প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫৬
হুজুর (দঃ) ভূমিষ্ট হলেন কীভাবে?

আল্লাহর প্রিয় হাবীব (দঃ) পিতা-মাতার মাধ্যমে নূর হিসেবেই দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু তঁার আগমনের ধরণ ছিল ভিন্ন রকম। সাধারণত মায়েরা গর্ভকালীন ব্যথা অনুভব করে থাকেন এবং প্রসবকালীন সময়ে প্রচণ্ড কষ্ট ও যন্ত্রণা অনুভব করে থাকেন। কিন্তু বিবি আমেনা (রাঃ) গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়ে কোনো ওজন অথবা ব্যথা-বেদনা কিছুই অনুভব করেননি। অন্যান্য মায়েদের প্রসবকালীন সময়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু নবীজীর মায়ের এ অবস্থা ছিল না। বরং তঁার থেকে বের হয়েছিল একটি নূর, যা মক্কাভূমি থেকে সিরিয়া পর্যন্ত আলোকিত করেছিল। সে নূর ছিল নবী করিম (দঃ)-এঁর নূর মোবারক।
অন্যান্য সন্তান মায়ের নাভির মাধ্যমে গর্ভে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে এবং ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাদের নাভি কাটা হয়। কিন্তু নবী করিম (দঃ) পবিত্র মায়ের নাভির সাথে যুক্ত ছিলেন না-বরং নাভি কর্তিত অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান রক্তমাখা অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়, কিন্তু নবী করীম (দঃ) পবিত্র অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান উলঙ্গ ও খতনাবিহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে-কিন্তু নবী করিম (দঃ) বেহেশতী লেবাছ পরিহিত, সুরমা মাখা চোখ ও খতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন।
নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেছেন-”আনাস (রাদ্বিয়ালাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (দঃ) বলেছেন, আল্লাহ জাল্লা জালালুহু’র পক্ষ থেকে আমার মু’জিজা হলো আমি খৎনা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং জন্মকালে কেউ আমার ছতর দেখে নি।” (বেদায়াও নেহায়া, ২য় খন্ড, ২৬১ পৃষ্ঠা, পুরাতন ছাপা।)
মাদারিজুন নবুয়ত কিতাবে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। অন্যান্য সন্তান ভূমিষ্ট হয়ে ওয়ঁা ওয়ঁা (হুয়া) করে চিৎকার দেয়। কিন্তু নবী করিম (দঃ) ভূমিষ্ট হয়েই প্রথমে সিজদা করেন এবং পরে শুদ্ধ আরবি ভাষায় ”আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নী রাসুলুল্লাহ” কালেমা শরীফ পাঠ করেছিলেন। (আল্লামা দিয়ার বিকরীর তারিখুল খামিছ ও সুয়ূতীর খাছায়েছে কুবরা)।
সুতরাং নবী করিম (দঃ)-এঁর ভূমিষ্ট হওয়ার প্রকৃতি ভিন্ন ধরনের হওয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করতে পারেন।
আল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ)কে পিতামাতা ছাড়াই সরাসরি পয়দা করেছেন। একজনকে মাটি দিয়ে, অন্যজনকে বাম পঁাজরের হঁাড় দিয়ে। হযরত ঈসা (আঃ)কে পিতার বীর্য ছাড়া শুধু রুহ দিয়ে বিবি মরিয়মের গর্ভে পয়দা করেছেন। সাধারণ মানুষ পয়দা হয় পিতা-মাতার নুৎফা বা বীর্য থেকে, সরাসরি মাটি থেকে নয়। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী (দঃ)-কে আল্লাহ পয়দা করেছেন নূর দ্বারা। এই নূর কোন্ পদ্ধতিতে পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে গেলেন এবং কোন্ পদ্ধতিতে মায়ের গর্ভ হতে দুনিয়াতে পদার্পণ করলেন তা গবেষণার বিষয় নয় বরং কুদরতের উপর বিশ্বাস স্থাপনই এর একমাত্র সমাধান।
মাওলানা আব্দুল আউয়ান জৌনপুরীর ফতোয়া:
এবার আসুন, এ ব্যাপারে ওলামাগণের মতামত কী-তা আলোচনা করি। হাদীয়ে বাঙ্গাল ও আসাম নামে পরিচিত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেবের সাহেবজাদা মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব আরবিতে একখানা কিতাব রচনা করেছেন। উক্ত কিতাবের নাম-”নবী করিম (দঃ)-এঁর বেলাদত শরীফের ধরণ সম্পর্কে উত্তম রেওয়ায়াত ও দলীল।”
উক্ত কিতাবে তিনি কয়েকখানা বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের এবারত উদ্ধৃত করে অবশেষে নিজের মতামত বা ফতোয়া প্রদান করেছেন। আমরা উক্ত কিতাবের ফতোয়ার এবারত হুবহু পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি। উক্ত কিতাবের ফটোকপি অধম লেখকের নিকট সংরক্ষিত আছে। কিতাবের এবারত নিম্নরূপঃ-
অর্থঃ-”আল্লামা আবদুল্লাহ শাবরাভী শাফেয়ী (রাঃ) স্বীয় ‘আল আতহাফ বিহুব্বিল আশরাফ’- গ্রন্থে নবী করিম (দঃ)-এঁর পবিত্র দেহ থেকে বহির্গত যাবতীয় বর্জ ্য বস্তুর পবিত্রতা শীর্ষক আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা তিলিমসানী কর্তৃক একটি ফতোয়ার উল্লেখ করে বলেন- উক্ত আল্লামা তিলিমসানী ফতোয়া দিয়েছেন যে, ”আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ব্যতীত প্রত্যেক মানব সন্তান মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ট হয়ে থাকে। অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ভূমিষ্ট হয়েছেন মায়ের নাভি ও প্রস্রাবের রাস্তার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) ভূমিষ্ট হয়েছেন বিবি আমেনার (রাঃ) বাম উরুদেশ দিয়ে-যা বাম পঁাজরের হঁাড়ের নিচে অবস্থিত। তারপর উক্ত স্থান সাথে সাথেই জোড়া লেগে যায়। এই বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ভূমিষ্ট হওয়া নবী করিম (দঃ)-এঁর একক বৈশিষ্ট্য। কোনো নবী (আঃ) মায়ের প্রস্রাবের স্থান দিয়ে ভূমিষ্ট হওয়ার বর্ণনাটি সঠিক নয়। এ কারণেই মালেকী মাযহাবের মুফতী ও উলামাগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে, ”যে ব্যক্তি বলবে-নবী করিম (দঃ) মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ট হয়েছেন, তাকে কতল করা ওয়াজিব” (উমদাতুন নুকুল ফী কাইফিয়াতে বিলাদাতির রাসূল-মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী এবং মূল গ্রন্থ আল আতহাফ বি-হুব্বিল আশরাফ- আল্লামা শাবরাভী)। (চলবে) সূত্র : সূত্র : নূরনবী। লেখক : অধ্যক্ষ এমএ জলিল (র.)।








