বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৪

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬

দীর্ঘায়ুর যুগে জীবনকে নতুন করে ভাবি

হাসান আলী
দীর্ঘায়ুর যুগে জীবনকে নতুন করে ভাবি

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। ইংরেজিতে বলা হয়েছে, “The Age of Longevity : Rethinking Systems for Longer Life.” প্রতিপাদ্যটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—মানুষ যখন আগের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে, তখন সেই দীর্ঘ জীবনকে কীভাবে সক্রিয়, মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করে তোলা যায়?

বাংলাদেশেও এ প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ ইতোমধ্যে প্রবীণ জীবনে প্রবেশ করেছেন। প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষকে নিয়ে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের প্রবীণ সমাজের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। প্রবীণদের জন্য সরকারি সহায়তা, ভাতা, চিকিৎসা ও অন্যান্য কর্মসূচি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু এতো বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘ জীবনের সব দায়িত্ব রাষ্ট্রের একার পক্ষে বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ।

আমরা সাধারণত বার্ধক্যের প্রস্তুতি বলতে অর্থনৈতিক প্রস্তুতিকেই বেশি বুঝি। চাকরি শেষে কতো টাকা থাকবে, বাড়ি থাকবে কি না, সন্তানেরা দেখবে কি না—এসব নিয়ে চিন্তা করি। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু অর্থসম্পদ সঞ্চয় করলেই বার্ধক্য শান্তিপূর্ণ হবে—এ ধারণা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ বার্ধক্যের প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়; প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, নিরাপদ বাসস্থান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, আত্মসম্মান এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ।

বার্ধক্যকে তাই জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে না দেখে দীর্ঘ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে ভাবতে হবে। বার্ধক্য কোনো শাস্তি নয়; এটি দীর্ঘ জীবনযাত্রার অর্জন। একজন মানুষ যখন ষাট, সত্তর, আশি বা তারও বেশি বয়সে পৌঁছান, তখন তিনি শুধু বয়সের ভার বহন করেন না—সঙ্গে বহন করেন জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, স্মৃতি ও অর্জন। এই অর্জনকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করাও সমাজের দায়িত্ব।

কিন্তু সক্রিয় ও স্বস্তিদায়ক বার্ধক্যের প্রস্তুতি হঠাৎ ষাট বছর বয়সে শুরু করা যায় না। এর প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত জীবনের শুরু থেকেই। মায়ের গর্ভে আসার পর শিশুর সুস্থ বিকাশ, ভালো পুষ্টি, নিরাপদ শৈশব, আনন্দময় কৈশোর, সুশৃঙ্খল যৌবন—সবকিছুই ভবিষ্যতের বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুস্থ শিশু ও কিশোর ভবিষ্যতে সুস্থ যুবক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়; সুস্থ ও সুশৃঙ্খল যৌবন পরবর্তী জীবনে বার্ধক্যের নানা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

তাই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়তে হলে শুধু প্রবীণদের নিয়ে চিন্তা করলেই হবে না; পুরো জীবনচক্রকে সামনে রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। কর্মজীবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা—এসবকে জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি বিষয় আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। প্রায় দুই কোটি প্রবীণকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক সেবা, আবাসন, চিকিৎসা, ওষুধ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার আওতায় আনতে হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি হবে। ফলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কমে যায় না; বরং রাষ্ট্রকে আরও পরিকল্পিতভাবে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণবান্ধব পরিবহন, আইনগত সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও ব্যক্তিকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

পরিবার প্রবীণের প্রথম আশ্রয়। কিন্তু পরিবর্তিত জীবনযাত্রায় অনেক প্রবীণ একাকিত্ব, অবহেলা ও মানসিক দূরত্বের শিকার হচ্ছেন। তাই প্রবীণদের শুধু খাওয়ানো বা ওষুধ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাদের সঙ্গে কথা বলা, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখাও প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, বার্ধক্যের প্রস্তুতি ব্যক্তিকেই নিতে হবে। নিজের স্বাস্থ্য, অর্থ, বাসস্থান, সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিচর্যার বিষয়ে যত আগে ভাবা যায়, ততই ভালো। কারণ জীবনের শেষ পর্বে কষ্ট, অসুস্থতা, একাকিত্ব বা অপমানের বাস্তবতা অনেক সময় ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়।

দীর্ঘ জীবন আমাদের জন্য একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই দীর্ঘ জীবনকে শুধু দীর্ঘায়ু নয়; সুস্থায়ু, কর্মময়তা, মর্যাদা ও স্বস্তির জীবন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে, সরকার সহায়তা দেবে, সমাজ পাশে দাঁড়াবে, পরিবার যত্ন নেবে—আর ব্যক্তি নিজেও প্রস্তুতি নেবেন। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই দীর্ঘ জীবনের যাত্রা সুন্দর হতে পারে।

অতএব, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ আমাদের শুধু প্রবীণদের কথা ভাবতে বলছে না; এটি আমাদের প্রত্যেককে নিজের ভবিষ্যৎ বার্ধক্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ আজকের শিশু, কিশোর ও তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। বার্ধক্যের প্রস্তুতি আসলে জীবনেরই প্রস্তুতি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়