল। মা ইলিশ রক্ষার প্রাগুক্ত হুঁশিয়ারি কার্যকর হোক শতভাগ—কথায় নয়, কাজে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়