শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৫৩

মেঘ ফিরে চলল

শিকদার বাসির

জিপগাড়িটির নাম ছিল ‘মেঘ’।

বাবা বলতেন, “মেঘ যেমন আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়, এই গাড়িও তেমনি আমাদের নিয়ে ঘুরবে অজানার পথে।”

আমার বয়স তখন দশ। এক শরতের ছুটিতে বাবা মেঘকে নিয়ে আমাদের পাহাড়ে বেড়াতে গেলেন। চারদিকে শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর দূরের ঢালে ফুটে থাকা কাশফুল। পাহাড়ি পথের দুপাশের সবুজে নরম রোদ ঝরে পড়ছিল। মেঘের ইঞ্জিনের গর্জনের সঙ্গে বাবার গাওয়া পুরোনো গান মিশে যাচ্ছিল বাতাসে।

এক বঁাকে মা হেসে বলেছিলেন, “এই গাড়িটার মধ্যে নিশ্চয়ই জাদু আছে। উঠলেই মনে হয়, আরও দূরে চলে যাই।”

বাবা হেসে বলেছিলেন, “জাদু গাড়িতে নয়, পথের মধ্যে।”

সেদিন কথাটার মানে বুঝিনি।

বছর কেটে গেল। আমি বড় হলাম। বাবার চুলে পাক ধরল। আর মেঘের গায়ে উঠল মরচে। একসময় তার ইঞ্জিন থেমে গেল। উঠোনের এক পাশে সে দঁাড়িয়ে রইল নিঃশব্দে।

বাবা তখন ডাক্তারি থেকে অবসর নিয়েছেন। গাড়িটি আর কোথাও যেত না। তবু প্রতিদিন সকালে বাবা মেঘের গা মুছতেন, জানালার কাচ পরিষ্কার করতেন, ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকতেন।

একদিন আমি বললাম, “বাবা, গাড়িটা তো আর চলে না। এত যত্ন করো কেন?”

বাবা মেঘের গায়ে হাত রেখে বলেছিলেন, “সবকিছু কি চলার জন্যই থাকে? কিছু জিনিস থেকে যায়Ñআমাদের মনে।”

কয়েক মাস পর বাবা অসুস্থ হলেন। সেদিন জীবনে প্রথমবার মেঘের কোলে বাবাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। যে হাত একদিন আমাকে মেঘের স্টিয়ারিং ধরতে শিখিয়েছিল, সেই হাত সেদিন নিস্তেজ হয়ে আমার কঁাধে এসে ঠেকেছিল।

হাসপাতালের কেবিনে শেষ রাতে বাবা আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বললেন, “মেঘকে আবার চালাবি।”

আমি কিছু বলতে পারিনি।

বাবা মৃদু হেসে বললেন, “ওর সঙ্গে আমার অনেক পথ বাকি।”

পরদিন বাবা চলে গেলেন।

পরের শরতে এক সকালে আমি উঠোনে গিয়ে মেঘের দরজা খুললাম। ভেতরে পুরোনো চামড়ার গন্ধ। ড্যাশবোর্ডে বাবার ছেঁায়ার মতো ধুলো জমে আছে।

মিস্ত্রির সাহায্যে অনেকদিন পর ইঞ্জিনে প্রাণ ফিরল। চাবি ঘোরাতেই মেঘ কেঁপে উঠল। তারপর গর্জে উঠল গভীর, কর্কশ অথচ পরিচিত এক শব্দে।

স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।

আমি মেঘকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সেই পাহাড়ি পথে।

এক বঁাকে গাড়ি থামালাম। সামনে নীল পাহাড়, মাথার ওপর সাদা মেঘ।

হঠাৎ বাবার কণ্ঠ মনে হলো

“জীবনের পথও অঁাকাবঁাকা। পথ যতই কঠিন হোক, থামিস না।”

আমি আবার গাড়ি চালালাম।

মেঘের চাকায় ধুলো উড়ল।

আর মনে হলো বাবাও বুঝি পাশে বসে আছেন।

এইবার মেঘ শুধু পথে ফিরল না।

ফিরে এল বাবার সঙ্গে আমার হারানো শৈশবও।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়