প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:৫১
ফরিদগঞ্জে ৮ একর জমিতে পাইওনিয়ার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারি মাছের পোনা উৎপাদনে সফল উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন মানিক

মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে মৎস্য খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সফল মাছ চাষের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মানসম্মত পোনা। গুণগত মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন ফরিদগঞ্জ উপজেলার লোহাগড়া গ্রামের উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন মানিক।
১৯৯৬ সালে মাত্র অল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করা তঁার ‘পাইওনিয়ার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারি’ বর্তমানে ৮ একর জমিতে বিস্তৃত। নিজস্ব ও লিজ নেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারের জলাশয়ে বঁাশের খুঁটি ও নেট দিয়ে বিশেষ ঘের তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘেরে যত্নসহকারে পোনা লালন-পালন করা হচ্ছে। ছোট নৌকায় চড়ে শ্রমিকেরা পোনা সংগ্রহ, পরিচর্যা ও স্থানান্তরের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কর্মরত শ্রমিকেরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে থাইল্যান্ডের থাই মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ মাছ সাধারণত ৬ থেকে ৭ মাস লালন-পালন করা হয়; তবে এক বছর পর্যন্ত চাষ করলে মাছের আকার ও ওজন আরও বৃদ্ধি পায়। তেলাপিয়ার পাশাপাশি এখানে রুই, মৃগেল, কালিবাউশ, পাঙ্গাশ ও কাতলাসহ বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন ও বিক্রি করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি কেবল পোনা নয়, বরং রেণু এবং মা মাছও বিক্রি করে থাকে। মৎস্যচাষিরা তাদের খামারের ধরন ও চাহিদা অনুযায়ী পছন্দসই পোনা সংগ্রহ করেন। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্যÑমানসম্মত পোনা সরবরাহের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চাষিদের লাভজনক অবস্থায় পেঁৗছাতে সহযোগিতা করা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ডা. মো. মাহমুদ-ই-এলাহী জানান, “বাংলাদেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে মৎস্য খাতের ভূমিকা অপরিসীম। এ খাতকে এগিয়ে নিতে মানসম্মত পোনা উৎপাদন, আধুনিক চাষপদ্ধতি, পানির গুণগত মান বজায় রাখা এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পাইওনিয়ার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারি প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। ৮ একর জমিতে ১০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান স্থানীয় পর্যায়ে একটি চমৎকার উদ্যোগ। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বজায় থাকলে এ খামার ভবিষ্যতে আরও বড় সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা লোহাগাড়ার হাজী আহম্মদ আলী মিয়াজী বলেন, “মৎস্য খাতে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পোনা উৎপাদন, পরিচর্যা, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। স্থানীয় চাষিরা হাতের কাছেই মানসম্মত পোনা পাওয়ায় তাদের পরিবহন খরচ অনেক কমে গেছে। প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হ্যাচারি দেখতে এবং পোনা কিনতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষি ও দর্শনার্থীরা আসেন।”
একই এলাকার বাসিন্দা মো. লিয়াকত হোসেন জানান, পাশে লোহাগাড়ার ঐতিহাসিক মঠ এবং ডাকাতিয়া নদীর পাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই হ্যাচারিটি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। পোনা নিতে আসার পাশাপাশি অনেকে এখানকার মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে আসেন।
পাইওনিয়ার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী মোশারফ হোসেন মানিক বলেন, “আমাদের হ্যাচারি কেবল মাছের পোনা বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় তরুণ ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ১০ জন শ্রমিক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।”
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, “মাছের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত পোনার বিকল্প নেই। পোনা লালন-পালনে পানির গুণগত মান, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি বিধিবিধান ও হ্যাচারি নিবন্ধন মেনে কাজ করতে হয়। পাইওনিয়ার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারি সুনামের সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা এসব বিষয়ে সচেতন থাকলে দেশের মৎস্য খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।”






