প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৩
আসুন ঐক্যবদ্ধ হই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তুলি

বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরবের ইতিহাসে স্বাধীনতা অর্জন এক অবিস্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ স্বাধীনতা কারও দান নয় কিংবা কারও করুণার ফসলও নয়। বীর বাঙালি রাজপথে দীর্ঘ তেইশ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করে লক্ষ লক্ষ শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধার তাজা রক্তের আত্মবলিদান দিয়েই এ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাঙালির এ স্বাধীনতা অর্জনে দুলক্ষের অধিক মা-বোনের সম্ভ্রম যেমন মিশে আছে তেমনি মিশে আছে বিদেশি বন্ধুদের মৈত্রী ও মিত্রবাহিনীর বীরত্ব ও বিসর্জন। আজ মহান স্বাধীনতার পঞ্চান্নতম বার্ষিকীতে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি ও শ্রদ্ধা জানাই এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও রাষ্ট্রসমূহকে। তাঁরা সেদিন পাশে ছিলেন বলেই আজ গর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এ দেশ আমাদের আশ্রয়, আমাদের ঠিকানা। এর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তাই প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।
কিন্তু বিধিবাম! এতো ত্যাগ-তিতিক্ষায় পাওয়া বাংলাদেশকে বিনির্মাণে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ঘাটতি ছিলো সেই জন্মলগ্ন থেকেই। বিজয় অর্জিত হওয়ার পর থেকে হওয়া উচিত ছিলো দেশগঠনে সবার অভিন্ন ভূমিকা। কিন্তু তা না হয়ে বরং দেশজুড়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড দিনে দিনে বাড়তে থাকে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত খাদ্যহীন রিক্ত-নিঃস্ব দেশের মধ্যে একদিকে যেমন বেড়ে যায় একাত্তরের পরাজিত শক্তির আস্ফালন, তেমনি অন্যদিকে রাজনীতির নামে শুরু হয় হত্যা আর লুন্ঠনের অরাজকতা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চক্রের ষড়যন্ত্র চেপে বসে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের বুকে। এদের সবারই লক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশ নামক দেশটিকে একটি অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। একসময় এদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে যায় বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী। ফলে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে বার বার এদেশ নির্যাতিত হতে থাকে সামরিক সরকারের হাতে। এখনও এর ব্যত্যয় হয়নি। এখনও সামরিক উর্দি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের রাজনৈতিক সরকারকে। ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও অরাজক হয়ে ওঠে। শান্তি ও স্বস্তি আমাদের নেই। দুর্নীতির করাল গ্রাস আমাদের করায়ত্ত করেছে স্বাধীনতার পর থেকেই। এ রাহু থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি আজও। অথচ দেশকে এগিয়ে নিতে চাই সুশাসন যেমন তেমনি স্থিতিশীলতা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এদেশে ক্ষমতার পালা বদলের নজির খুবই কম। আবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও আগের সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো পরের সরকার এসে বাতিল করে দেয়। ফলে প্রচুর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ যেমন নষ্ট হয় তেমনি সময়ও নষ্ট হয়ে যায় অকারণ পাটা-পুতার ঘষায়। অথচ এমন সম্ভাবনার দেশ একসময় জাপানকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিলো আমাদের সামনে। এসডিজি তথ্যমতে বাংলাদেশ আগামী দুহাজার তিরিশ বছরে তারুণ্যের সংখ্যায় সবচেয়ে শীর্ষে থাকবে তার ইতিহাসে। এটাই আমাদের সেরা সময় যাতে দুহাজার পঞ্চাশ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে পারি। কিন্তু আজকের তরুণদের দেখে মনের মধ্যে এ স্বস্তি জাগ্রত হয় না। তরুণদের অনেকেই যেমন উন্নত দেশের হাতছানিকে বুকে লালন করছে তেমনি অনেকেই স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে এসেও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাসে মজে আছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহিদ তিন হাজার না তিন লাখ নাকি তিরিশ লাখ এ অবান্তর বিতর্কে মগ্ন আছে। এখনও বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের তরুণেরা পাকিস্তানের পক্ষ নেয় গর্ব ভরে। তাদের অনেকেই দেশপ্রেমকে বস্তায় ভরে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। তাই যে স্বপ্ন আমরা দেখি অর্থনীতির শীর্ষে যাওয়ার, তা আমাদের জন্যে দিনকে দিন আকাশ কুসুম কল্পনা হয়ে উপহাস করবে বলেই ভয় হয়।
দেশপ্রেম কেবল কপালে-মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে অশ্লীল গালাগাল দেওয়ার পারঙ্গমতায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশপ্রেম কেবল এক সরকার হটিয়ে আরেক সরকারকে এনে ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’ এ প্রবাদকে বাস্তবায়ন করা নয়। দেশপ্রেম মানেই দেশের মানুষের জন্যে কল্যাণকর টেকসই পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করা, যাতে উন্নত বিশ্বের কাছে আমাদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে না হয়, যাতে দেশবিরোধী কোনো চুক্তি করে ক্ষমতায় থাকার মুচলেকা দিতে না হয়। এবারের মহান স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আন্তরিক কামনা, আমরা যাতে একটা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, সুশাসনসম্পন্ন, উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্পন্ন করতে পারি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কব্জা হতে নিজেদের নিরন্তর মুক্ত রাখতে পারি। কেননা আমরা আর কারও দাসত্ব চাই না, আর কারও গোলামী চাই না। আমরা বিশ্বাস করি, একতায় উত্থান বিভেদে পতন। আসুন ঐক্যবদ্ধ হই, কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।




