প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:২২
মেঘনায় ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’: আইনের ছায়ায় অনিয়মের উল্লাস, এক এমপির অভিযানে উন্মোচিত রাষ্ট্রের নীরব ব্যর্থতা!

চাঁদপুরের প্রাণ—মেঘনা। এই নদী শুধু জলধারা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। কিন্তু সেই মেঘনার বুকেই এখন চলছে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ—যেখানে আইন আছে, অভিযান আছে, বরাদ্দ আছে; নেই শুধু জবাবদিহিতা। গতকাল চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের আকস্মিক নদী অভিযানে যে চিত্র সামনে এলো, তা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের চরম বিপর্যয়ের নগ্ন দলিল।
|আরো খবর
ঘুমন্ত প্রহরী, জেগে থাকা অপরাধচক্র
রাষ্ট্র যখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে জাটকা সংরক্ষণে, তখন সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিকে আঘাত করে। এমপি মানিকের অভিযানে দেখা গেল—যেখানে নদীতে অবাধে চলছে জাটকা নিধন, সেখানে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্পিডবোটে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন।
ভিডিও ক্যাপশন :মেঘনায় অভয়াশ্রমে ঝাটকা নিধন অভিযানে এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।
এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বহুদিনের জমে থাকা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও দায়সারাভাবের বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবতা হলো—যেখানে নিয়মিত টহল থাকার কথা, সেখানে ‘দেখানোর টহল’ চলে; যেখানে জেলেদের সচেতন করার কথা, সেখানে চলে নীরব সমঝোতা।
অভিযান নয়, এটি এক প্রতীকী বিদ্রোহ
একজন সংসদ সদস্য যখন নিজে স্পিডবোট চালিয়ে নদীতে নেমে কর্মকর্তাদের ঘুম ভাঙান—এটি নিছক অভিযান নয়; এটি একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। এটি সেই ব্যর্থ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ, যেখানে কাগজে-কলমে সফলতা দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে নদী লুট হয়ে যায়।
এমপি মানিকের উচ্চারিত প্রশ্ন— “সরকার কি আপনাদের ঘুমানোর জন্য পাঠিয়েছে?” এই প্রশ্নটি আজ শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার প্রতি নয়; এটি পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি একটি জবাবদিহির দাবি।
জাটকা নিধন: শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতির উপর আঘাত
জাটকা নিধন মানে ভবিষ্যতের ইলিশ ধ্বংস করা। একটি জাটকা বাঁচলে সেটি বড় হয়ে বাজারে মূল্যবান ইলিশে পরিণত হয়। ফলে এই অবৈধ নিধন সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সরকার প্রতিবছর জেলেদের জন্য প্রণোদনা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যদি দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঘুমিয়ে থাকেন, তবে সেই সব উদ্যোগ কেবল ফাইলবন্দি সফলতায় পরিণত হয়।
প্রশাসনের নীরব যোগসাজশ?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্নটি এখানেই—এই ঘুম কি শুধুই ক্লান্তি, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অদৃশ্য সমঝোতা?
অভিজ্ঞ মহলের মতে, নদীতে অবৈধ জাটকা নিধন একটি সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই চক্র যদি নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, তবে ধরে নিতে হবে—কোথাও না কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্তদের নীরব সম্মতি বা অন্তত উদাসীনতা রয়েছে।
জনপ্রতিনিধির ভূমিকায় নতুন বার্তা
এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের এই অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি দেখিয়েছে—জনপ্রতিনিধি চাইলে মাঠে নেমে সরাসরি তদারকি করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি নিয়মিত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, নাকি এটি প্রশাসনের ব্যর্থতার একটি অস্থায়ী প্রতিকার?
রাষ্ট্রব্যবস্থায় দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট। একজন এমপির কাজ নীতি নির্ধারণ ও তদারকি; বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন। যদি এমপিকেই মাঠে নেমে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হয়, তবে সেটি প্রশাসনিক কাঠামোর ভেঙে পড়ারই ইঙ্গিত।
ভিডিওর বাইরে আরও গভীর সংকট
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি কেবল একটি মুহূর্তের চিত্র। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল মনিটরিং এবং শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি।
প্রশ্ন হলো—কতদিন ধরে এই ‘ঘুমন্ত ডিউটি’ চলছে? কতবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করেছেন? কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
সমাধান: কেবল শোকজ নয়, কাঠামোগত পরিবর্তন
এই ঘটনার পর যদি কেবল দায়সারা তদন্ত ও শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়, তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রয়োজন—রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং (GPS ভিত্তিক টহল নজরদারি), স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নৈতিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।
শেষ কথা: মেঘনার ভবিষ্যৎ, আমাদের সিদ্ধান্ত
মেঘনা শুধু একটি নদী নয়; এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। এই নদীকে রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। কিন্তু যদি রক্ষকরাই দায়িত্বহীনতায় ডুবে থাকেন, তবে এই নদী আর বেশিদিন তার ঐশ্বর্য ধরে রাখতে পারবে না।
এমপি মানিকের এই অভিযান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সমস্যা কোথায়। এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি জেগে উঠবে, নাকি মেঘনার বুকেই এই ঘুম চিরস্থায়ী হয়ে যাবে?
লেখক :
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি। বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








