প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৫:০০
ঘাটে ডুবে বাস, রেলে পিষ্ট স্বপ্ন, সড়কে ছিন্ন জীবন”—
রাষ্ট্র কি কেবল শোকবার্তার মেশিন?

|আরো খবর
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
প্রতিবেদক:
অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,
সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
“ঘাটে ডুবে বাস, রেলে পিষ্ট স্বপ্ন, সড়কে ছিন্ন জীবন”—রাষ্ট্র কি কেবল শোকবার্তার মেশিন?
এটি কোনো সাধারণ গদ্য নয়—এটি একটি জাতীয় অভিযোগপত্র। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা উদাসীনতার বিরুদ্ধে এবং সেই পদ্ধতিগত নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে—যা প্রতিদিন নাগরিকের জীবন কেড়ে নিয়ে নিজেকে ‘দায়মুক্ত’ ঘোষণা করে রেখেছে।
বিগত এক সপ্তাহের খতিয়ান আমাদের সামনে যে বিভীষিকা হাজির করেছে, তা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক, কুমিল্লার মরণফাঁদ, কিশোরগঞ্জ আর পঞ্চগড়ের মহাসড়ক—সবখানে আজ কেবল লাশের গন্ধ আর আর্তনাদ।
মৃত্যুর মিছিল: পরিসংখ্যান যখন আতঙ্কের নাম
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে মৃত্যু এখন আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি “নিয়মিত প্রক্রিয়া”।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট (২৫ মার্চ ২০২৬): ৫ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। ডুবুরি ও ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানে বাসের ভেতর থেকে একে একে ২৬ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু এবং ৭ জন পুরুষ।
কুমিল্লা (প্রাইভেটকার-বাস সংঘর্ষ): কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় একটি প্রাইভেটকার দুমড়ে-মুচড়ে গিয়ে একই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়েছেন। মুহূর্তেই একটি সাজানো সংসার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক: গৌরনদীর বেজহারে দুই বাসের মুখোমুখি ভয়াবহ সংঘর্ষে ৩ জন নিহত এবং অন্তত ২০ জন যাত্রী গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্বের পথে।
কিশোরগঞ্জ (ঈশ্বরগঞ্জ-খৈরাটি): ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ঘন কুয়াশায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন যাত্রী রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
পঞ্চগড় (দেবীগঞ্জ): নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস গাছের সাথে ধাক্কা লেগে উল্টে যায়। এতে ২ জন গুরুতর আহতসহ বাসের প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছেন।
এছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন ঘটে চলেছে এরকম আরো অসংখ্য ঘটনা, যা অনেক সময় সংবাদপত্রের শিরোনামেও জায়গা পায় না। প্রতিটি মোড়, প্রতিটি ক্রসিং যেন একেকটি মৃত্যুপরোয়ানা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রতিটি সংখ্যা প্রমাণ করে—রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা এখন এক একটি সুসংগঠিত মরণফাঁদ।
রাষ্ট্র এখন অভিযুক্ত
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা যখন এমন হয় যে—ফেরিঘাটে উঠতে গিয়ে একটি আস্ত বাস নদীতে তলিয়ে যায়, রেলক্রসিংয়ে অরক্ষিত গেটে ট্রেন এসে মানুষকে টুকরো টুকরো করে দেয় এবং সড়কে আইন কেবল কাগজের পাতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে—তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র কেবল ‘ব্যর্থ’ নয়, রাষ্ট্র এখানে ‘অভিযুক্ত’।
“দুর্ঘটনা” শব্দটি এখন প্রতারণা
এই শব্দটি ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। কারণ দৌলতদিয়ায় ব্যারিয়ার না থাকা প্রশাসনের অজানা ছিল না। কুমিল্লার মহাসড়কে গতিরোধক বা তদারকি ছিল না। কিশোরগঞ্জের ঘন কুয়াশায় নেই কোনো আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। তবুও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এটি দুর্ঘটনা নয়—এটি পূর্বপরিকল্পিত অবহেলা, যার অনিবার্য ফল এই মৃত্যু।
ক্ষমতার আড়ালে লুকানো দায়মুক্তির সাম্রাজ্য
পরিবহন খাতে একটি অদৃশ্য “দায়মুক্তির সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে। লাইসেন্স পায় অযোগ্য চালক, নিয়ম ভাঙে প্রভাবশালী মালিকরা, আর তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রশাসন নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। এটি কেবল দুর্বলতা নয়—এটি একটি সংগঠিত ব্যর্থতা। এখানে সবাই জানে সমস্যা কোথায়, কিন্তু সমাধান কেউ করে না। কারণ, শেষ পর্যন্ত কাউকেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না।
তদন্ত কমিটি: রাষ্ট্রের পুরোনো নাটক
প্রতিবার একই স্ক্রিপ্ট—তদন্ত কমিটি, দুঃখ প্রকাশ, আর তুচ্ছ ক্ষতিপূরণ। তারপর সব নীরব। এই কমিটিগুলো কি সত্য খুঁজে বের করে, নাকি সত্যকে লোকচক্ষুর আড়ালে কবর দেয়? আজ পর্যন্ত কয়টি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে? কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
মানুষের জীবন: রাষ্ট্রের কাছে কি কেবলই “ডাটা”?
দৌলতদিয়ার ২৬ জন মানুষ, কুমিল্লার সেই ৪টি প্রাণ কিংবা বরিশালের সেই রক্তাক্ত শরীরগুলো কি শুধু পত্রিকার রিপোর্টের জন্য? না—এগুলো একেকটি পরিবারের চিরস্থায়ী শূন্যতা। এগুলো একেকটি লাশের স্তূপ, হাজারো স্বপ্নের সমাধি। রাষ্ট্র কি এই ব্যথার গভীরতা বোঝে? নাকি তার কাছে নাগরিকের জীবন কেবল কিছু ডিজিটাল ডাটা?
এখন আর সংস্কার নয়, শাস্তি প্রয়োজন
এই সেক্টরে “ধীরে ধীরে উন্নয়ন” একটি নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা।
অবিলম্বে করণীয়: দৌলতদিয়া ঘাট বা মহাসড়কে গাফিলতির জন্য দায়ীদের শুধু সাময়িক বহিষ্কার নয়, সরাসরি ফৌজদারি হত্যা মামলায় বিচার করতে হবে।
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা: সব রেলক্রসিং, ফেরিঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বাধ্যতামূলক স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা গেট ও আধুনিক ব্যারিয়ার নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি জাগবে, নাকি লাশ বাড়বে?
এই লেখা শেষ করার সময়ও হয়তো দেশের কোথাও কোনো পরিবারের স্বপ্ন চুরমার হচ্ছে চাকার নিচে। প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এখনো নীরব দর্শক হয়ে থাকবে? নাকি এইবার সত্যিই নড়বে?
শেষ কথা
এই দেশ উন্নয়নশীল হতে পারে, কিন্তু যদি নাগরিকের জীবনই নিরাপদ না হয়—তাহলে সেই উন্নয়ন একটি নিষ্ঠুর পরিহাস। দৌলতদিয়া, বরিশাল, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ আর পঞ্চগড় আজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের—সে কি জীবনের দায় নেবে, নাকি আরও লাশের মিছিল দেখবে?
ডিসিকে /এমজেডএইচ








