প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬
পাদপ্রদীপের অন্ধকারের অধিবাসী ‘নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার’

প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি পাদপ্রদীপের পেছনেও রয়েছে অন্ধকার। কিন্তু পাদপ্রদীপের আলোয় যে বা যারা উদ্ভাসিত হয়, তাদের আলোকিত বা দৃশ্যমান করতে কাজ করতে হয় কাউকে না কাউকে। সেই অন্ধকারের এক অধিবাসীকে ছাপা শিল্পের দ্রুতিতে আলোকিত করতেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই প্রচেষ্টা সেই অন্ধকারের নাট্য-অভিযাত্রীকে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে চিহ্নায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
আমাদের আজকের সেই আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলেন ‘নাট্যসন্ত’ জিয়া হায়দার। যার সাধনার আপ্তফল হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশের সামগ্রিক নাট্যাঙ্গন, নাট্যশিল্প আর নাট্যামোদী জনগণ। তিনি সত্যিকার অর্থেই পাদপ্রদীপের অন্ধকারের অধিবাসী। গহীন অন্ধকারের নিবাসী এই নাট্যসন্ত তঁার অকৃত্রিম অনুসন্ধিৎসা দিয়ে বিশ্বনাট্যের গতি, প্রকৃতি ও বিবর্তনের পরম্পরা বাংলা ভাষায় গ্রন্থনা করে আমৃত্যু আমাদের নাট্যতৃষ্ণা মিটিয়েছেন।
মৃত্যুর পূর্বে সারা জীবনের আর্থিক সঞ্চয় তিনি উইলের মাধ্যমে দেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়Ñঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিষয়ক বিভাগকে দান করে গেছেন। যার লভ্যাংশ দিয়ে প্রতি বছর দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থীকে তঁার মাতার নামে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। অথচ তিনি শিক্ষকতা করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন এই সুযোগটি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রাখলেন না, কোন অভিমান বা অতৃপ্তি তঁাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছিল, তা গবেষণার দাবি রাখে।
যে কারণে তঁাকে অন্ধকারের অধিবাসী বলে চিহ্নিত করতে চাইছি তা হলোÑতিনি জীবদ্দশায় কখনো তঁার অগ্রগণ্য নাট্যক্রিয়ার জন্য স্বীকৃতির অভিপ্সা লালন করতেন না। কিন্তু তাই বলে তঁার নির্লিপ্ততার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি তঁাকে আমাদের নাট্য-ইতিহাসের পাতা থেকেই মুছে ফেলার মতো ন্যাক্কারজনক অপচেষ্টা চালায়, তবে সেটিকে সমর্থন দেওয়া বা এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করাটাও অন্যায় বলে বিবেচিত হবে। সেই নীরবতা ভাঙতেই আমার এই কলম ধরা। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক নাট্যসত্যের পক্ষেই আমার দৃঢ় অবস্থান।
দেশের স্বনামখ্যাত দৈনিক সমকালের স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় ‘পাদপ্রদীপের আলোয় দেখা ৪০ বছর’ শিরোনামের লেখায় এমনই একটি অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। এই লেখার প্রতিবাদ করতে দেখিনি বাংলাদেশের কোনো নাট্যজনকে, যা সত্যিই হতাশাজনক। লেখক ইউসুফ হাসান অর্কের মিথ্যাচারের প্রতি সারাদেশের সর্বস্তরের নাট্যজন ও নাট্যামোদীদের এই নীরবতা ইতিহাসের কাঠগড়ায় নেতিবাচক হিসেবেই স্থান পাবে। আমার পাঠানো পাঠক-প্রতিক্রিয়াটিও ‘সমকাল’-এ আলোর মুখ দেখেনি বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ইউসুফ হাসান অর্কের লেখাটি পাঠের পর দেশের অনেক প্রতিভাবান নাট্যজনকে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে ও ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তুলে ধরেছি; কিন্তু এ প্রসঙ্গের সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। লেখাটিতে লেখক অর্ক ৪০ বছরের নাট্যচর্চার পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের নাট্য-ইতিহাসের কোনো মাধ্যমেই ‘নাট্যসন্ত’ জিয়া হায়দারকে অবলোকন করেননি। হয়তো তিনি সচেতনভাবেই তা করতে চাননি। সচেতনভাবে এই কারণে বলছিÑজনাব অর্ক যে দৃষ্টিতে পাদপ্রদীপের আলোকিত পিঠ অবলোকন করেছেন, সেই দৃষ্টিতে শুধু প্রদীপশিখার দ্বারা আলোকিত অংশই চিত্রায়িত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার হচ্ছেন সেই প্রদীপশিখা, যে শিখা শত দুর্যোগেও নির্লিপ্তভাবে কেবল সংশ্লিষ্টদের আলোকিত করে যায়। আর সে কারণেই নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার ও তঁার নাট্যযজ্ঞ লেখক অর্কের মতো অনেকের কাছেই নেপথ্যের বিস্মৃত নাট্যশ্রম।
প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার সূতিকাগার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শিক্ষাবর্ষ থেকে স্বতন্ত্রভাবে একটি নাট্যকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার ছিলেন যার স্বপ্নদ্রষ্টা। যখন দেখি সেই নাট্যকলা বিভাগের পক্ষ থেকে এই তথাকথিত লেখার বিপরীতে কোনো উচ্যবাচ্য নেই, তখনই হতাশায় নিমজ্জিত হই। যে বিভাগ তার অতীত ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন মনে করে না, তারা প্রকারান্তরে নিজেদের শিকড়কেই অস্বীকার করছে। শিকড়হীন বৃক্ষ কখনো মহীরুহ হতে পারে না। এর দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে, কারণ ইতিহাস বড়ই নির্মম।
বাংলাদেশের নাট্য-ইতিহাসে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের অবদান ও ভূমিকাকে যারা আড়াল বা অন্তরীণ রাখতে চায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার পাদপ্রদীপের অন্ধকারের অধিবাসী হিসেবে যে ব্যক্তিত্ব ধারণ করে আছেন, তা অনেকের মতো ইউসুফ হাসান অর্ককেও ঈর্ষান্বিত করেছে মাত্র।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক জনাব অর্ক তঁার সেই লেখায় দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার গোড়াপত্তনকারী বিভাগ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগকে উল্লেখ করেছেন, যা অসত্য। প্রকৃত সত্য হচ্ছেÑনাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের নেতৃত্বেই স্বাধীনতার পূর্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নাট্যসাহিত্যের পাঠদানের মাধ্যমে নাট্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের সূচনা হয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-উত্তরকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একটি শাখা হিসেবে নাট্যকলা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালু হয়। পর্যায়ক্রমে ১৯৮৬ সালে এমএফএ কোর্স, ১৯৯১ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৯৪ সালে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) কোর্স চালু হয়েছিল নাট্যকলায় একাডেমিক শিক্ষা প্রদানের মধ্য দিয়ে।
চারুকলা বিভাগের তৎকালীন নাট্যকলা শাখার ১ম ব্যাচের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারী শিক্ষার্থী আলী আহমেদ মুকুল বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চ-পরিকল্পক হিসেবে কর্মরত আছেন। অপরদিকে, চারুকলা বিভাগের অধুনালুপ্ত নাট্যকলা শাখার শেষ ব্যাচের শিক্ষার্থী সুধীর মহাজন বর্তমানে দেশ টিভিতে নিয়মিত প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া নাট্যকলায় এমএফএ কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থী জোবায়দুর রশীদ বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিচালিত নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। যত দূর জানি, ১৯৮৫ সালে নাট্যকলায় এমএ কোর্সের ১ম ব্যাচে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন ড. জামিল আহমেদসহ দেশের প্রখ্যাত অনেক নাট্যজন। যদিও বিশ্বনাট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষক ও বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে কর্মরত ড. জামিল আহমেদ রহস্যজনক কারণে সে সময় চারুকলা বিভাগ কর্তৃক ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
আলোচ্য চারুকলা বিভাগস্থ নাট্যকলা শাখার নিরবচ্ছিন্ন নাট্যশিক্ষক জিয়া হায়দারের স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র নাট্যকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা। যার জন্য তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু চারুকলা বিভাগের অপরাপর শাখার শিক্ষকদের অসহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব মৌলবাদী রাজনৈতিক ভাবধারা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে তিনি তঁার কর্মকালীন সময়ে তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হননি।
যে কারণে এই আলোচনার সূত্রপাত তা হলোÑজনাব অর্ক তঁার লেখায় প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার অগ্রপথিক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগকে উল্লেখ করেছেন। সম্মানিত নাট্যামোদী পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নেতৃত্বে যখন ১৯৮৬ সালে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ চালু করার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পাঠ কক্ষ দখল করা হয়েছিল, তখন তার সপক্ষে একজন নগণ্য নাট্যকর্মী হিসেবে স্থানীয় নাট্যকর্মী, নাট্যজন ও শিল্প-সাহিত্যকর্মীদের সাথে চারুকলা বিভাগের তৎকালীন নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমিও চট্টগ্রামে আয়োজিত মানববন্ধনে যোগদান করেছিলাম। তাহলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার সূচনা হলো কীভাবে?
‘পাদপ্রদীপের আলোয় দেখা’ লেখায় লেখক অর্ক শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার ইতিহাস নিয়েই মিথ্যাচার করে ক্ষান্ত হননি; তিনি কৌশলে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের নাম তঁার লেখায় একটিবারের জন্যও উল্লেখ করেননি। অথচ নাট্য রচয়িতা, বিদেশি নাটকের অনুবাদক, রূপান্তরক এবং বিশ্বনাট্যের ধারাবাহিক ইতিহাসনির্ভর ‘থিয়েটারের কথা’-র পঁাচটি খণ্ডসহ নাট্যতত্ত্ব ও নাট্যবিশ্লেষণ নিয়ে প্রায় ৫০টি নাট্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি। যা না পড়ে জনাব অর্ক নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন বলে অন্তত আমার মনে হয় না। তবে কেন এই নাট্যসন্ত জনাব অর্কের লেখায় অনুল্লেখ রয়ে গেলেন?
নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার নাট্যরাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে বরাবরই নাট্যসাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। স্বাধীনতা-পূর্বকালে (১৯৬৪ সালে) তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি নাট্যকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বৈদেশিক বৃত্তিতে নাট্যকলার পাঠ গ্রহণের এই সুযোগের নির্বাচন পরীক্ষায় আমাদের গর্ব, বিশ্বনাট্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব (আইটিআই বিশ্ব কংগ্রেসের সভাপতি) ও নাট্যবিষয়ক পত্রিকা ‘থিয়েটার’-এর সম্পাদক রামেন্দু মজুমদারসহ আরও অনেকেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারই চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছিলেন।
নাট্যকলায় বিদেশ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তৎকালীন অগ্রগণ্য কবি জিয়া হায়দার দেশে ফিরে যোগদান করেন তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনে এবং সমমনাদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালে ঢাকায় ‘বাকি ইতিহাস’ নাটক প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দর্শনীর বিনিময়ে যে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল, তারও নেপথ্য পুরুষ নাট্যজন জিয়া হায়দার। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে নাগরিকের সাথে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের বিচ্ছিন্নতা নাট্য-ইতিহাসের একটি অংশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষক হিসেবে অবস্থানকালে, বর্তমানে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সাথে নিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি চট্টগ্রাম শহরে গড়ে তোলেন ‘থিয়েটার ৭৩’ নামের নাট্য সংগঠনটি। যে গঠনপ্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হক ও ড. মনিরুজ্জামান।
আমৃত্যু নাটকের বিভিন্ন শাখায় কাজ করে তিনি বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার প্রসারে যে শুধু অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তা নয়; রচনা, প্রযোজনা, নির্দেশনা ও নাট্য সংগঠন গড়ে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তথাপি নাট্যসন্ত জিয়া হায়দার কেন লেখক অর্কের দৃষ্টিতে বিগত ৪০ বছরের নাট্য-ইতিহাসের কোনো মাধ্যমেই ধরাছেঁায়ার বাইরে রয়ে গেলেন, তা বোধগম্য নয়।
মনে হচ্ছে, জনাব অর্ক নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের নামই শোনেননি! কী আশ্চর্য! অথচ তিনি নাট্যকলার শিক্ষার্থী হিসেবে রেফারেন্স বই হিসেবে নিজে পড়ে এসেছেন এবং বর্তমানে শিক্ষক হিসেবে নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের প্রয়াত জিয়া হায়দার রচিত বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত নাট্যতত্ত্বের বইগুলো অনুসরণ করেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জনাব অর্ক আদিষ্ট হয়েই এই নাট্য-ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি তঁার লেখায় বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যতত্ত্ব বিভাগকে প্রথম হিসেবে উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষা আরম্ভের ক্ষেত্রে ৩য় স্থান উল্লেখ করেছেন। তা কোন বিবেচনায় করেছেন, তা-ও বোধগম্য নয়। আরও উল্লেখ করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যগুলোর অবস্থান কোথায়? মোদ্দাকথা, জনাব অর্ক নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারকে বাংলাদেশের নাট্য-ইতিহাসের ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করতে গিয়ে যে চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন, তাকে প্রতিষ্ঠা দিতেই এই উদ্ভট কৌশলের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ যেনÑ “দ্বার বন্ধ করে ভ্রমটারে রুখি / সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি।”
পূর্বপুরুষের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেওয়ার যে লুকোচুরি খেলায় অর্ক নিপতিত হয়েছেন, যে নাট্যাচার্যের তত্ত্বাবধানে নিজের নাট্যমানস গড়ে তুলেছেন; সেই নাট্যপ্রাণ মহান পুরুষের নাট্যদর্শন সৃষ্টিতেও ছিল নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের প্রণিধানযোগ্য ভূমিকা। তাই তো ৮০-র দশকে প্রিয় নাট্যকার সেলিম আল দীনকে দেখেছি নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের চট্টগ্রামের বাসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে।
৬০-এর দশকের অন্যতম প্রধান কবি, পাবনার সন্তান জিয়া হায়দার চর্যাপদের পংক্তিতে ও মধ্যযুগের সাহিত্যের পরতে পরতে বাংলা নাট্যের যে শিকড় লুকায়িত ছিলÑতাকে যথাযথ পরিচর্যা দিয়ে, সুগৃহীত করে আমাদের নাট্যঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন ‘দ্বৈত-দ্বৈতবাদী’ শিল্পশৈলীর প্রবক্তা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনকে। যে পথে হেঁটে নাট্যাচার্য আমাদের নাট্য-ইতিহাসকে আগ্রাসনবাদী সংস্কৃতির পরাকাষ্ঠা থেকে মুক্তি দিয়েছেন; আমরা পেয়েছি স্বকীয় নাট্যাভিনয়, নাট্যরচনারীতি আর ঐতিহ্যপূর্ণ বাংলা নাট্যধারা।
সেই নাট্যাচার্যের উত্তরসূরি হিসেবে জনাব অর্ক কীভাবে, কী কারণে বা কোন্ স্বার্থ সংরক্ষণের অভিপ্রায়ে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারকে বাংলাদেশের নাট্য-ইতিহাস থেকে উপড়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়েছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। আশা করি, জনাব অর্ক ইতিহাস বিকৃতির যে চোরাবালিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন, তা থেকে মুক্ত হয়ে নাট্যসত্য আবিষ্কারে ব্রতী হবেন। অন্যথায় নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের অতৃপ্ত আত্মা আপনাকে ক্ষমা করবে না; আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে পড়বে বিকৃত নাট্য-ইতিহাসের পথযাত্রী।
পাদপ্রদীপের অন্ধকারের অধিবাসী হিসেবে নাট্যসন্ত জিয়া হায়দারের যেসকল নাট্যসৃষ্টি অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়নি, তা প্রকাশ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে আমাদের নাট্যবিশ্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য সরকার, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিনীত অনুরোধ জানিয়ে ইতি টানছি।
মোস্তফা কামাল যাত্রা : দল সমন্বয়ক, নাট্যাধার।






