প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৪
ফিরোজার সামনে কিছুক্ষণ

বাংলাদেশের তিন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পরে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সাত দিনের শোক পালন করেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামের সাথে এ দেশের আপামর মানুষ যতগুলো সম্মানিত উপাধি আছে তার সবটুকু দিয়ে তঁাকে শ্রদ্ধা জানায়। এর মধ্যে ‘আপসহীন নেত্রী’ এটি তঁার রাজনৈতিক জীবনের অনন্য অর্জন। আমার জানা মতে, পৃথিবীতে আর কারো জন্যে এমন অভিধা অর্জন সম্ভব হয়নি। তঁার বাসভবন ‘ফিরোজা’তে এখন কেবল শূন্যতা বিরাজ করলেও শূন্য হয়ে যায়নি তঁার অস্তিত্ব। ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার অস্তিত্ব ইতিহাসে কোনোদিনও শূন্য হয়ে যাবে না। সেটা যে সৃষ্টিকর্তা দ্বারা নির্ধারিত তা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পরে তঁার জানাজায় যে অকল্পনীয় মানুষের জমায়েত ঘটে তা দেখেই বোঝা গেছে। সম্ভবত দুনিয়ার ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত আর নেই।
বটবৃক্ষ এই মানুষটির দৈহিক জীবনের শেষ ঠিকানা ছিলো
ঘঊউ-১.জড়ধফ-৭৯.এঁষংযধহ-২
এর ‘ফিরোজা’ নামের বাড়িটি। ঢাকা গুলশানের বর্ধিত অংশের এলাকার প্রথম বাড়িটি ‘ফিরোজা’। জীবনের চলার পথে কতো-কতোবার ঐ রাস্তা দিয়ে গিয়েছি। সেখান দিয়ে পার হবার সময় নিজের অজান্তেই প্রতিবার ঘুরে তাকাতাম গাছ-গাছালিতে ঘেরা ‘ফিরোজা’র দিকে। আর ভাবতাম এখানে আছেন যিনি, তিনি না থাকলে শূন্য হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এই বাড়িতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রায় সতের বছরের বসবাসের জীবন অতিবাহিত হলো। সব সীমানা ছাড়িয়ে তিনি এখন কঁাটাতারের ঊর্ধ্বে। কোনো বালু ভর্তি ট্রাক কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ জড়ো করে তঁাকে থামিয়ে দেয়া যাবে না।
২০০৯-এ প্রায় চল্লিশ বছরের স্মৃতি বিজড়িত সেনা নিবাসের মইনুল রোডে তঁার স্বামীর ভিটা থেকে তঁাকে তুলে দেওয়া হয়। তারপর স্বামী-সন্তানদের সেই স্মৃতিমাখা বাড়ি ছেড়ে গুলশানের এই ভাড়া বাসায় বেগম খালেদা জিয়ার বসবাস শুরু হয়েছিলো। জনগণের মুক্তির জন্যে, দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যে তিনি এই ‘ফিরোজা’র উঠোনে উড়িয়ে ছিলেন লাল-সবুজের পতাকা। ‘ফিরোজা’য় এখন লনের সামনে বসে নেই সেই ‘বাংলাদেশের খালেদা’। যঁার অঁাচল জুড়ে ছিলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
‘ফিরোজা’য় এখন নেই সেই মানুষটা। নেই শত্রুর কাছে মাথা নত না করার সেই ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া। এখানেই একা অসুস্থতায় দিন কেটেছিলো তঁার। এই সেদিন আবার গিয়েছিলাম গুলশান-২-এর সেই বাড়িটার সামনে। না এবার কোনো কাজে নয়। শুধু একবার এই বাড়িটাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছুক্ষণ দঁাড়িয়ে থেকে আমার মনে যে ভাবনাগুলো ভিড় জমালো তাই নিয়ে আজকের লেখাটি। এখনও সেখানে সবুজ গাছগুলো হাওয়ায় নড়াচড়া করছে। আর কেমন এক বিষণ্নতা নিয়ে পাতারা ঝরে পড়ছে। নারকেল গাছটা এখনো মাথা উঁচু করে দঁাড়িয়ে আছে। একপাশে দেয়ালের গায়ে এখনো সেই শুভ্র সাদা রং। শুধু নেই একজনÑশরীরী প্রস্থান ঘটেছে যঁারÑ‘বাংলাদেশের খালেদার’।
ঠিক পাশের বাড়িতেই এখন থাকেন তঁার আদরের ছেলে তারেক রহমান। বেগম খালেদা জিয়া তাকে ‘পিনু’ বলেই ডাকতেন। এই বাড়িতেই এখন পরিবারের সবাই। ব্যক্তিগত উৎসব বলে কিছু ছিলো না বেগম জিয়ার। ভক্তরা পালন করতেন। কিন্তু তিনি গোটা ব্যক্তিগত জীবনটাই কেমন যেন অন্তর্গত করে রেখেছিলেন নিজের মধ্যে। পৃথিবীর শরীরী জীবন ছেড়ে মা চলে যাবার আগে সতের বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে ফিরে এলেন আদরের ‘পিনু’। সবশেষে ‘পিনু’র শেষ স্পর্শ-সুখ নিয়ে চলে গেলেন তিনি। এই ‘ফিরোজা’তেই ২০১৫ তে টানা তিরানব্বই দিন অবরুদ্ধ থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে তঁার আদরের ছোট ছেলেটাকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে হয়েছিলো। তবুও আপস করেননি বেগম জিয়া।
রাস্তাটা ছেড়ে সামনে গেলেই গুলশানের ৮৬নং সড়কে বিএনপি’র কার্যালয়। এর চারপাশে এখন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে শোকের ব্যানার ঝুলছে। এখানেই বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার আদায় করার লড়াইয়ের অধ্যায় রচিত হয়েছিলো। এই বাড়িতে এখন আবার ভিড় জমছে, ব্যস্ততা বাড়ছে। তারেক রহমানের কঁাধে এখন কঠিন ভার। অন্তরালে চোখের পানির আড়ালে মায়ের স্বপ্ন নিয়ে সামনের পথচলার স্বপ্ন। যে দেশ ও জনগণের জন্যে বেগম খালেদা জিয়া সমস্তটা জীবন আপসহীনভাবে উৎসর্গ করে গেলেন, যঁার শেষ যাত্রায় জানাজায় ইতিহাসের নজিরবিহীন মানুষের ঢল নেমেছিলো, তঁার একমাত্র জীবিত সন্তানকে ধরেই আবার জেগে উঠতে চায় মানুষ।
‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এখন দলের দ্বায়িত্বভার নিতে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রায় সকল কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। মা যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকেই শুরুর আকাঙ্ক্ষা ছেলে তারেক রহমানের। এভাবে না থেকেও বেগম খালেদা জিয়া থাকবেন ছায়া হয়ে। জনগণের এতো ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ছড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে, কোটি কোটি মানুষের মনে মনে। বাংলাদেশে এখন একটি আদর্শ, আবেগ আর অনুভূতির নাম ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া।
জনাব তারেক রহমানের কাছে এখন প্রিয় দেশ আছে। এদেশে মাটি আর মানুষ আছে। শুধু নেই সেই মাটির মানুষ ‘বাংলাদেশের খালেদা’। যে স্বামীর সাথে ঘর বেঁধে ছিলেন যে মা, স্বামীর মৃত্যুর পরে নিজের ঘর ছেড়ে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্যে রাজপথে নামতে হয়েছিল তঁাকে। তারপর সংগ্রামে বিদ্রোহে বিপ্লবে কতো কতোদিন কেটে গেলো। তারপর সব শেষে সেই স্বামীর কবরের পাশেই চির নিদ্রায় শুয়ে গেলেন ‘বাংলাদেশের খালেদা’। এখনো প্রতিদিন তঁার কবরের সামনে দঁাড়িয়ে কঁাদছে যে মানুষগুলো, তঁাদের কোনো নাম পরিচয় নেই, তঁারা সাধারণ-তঁারা ‘বাংলাদেশের খালেদার’ সন্তান। এভাবে কেঁদে কেঁদে তঁারা তঁাদের চেতনায় ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়ার অস্তিত্বকে আবার দ্রোহের আগুনে শাণিত করে তুলছে। সামনে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানান মেরুকরণ চলছে। এমনকি দলের ভিতরেও চলছে মেরুকরণ নিয়ে মতামত, ঐক্যমত কিংবা দ্বিমত। এমন অবস্থায় নিজের দলকে ঠিকভাবে পরিচালিত করতে হবে। রাজনৈতিক মেরুকরণের হিসাব-নিকাষ কষতে হবে। প্রয়োজনে কোথাও ছাড় দিতে হবে। আবার কোথাও ছাড় নিতে হবে। কিন্তু যদি খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশে চিরঞ্জীব করে রাখতে হয় তাহলে কখনোই আপস করা যাবে না। ‘বাংলাদেশের খালেদা’কে ছাড়া বাংলাদেশে যে শূন্যতা সেটা কি পূর্ণতা পাবেÑএই ভাবনায় এখন কোটি কোটি বাংলাদেশীর মন অস্থির হয়ে আছে।







