শুক্রবার, ০২ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭

খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) উপমহাদেশে ইসলামের আলোকবর্তিকা

মুফতি মাও. মো. জাফর আলী
খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) উপমহাদেশে ইসলামের আলোকবর্তিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা সামরিক সাফল্য তথা তরবারির মাধ্যমে অর্জিত বিজয় নয়; বরং এটি একটি মানবিক ও নৈতিক আন্দোলনের বাস্তব বিজয়। এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন ত্যাগ রয়েছে, তন্মধ্যে সুলতানুল হিন্দ, গরিবে নেওয়াজ, খাজায়ে খাজেগান খাজা মুঈনুদ্দিন আল-চিশতি আল-হাসানি ওয়াল হুসাইনি (রহ.) অন্যতম। তঁার জীবন ও আদর্শ উপমহাদেশে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা অনন্য ভূমিকায় আসীন করেছে।

খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) আনুমানিক ৫৩৬ হিজরি মোতাবেক ১১৪১ খ্রিস্টাব্দে ইরানের সিস্তান অঞ্চলে সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তঁার পিতা ছিলেন হযরত সাইয়্যিদ গিয়াসউদ্দিন হাসান (রহ.) এবং মাতা বিবি উম্মুল ওয়ারা (রহ.)।

সুলতানুল হিন্দ খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) ছিলেন আহলে-বাইত বংশোদ্ভূত। ঐতিহাসিক সূত্রমতে, তিনি পিতৃকূলের সূত্রে হযরত ইমাম হাসান (রা.)-এর বংশধর এবং মাতৃকূলের সূত্রে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর বংশধর। এ কারণে তঁাকে হাসানি ও হুসাইনি সাইয়্যিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

শৈশবেই তিনি পিতা-মাতাকে হারিয়ে ইয়াতীম হয়ে যান। যৌবনকালে একদা ইবরাহীম কুন্দুজি নামক প্রখ্যাত মাজজুব (আল্লাহর প্রেমে সদা মশগুল) দরবেশের সান্নিধ্যে আসার পর তঁার মধ্যে বৈরাগ্য ও খোদা প্রেমের প্রবল তৃষ্ণা জেগে ওঠে। তিনে নিজের সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে ইলম অর্জনের জন্য বুখারা ও সমরকন্দের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

পরবর্তীতে তিনি প্রসিদ্ধ সাধক খাজা উসমান হারুনী (রহ.)-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ২০ বছর স্বীয় পীরের সোহবতে থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় কামালিয়াত (পূর্ণতা) লাভ করেন।

প্রসিদ্ধি রয়েছে যে, মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থানকালে স্বপ্নে প্রিয় নবী (সা.) তঁাকে ভারতে গিয়ে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ দেন। এই স্বপ্নাদেশের পর তিনি ৫৯ বছর বয়সে ৫৯১ হিজরিতে রাজস্থানের আজমীরে পদার্পণ করেন। তৎকালীন আজমীরের শাসক ছিলেন পৃথ্বীরাজ চৌহান।

বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা আমির খোরদ কিরমানী (রহ.) রচিত ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, খাজা (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক প্রভাবে তৎকালীন অনেক কঠিন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গিয়েছিল। যেমন, পৃথ্বীরাজের লোকেরা খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)কে নানাভাবে অতিষ্ঠ করার চেষ্টা করেছে। লোকমুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, যখন খাজা (রহ.) আজমীরে আসেন, তখন রাজার প্রহরীরা আনা সাগরের পানি ব্যবহারে বাধা দেয়। তখন তিনি তঁার এক মুরিদের মাধ্যমে একটি ছোট পাত্রে সাগরের পানি আনতে বলেন। অলৌকিকভাবে, পাত্রটিতে পানি নেওয়ার সাথে সাথে আনা সাগরের পানি শুকিয়ে যায়! এই কারামত (অলৌকিক ঘটনা) দেখে অসংখ্য মানুষ তঁার প্রতি ঈমান আনয়ন করেন। পরবর্তীতে খাজা (রহ.)-এর দোয়ায় সাগরে পুনরায় পানি ফিরে আসে।

আজমীরে আসার পর খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে চাইলে রাজা পৃথ্বীরাজের উটের রাখালরা তঁাকে বাধা দেয় এবং বলে, রাজার উট গাছের নিচে বিশ্রাম নিবে। খাজা (রহ.) মুচকি হেসে বললেন, “ঠিক আছে, উটগুলো এখানেই বসে থাকুক!” পরদিন সকালে রাখালরা উটগুলো আর উঠাতে পারছিল না। শত চেষ্টার পরও ব্যর্থ হয়ে তাদের ভুল বুঝতে পেরে খাজা (রহ.)-এর কাছে ক্ষমা চায়। তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে অনুমতি দেওয়ার পর উটগুলো সেখান থেকে উঠে দঁাড়াতে সক্ষম হয়।

বর্ণিত আছে, রাজার প্রধান জাদুকর অজয় পাল তার জাদুমন্ত্র দিয়ে খাজা (রহ.)কে আক্রমণ করতে চরমভাবে লজ্জিত হয়েছিল। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক শক্তির সামনে জাদুকরের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশেষে সেই জাদুকর ইসলাম গ্রহণ করে তঁার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

সুলতানুল হিন্দ খাজা গরিবে নেওয়াজ মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর ধর্ম প্রচারের পদ্ধতি ছিল অসাধারণ। তিনি পেশি শক্তির পরিবর্তে নম্রতা-ভদ্রতা, ভালোবাসা, সাম্য এবং মানব সেবার মাধ্যমে সকল মানুষের হৃদয়ের মণি কোঠরে স্থান লাভ করে নিয়েছিলেন। তঁার খানকাহ ছিল সকল ধর্মের ও শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সদা উন্মুক্ত।

তিনি সকল ভেদাভেদের উর্দ্ধে উঠে মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকে মানুষ হিসেবে সমান মূল্যায়ন করতেন। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা অথবা পেশি শক্তির প্রয়োগ নয় বরং হৃদয়ের ভাষায় মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। তঁার হৃদয়কাড়া অমায়িক ব্যবহার ও আধ্যাত্মিক শক্তি দেখে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে তঁার অবদান অনস্বীকার্য। তঁার হাতে প্রায় ৯৯ হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।

আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি ছিলেন যুগের অন্যতম মহান ব্যক্তি। ইলমে শরীয়তের পাশাপাশি তিনি ইলমে তরিকতের দীক্ষা দান করতেন। ভারতে তিনি চিশতিয়া তরিকার উদ্ভব ঘটান। তঁার অনুসারীগণ দিল্লি, উত্তর ভারত, বাংলা ও দাক্ষিণাত্যে দাওয়াতি কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন। অদ্যাবধি এ উপমহাদেশের প্রায় সকল প্রান্তে তঁার দাওয়াত ও তরিকার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

তিনি অসহায় ও দরিদ্রদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। লঙ্গরখানার মাধ্যমে তিনি প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে আহার করাতেন। এই জনসেবামূলক কাজের মাধ্যমে তিনি সুখ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করেছেন। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সর্বসাধারণের কাছে তিনি ‘গরিবে নেওয়াজ’ বা ‘গরিবের বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হযরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) সংকলিত ‘দালাইলুল আরেফীন’ কিতাবে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহ.)-এর এই অমর বাণীটি বর্ণিত হয়েছে যে, “নদীর মত দানশীলতা, সূর্যের মতো মমতা আর পৃথিবীর মতো বিনয়-এই তিন গুণের অধিকারীই আল্লাহর প্রকৃত বন্ধু।” দুঃখীর সেবা এবং অন্নহীনে অন্ন দানের ব্যাপারে উক্ত কিতাবে আরো বর্ণিত আছে যে, “দুঃখীর সেবা করা এবং ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করার চেয়ে বড় ইবাদত আর নেই।”

দ্বীনের এই মহান ব্যক্তি ৬ রজব, ৬৩৩ হিজরি মোতাবেক ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ সনে ওফাত বরণ করেন। তার পবিত্র মাজার শরীফ ভারতের রাজস্থানের আজমীর শরীফে অবস্থিত। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, যখন তঁার ওফাত হয়, তখন তঁার কপালে কুদরতিভাবে লিখা ভেসে উঠেছিল, ‘হাযা হাবিবুল্লাহ মাতা ফি হুব্বিল্লাহ’ (তিনি আল্লাহর বন্ধু এবং আল্লাহর প্রেমেই বিলীন হয়েছেন)। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর ওরছ উপলক্ষ্যে আজমীর শরীফে সমবেত হন।

সুলতানুল হিন্দ খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন শান্তি ও মানবসেবার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তঁার শিক্ষা আজও মানুষকে পরমতসহিষ্ণুতা, সহনশীলতা এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির পথের সন্ধান দেয়। বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহ.)-এর এই পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবসেবার শিক্ষা অনুসরণ করাই হতে পারে বিশ্ব শান্তির অন্যতম পথ।

লেখক : প্রভাষক (আরবি), রামপুর আদর্শ আলিম মাদরাসা, চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়