প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৫:১৭
পারস্যের পরিস্থিতি ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাপ্রলয় মধ্যপ্রাচ্য কাঁপছে—
বিশ্ব কি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুনামির মুখোমুখি?

|আরো খবর
পারস্যের পরিস্থিতি ও বিশ্ব অর্থনীতির মহাপ্রলয়
মধ্যপ্রাচ্য কাঁপছে—বিশ্ব কি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুনামির মুখোমুখি?
বিশেষ ফিচার | আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি
১ মার্চ, ২০২৬
ইরানের কেন্দ্রে নজিরবিহীন হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী রেকর্ড—বিশ্ব কি নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি? বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য কি প্রস্তুতি যথেষ্ট?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তেহরানের আকাশে যে বিস্ফোরণ দেখা গেছে, তা ছিল শুধু সামরিক অভিযান নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের চার দশকের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য এক বিপজ্জনক সংকেত। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণার সঙ্গে মিলিত হয়ে এই ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, শেয়ারবাজার অস্থির, কূটনৈতিক মহলে উত্তেজনা তীব্র—সবই একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করছে।
১. নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা: ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক ও রাষ্ট্রীয় শঙ্কা
‘বেত-এ-রাহবার’ কমপ্লেক্সে আঘাত কেবল অবকাঠামো ধ্বংস করেনি; এটি ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মেরুদণ্ডকে চরমভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই হামলার কৌশল নিখুঁত—ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের মাথা লক্ষ্য করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অচল করার প্রচেষ্টা।
কুদস ফোর্সের শীর্ষ নেতৃত্ব, হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার সরকার ও ইয়েমেনের হুথি—সবই এক কেন্দ্রীয় সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এখন সেই সমর্থন অনিশ্চিত। এই নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা কেবল ইরানের জন্য নয়; পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক ভিন্ন অস্থিরতার সূচনা হতে পারে। বিপ্লবী গার্ড এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী এখন শক্তি প্রদর্শনের জন্য তৎপর হতে পারে—যা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
২. হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘গলা চেপে ধরার অস্ত্র’
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের তেল সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। ইরান এই সরু জলপথ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে—এটি কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুপরিকল্পিত কৌশল।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই ১৫০ ডলার অতিক্রম করেছে। এটি যদি ২০০ ডলার স্পর্শ করে, তবে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও শিল্প উৎপাদন চরম সংকটে পড়বে।
৩. শিয়া–সুন্নি পুনর্বিন্যাস: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার নতুন মানচিত্র
ইরান দীর্ঘদিন ধরে শিয়া রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি শিয়া–সুন্নি ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। উপসাগরীয় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে যেতে পারে। এই পুনর্বিন্যাস কেবল সামরিক নয়; এটি রাজনৈতিক মানচিত্রেও স্থায়ী অস্থিরতার সূচনা করতে পারে।
৪. পরাশক্তির দাবার চাল: যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার কৌশল
চীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল জ্বালানি আমদানি করে। হরমুজ বন্ধ হলে তাদের শিল্প স্থবির হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া ইউক্রেনে ইরানের প্রযুক্তি ও ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল। তেহরান দুর্বল হলে মস্কোর কৌশলগত অবস্থান ঝুঁকির মুখে। বৈশ্বিক শক্তির এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শীতল যুদ্ধের সম্ভাবনা উসকে দিয়েছে।
৫. বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, তবে বৈশ্বিক অভিঘাত এড়ানো কঠিন। তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। উপসাগরীয় কর্মীদের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধস পড়বে। স্থানীয় অসাধু সিন্ডিকেটকে রোখা না গেলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
৬. আমরা কি বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?
পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও প্রক্সি সংঘাত, অর্থনৈতিক অবরোধ ও আঞ্চলিক যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশের করণীয় হলো কৌশলগত জ্বালানি রিজার্ভ বৃদ্ধি, বিকল্প আমদানি উৎস আবিষ্কার এবং বাজার তদারকি শক্তিশালী করা।
উপসংহার
পারস্যের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি রাষ্ট্রের সংকট নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির নতুন অস্থিরতা সূচিত করছে। খামেনির অবস্থানের অনিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের চার দশকের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি সতর্কতার সময়। দূরের আগুন যেন ঘরের ভেতর ঢুকে না পড়ে—সেই প্রস্তুতি এখন সবচেয়ে জরুরি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








