প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩৯
চাঁদপুরে ৮ জুলাই প্রথম কবি কাজী নজরুল ইসলাম আসেন

‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’দেশের অন্যতম কৃষিভিত্তিক জেলা। মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া ও মেঘনা ধনাগোদা নদী বিধৌত চাঁদপুর জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। চাঁদপুর রেলস্টেশন ও নৌ-পথের কারণে চাঁদপুরকে একসময় বলা হতো প্রাচ্যের অন্যতম সিংহদ্বার। নৌ-বন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, ইতিহাস, ঐতিহ্যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ চাঁদপুরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তিন-তিনবারই এসেছেন। তিনি কলকাতা থেকে এসে চাঁদপুর হয়ে দেশের তিনি বিভিন্ন জেলা শহরে সফর করেন। সর্বপ্রথম ১৯২১ সালের ৮ জুলাই অল্প সময়ের জন্যে কুমিল্লা থেকে লাকসাম হয়ে চাঁদপুরে আসেন আমাদের প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এদিকে ১৯২১ সালের ১৭ জুন দৌলতপুরের আলী আকবর খানের ভাগ্নি নার্গিসের সাথে নজরুলের বিয়ে সম্পন্ন হয় । দুর্ভাগ্যবশত কথা কাটাকাটির পর ঐ রাতেই কবি নজরুল প্রমীলার মা গিরিবালাসহ বরযাত্রী সবাই রাতেই পায়ে হেঁটে কুমিল্লার কান্দিরপাড় আসেন। আর কবি নজরুল প্রমীলার জেঠির ঘরে উঠেন। ক’দিন পর তিনি তার বর্তমান অবস্থা সংক্ষিপ্ত পোস্টকার্ডে পরম বন্ধু মোজাফ্ফর আহমেদকে লিখেন। ঐ চিঠি পেয়ে বন্ধু মোজাফ্ফর আহমেদ কুমিল্লা চলে আসেন। আসার পর রেলে চাঁদপুর হয়ে গোয়ালন্দ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে কলকাতা আসার সিদ্ধান্ত নেন। যার ফলেই বন্ধু মোজাফ্ফর আহমেদ ও কবি নজরুল ট্রেনে লাকসাম হয়ে চাঁঁদপুর নেী-বন্দর আসেন। বর্তমান চাঁদপুর প্রধান ডাকঘরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ডাক-বাংলোয় তিনি তখন অবস্থান করেন বলে জানা যায় ।
|আরো খবর
পরবর্তীতে দ্বিতীয়বার ১৯২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের মিজোরাম থেকে কুলাউড়া দিয়ে ট্রেনযোগে প্রিয় কবি নজরুল চাঁদপুর আসেন। সম্ভবত ট্রেনের অনিয়মিত সময়সূচির কারণে চাঁদপুর থেকে গোয়ালন্দগামী স্টীমারটি অনেক আগেই চাঁদপুর ছেড়ে চলে যায়।যার ফলে ঐ রাতে চাঁদপুরের বর্তমান প্রধান ডাকঘরের দক্ষিণ পাশের ডাকবাংলোতে রাত্রিযাপন করেন। পরের দিন হাতে পর্যাপ্ত ভাড়ার টাকা না থাকায় টেলিগ্রাম অফিস থেকে কলকাতায় সংবাদ প্রেরণ করেন। ৯ জুলাই পুনরায় চাঁদপুর থেকে বিকেলে স্টীমারে গোয়ালন্দ চলে আসেন । তৃতীয়বার ১৯২৮ সালে কবি নজরুল গোয়ালন্দ থেকে স্টীমার যোগে চাঁদপুর আসেন এবং চাঁদপুর থেকে ট্রেনে সিলেটে চলে যান। চাঁদপুরে এ দু’বারে কতক্ষণ স্টীমার থেকে নেমে কোথায় আসেন বা খাবার খান এবং কখন আসেন বা কোথায় অবস্থান করেন এর সঠিক তথ্য জানা সম্ভব হয় নি।
চাঁদপুরে তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে ২০০৮ সালে রোটা. কাজী শাহাদাত চাঁদপুরের ‘সপ্তসুর সঙ্গীত একাডেমি’র এক সান্ধ্য অনুষ্ঠানে প্রথমবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চাঁদপুরে আগমনের বিষয়টি তাঁর বক্তৃতায় উপস্থাপন করেন। ফলে চাঁদপুরের সংস্কৃতিমনা ও সুধীমহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদপুরের প্রথম মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামানুসারে চাঁদপুর পৌর স্ট্যান্ড রোডটির নামকরণ করেন ‘কবি নজরুল সড়ক।’
চাঁদপুর রোটারী ভবনের পশ্চিম-উত্তর পাশে কবি নজরুলের ছবিসহ বর্ণনায় একটি বিলবোডও স্থাপন করে রেখেছে চাঁদপুর রোটারী ক্লাব। চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘জাতীয় নজরুল সম্মেলন ২০২০’ ৪-৬ মার্চ চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষামন্ত্রী ও চাঁদপুর-হাইমচর আসনের এমপি ডা. দীপু মনি এর উদ্বোধন করেন।
চাঁদপুর শহরের পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজের প্রবেশদ্বারের দু’পাশে জাতীয় কবি’র শেষ ভাষণ, মা কবিতা ও প্রিয় কবি নজরুল সম্পর্কে একটি অনুচ্ছেদ ও অপর পাশে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পাশে নজরুলের ছবিসহ একটি বিলবোর্ড যথাযথভাবে শিক্ষার্থীসহ যে কোনো দর্শণার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণে কিংবা স্মরণে সংরক্ষণ করে রেখেছেন কলেজ কর্তপক্ষ। যা খুবই দৃষ্টিনন্দন। ২০০৭ সালে মতলব নজরুল একাডেমি র্কর্তৃক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।
তথ্যসূত্র : জাতীয় নজরুল সম্মেলন ২০২০- এর ম্যাগাজিনে প্রদত্ত শিক্ষামন্ত্রী ও চাঁদপুর-হাইমচর আসনের এমপি ডা.দীপু মনি’র বাণী, সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খানের বাণী, চাঁদপুর রোটারী ভবনের বিলবোর্ড এবং চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রকাশিত মাসিক নবারুণ পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।
লেখক : আবদুল গনি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, নজরুল গবেষণা পরিষদ, চাঁদপুর।






