প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৬
নির্মলা মাসিমার অনন্ত যাত্রা-মমতার এক আলোকবর্তিকা

মানুষের জীবন কেবল জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যকার একটি সময়রেখা নয়; কিছু জীবন হয়ে উঠে ইতিহাস, স্মৃতি আর মমতার জীবন্ত দলিল। নির্মলা দাস তেমনই এক মহীয়সী নারী যাঁর দীর্ঘ ৯৯ বছরের জীবন ছিলো সংগ্রাম, স্নেহ, দায়িত্ববোধ ও নীরব শক্তির অনন্য উদাহরণ। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় বারিধারা ডিওএইচএসে তাঁর মেজো ছেলে, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাসের বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই প্রস্থান কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং বহু প্রজন্মের স্মৃতিভাণ্ডারে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করলো।
|আরো খবর
আমার সঙ্গে নির্মলা মাসিমার পরিচয় ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে, চাঁদপুর জেলার হাইমচরের গ্রামীণ পরিবেশে। তাঁর বড়ো ছেলে সুবোধ দাস তখন হাইমচর গার্লস স্কুলের শিক্ষক; কিছুদিন তাঁকে সহকর্মী হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। সেই সূত্রেই মাঝে মাঝে তাঁদের বাড়িতে যাওয়া, মাসিমা ও মেসোর সান্নিধ্য পাওয়া। নির্মলা মাসিমার স্নেহ ছিলো নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর—চোখের ভাষায়, কথার উষ্ণতায়, খোঁজখবর নেওয়ার আন্তরিকতায়। তিনি মানুষকে আপন করে নিতে জানতেন।
পরবর্তীকালে তাঁর মেজো ছেলে জীবন কানাই দাসের সঙ্গে প্রবীণ অধিকার ও কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে আমাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। প্রায়ই তাঁর বাসায় যেতাম, আর সেখানেই আবার নতুন করে মাসিমার সঙ্গে গল্প, স্মৃতি আর জীবনের নানা কথা ভাগাভাগি হতো। একই অঞ্চলে বাড়ি হওয়ায় আমার স্ত্রীও তাঁর স্নেহের পরিধিতে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটির ওপর তাঁর ভরসা ছিলো গভীর, নির্ভরতা ছিলো অবিচল।
নির্মলা মাসিমা গল্প করতে ভালোবাসতেন। শুধু নিজের কথা নয়—সবার খোঁজখবর নিতেন, আনন্দ-দুঃখ ভাগ করে নিতেন। তাঁর জীবনের এক অনন্য স্মৃতি ছিলো নিজ চোখে মহাত্মা গান্ধীকে দেখা। ১৯৪৭ সালের ২ মার্চ, নোয়াখালীর দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা থেকে ফেরার পথে গান্ধীজি হাইমচরে দু দিনের যাত্রাবিরতি করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তিনি যা তাঁর জীবনের স্মৃতিভাণ্ডারকে ইতিহাসের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে যুক্ত করেছে।
চার ছেলে ও দু মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিলো ভালোবাসা ও শৃঙ্খলায় গড়া। তাঁর স্বামী গোকুল বিহারি দাস বাজাপ্তী রমনীমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাদানে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই মূল্যবোধই নির্মলা মাসিমা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চার করেছেন। নাতনি দোলার মেয়ে আরাইয়ার আগমনে তাঁর আনন্দ ছিলো সীমাহীন। আরাইকে বাস্তবে দেখার আকুলতা ছিলো তাঁর চোখে-মুখে।
আমাদের জন্যে এক বিশেষ সৌভাগ্য ২০২৩ সালের নভেম্বরে ‘প্রবীণ মেলা’য় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা জানানোর সুযোগ হয়েছিলো। দীর্ঘ জীবনে বহু লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি যে মানবিক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, সেই স্বীকৃতি দিতে পারা ছিলো আমাদের গর্ব।
আজ তিনি মহাকালের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু নির্মলা দাস নামটি থেকে যাবে—স্নেহের, সাহসের, ইতিহাস-স্পর্শী এক নারীর প্রতীক হয়ে। তাঁর স্নেহের পরশ, তাঁর কণ্ঠের গল্প, তাঁর মমতা—আমৃত্যু আমাদের স্মৃতিতে জাগ্রত থাকবে।
শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, নীরব প্রণামে বিদায় নির্মলা মাসিমা।
আজ চোখ ভিজুক, মন ভারী হোক--এগুলো দুর্বলতা নয় বরং গভীর মানবিকতার চিহ্ন!




