প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭
মন্ত্রী আসার গুঞ্জনেই পাল্টে গেলো ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র!

সকালটা শুরু হয়েছিল অন্যদিনের মতোই। হাসপাতালের করিডোরে রোগী-স্বজনের আনাগোনা, ওয়ার্ডে অসুস্থ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, কোথাও ভেজা মেঝে, কোথাও জমে থাকা ময়লা, কোথাও ধুলোর আস্তরণ।
|আরো খবর
তারপর আচমকা এলো একটি খবর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আকস্মিক চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গেছেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই যেনো বদলে গেলো চারপাশের বাতাস। স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরে শুরু হলো তৎপরতা। আর সেই তৎপরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ছাপ পড়লো ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। যে হাসপাতালের বারান্দায় অন্যদিন জমে থাকতে দেখা যায় থকথকে পানি, সেখানে মেঝে চকচক করছিল। যে ফ্যানগুলোতে ধুলোর আস্তরণ চোখে পড়তো, সেগুলোও পরিষ্কার। ওয়ার্ডে এসেছে নতুন ময়লা ফেলার বিন। ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে বেসিন, গোসলখানা ও ওয়াশরুম। লিক হওয়া পাইপও পেয়েছে মেরামতের হাত। এক সকালেই হাসপাতালের চেহারা যেনো বদলে গেলো। দৃশ্যটি এতোটাই আলাদা ছিল যে, কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীরাও বিস্ময় লুকাতে পারেননি।
রোববার (৯ আগস্ট ২০২৬) সকালে ঝটিকা সফরে হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীনকে স্ট্যান্ড রিলিজের নির্দেশও দেন তিনি। পরে অবশ্য মৌখিকভাবে সতর্ক করে সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করেন। পার্শ্ববর্তী উপজেলা হাইমচরের সেই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা যায় ব্যতিক্রমী পরিচ্ছন্নতার দৃশ্য।
সকালের ব্যস্ততায় হাসপাতালের সামনে থাকা বেসিনটি হয়ে ওঠে চকচকে। নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে ধুলোমাখা ফ্যান পরিষ্কার করা হয়। যে ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে রোগীদের যে অভিযোগ ছিল, সেদিন সেটিও একেবারে ঝকঝকে। হাসপাতালের একেকটি কোণ যেনো আচমকা নিজের চেহারা পাল্টে ফেলছিল। কিন্তু এই চকচকে দৃশ্যের মধ্যেই ছিলো এক ধরনের নীরব অস্বস্তি। কারণ যাঁরা প্রতিদিন এই হাসপাতাল দেখেন, তারা জানেন, এ দৃশ্য প্রতিদিনের নয়। চারদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকা এক রোগীর কণ্ঠে তাই বিস্ময়ের চেয়ে আক্ষেপই ছিলো বেশি। তিনি বলেন, আমরা হাসপাতালে ভর্তি হই সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু এখানকার নোংরা পরিবেশের কারণে অনেক সময় আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আজ শুনেছি উপরের কোনো স্যার আসবেন। সেই খবর পেয়ে সকাল থেকে সবকিছু পরিষ্কার করেছে। অন্যদিন তো এতো পরিষ্কার থাকে না। কিছুটা থেমে গিয়ে ফের তিনি বলেন, সবসময় যদি হাসপাতাল এমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতো, তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো।
পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা আরেক রোগীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তিনি বলেন, কে যেনো আসবে, তাই আজ সবকিছু পরিষ্কার। গোসলখানা, ওয়াশরুম সবকিছু একেবারে চকচকে করে ফেলেছে। অন্যদিন এমন দেখি না। তার কথাতেও ছিল একই আকাঙ্ক্ষা-- হাসপাতাল যেনো শুধু বিশেষ দিনের জন্য নয়, প্রতিদিনই পরিচ্ছন্ন থাকে। সবসময় পরিবেশ যদি এমন হতো, তাহলে এখানে সেবা নিতে আসা সবার জন্যই ভালো হতো।
রোগীদের কথার মধ্যে তাই একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল কি শুধু পরিদর্শনের দিনের জন্য? নাকি রোগীরও প্রতিদিন এমন পরিবেশ পাওয়ার অধিকার আছে? এ প্রশ্ন নিয়েই কথা হয় ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েলের সঙ্গে। জানতে চাওয়া হয় কীভাবে এক সকালেই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার চিত্র এতোটা বদলে গেলো? জবাবে তিনি জনবল সংকটের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, হাসপাতালে পাঁচজন পরিচ্ছন্নকর্মী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তারপরও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে বাস্তবতার একটি দিক স্পষ্ট, জনবল কম। কিন্তু রোগীদের প্রশ্নও উড়িয়ে দেয়ার নয়। বিশেষ দিনে যে পরিচ্ছন্নতা সম্ভব হয়, সাধারণ দিনেও সেটি ধরে রাখার ব্যবস্থা কেনো হবে না?
দিনশেষে মন্ত্রীর গাড়ি চলে যাবে। কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা কমে আসবে। করিডোরে আবারও শোনা যাবে রোগীর কাশি, স্বজনের হাঁকডাক, নার্সের পদচারণা। কিন্তু ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই এক সকাল থেকে যাবে একটি দৃশ্যমান প্রশ্ন হয়ে। যদি মন্ত্রী আসার খবরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বারান্দার পানি শুকিয়ে যায়, মেঝে চকচকে হয়, ফ্যান পরিষ্কার হয়, ওয়াশরুম ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে করা যায়, নতুন ডাস্টবিন বসে, লিক হওয়া পাইপ সারানো যায়। তবে প্রতিদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে আসা সাধারণ মানুষের জন্য সেই তৎপরতা কেনো থাকবে না? মন্ত্রী প্রতিদিন আসবেন না।
রোগী কিন্তু প্রতিদিনই আসেন। আর হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কোনো অতিথিকে দেখানোর আয়োজন নয়, এটি রোগীর প্রাপ্য।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








