শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৫২

শিশুর শিখনে লেসন প্ল্যান ও শিক্ষকের বহুমুখী দক্ষতা

রাশেদা আতিক রোজী

ছোট শিশুরা হচ্ছে কাদামাটির মতো। তাদের যেভাবে গড়ে তোলা হয়, সেভাবেই তারা গড়ে ওঠে। লেসন প্ল্যান হলো এমন একটি কাঠামো, যা শিক্ষকের সময় বঁাচায়। একই সঙ্গে এটি শিশুদের জন্য শিক্ষাকে সহজ, আনন্দদায়ক ও স্থায়ী করে তোলে।

লেসন প্ল্যানের মাধ্যমে শিক্ষক আগে থেকেই নির্ধারণ করতে পারেন, পাঠ শেষে শিশুটি ঠিক কী শিখবে বা অর্জন করবে। এটি এলোমেলো আলোচনা কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক পাঠদানে সাহায্য করে।

একটি নির্দিষ্ট ক্লাসের সময়সীমা, যেমন ৩০ বা ৪০ মিনিট, খুবই সীমিত। পাঠ পরিকল্পনা থাকলে কোন অংশে কত সময় ব্যয় হবে, তা সঠিকভাবে বণ্টন করা যায়। যেমনÑভূমিকা, দলগত কাজ ও মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা যায়।

লেসন প্ল্যানের মাধ্যমে শিখন-শেখানো সামগ্রীও সঠিকভাবে প্রস্তুত করা যায়। শিশুদের ভিজ্যুয়াল ও হ্যান্ডস-অন অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে শেখাতে হয়। পরিকল্পনা থাকলে শিক্ষক আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ছবি, চার্ট, মডেল বা ফ্ল্যাশকার্ড গুছিয়ে রাখতে পারেন।

শিশুরা দীর্ঘ সময় একটানা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই লেসন প্ল্যানে খেলাধুলা, ছড়া, গান বা দলগত কাজের সমন্বয় রাখা হয়। এতে শ্রেণিকক্ষ প্রাণবন্ত ও আনন্দময় থাকে।

ক্লাসের সব শিশুর শেখার গতি এক নয়। একজন দক্ষ শিক্ষক পাঠ পরিকল্পনায় ধীরগতির ও দ্রুতগতির উভয় ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা কৌশল যুক্ত করতে পারেন।

পাঠ শেষে শিশুরা কতটুকু বুঝতে পেরেছে, তা যাচাই করার জন্য উপযুক্ত প্রশ্ন বা ছোট অ্যাক্টিভিটি লেসন প্ল্যানে যুক্ত থাকে। এটি শিক্ষকের নিজের পাঠদান কৌশলেরও প্রতিফলন ঘটাতে সাহায্য করে।

আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: সুসংগঠিত লেসন প্ল্যান শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটি শ্রেণিকক্ষে আকস্মিক বিশৃঙ্খলা বা দ্বিধা দূর করতেও সাহায্য করে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষ প্রতিদিন নানান বৈচিত্র্য ও চ্যালেঞ্জে পূর্ণ থাকে। শিক্ষকতার মূল ভিত্তি হলো হার্ড স্কিল বা বিষয়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর ওপর দক্ষতা, পাঠ পরিকল্পনা তৈরি এবং মূল্যায়নের কৌশল।

কিন্তু বাস্তবতায় কোনো ক্লাসে হয়তো একসঙ্গে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকে। আবার কোথাও টিচিং এইডসের তীব্র অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল একাডেমিক জ্ঞান দিয়ে সফলভাবে পাঠদান করা অসম্ভব।

মূলত, এই হার্ড স্কিল বা কঠিন দক্ষতাগুলোকে শ্রেণিকক্ষে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য কোমল দক্ষতা অনস্বীকার্য। শিক্ষক যখন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে ধৈর্য, সহানুভূতি ও যোগাযোগের মতো কোমল দক্ষতার সংমিশ্রণ ঘটান, তখনই শ্রেণিকক্ষের শেখার পরিবেশ শতভাগ কার্যকর হয়ে ওঠে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে লেসন প্ল্যানে কিছু কোমল দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ নিচে তুলে ধরা হলোÑ

১. সহানুভূতি

শিক্ষার্থী শুধু পড়া পারলো কি না, তা না দেখে তার পেছনের মানসিক বা শারীরিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করা।

উদাহরণ: ১ম শ্রেণির রনি ক্লাসে প্রায়ই মনোযোগ দেয় না এবং পেছনের বেঞ্চে ঝিমায়। তাকে বকাঝকা না করে শিক্ষক আড়ালে ডেকে নরম সুরে জানতে চাইলেন, “রনি, রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়েছিল? সকালে কিছু খেয়েছ?”

জানা গেল, রনির বাবা অসুস্থ থাকায় রাতে ঘরে রান্না হয়নি। সে খালি পেটে স্কুলে এসেছে। শিক্ষক তাকে মিড-ডে মিলের বিস্কুট বা খাবার দিলেন।

শিক্ষক বিরক্ত না হয়ে সহানুভূতি দেখানোর ফলে রনি নিজেকে নিরাপদ ভাবল। স্কুলে আসার আগ্রহও তার ফিরে পেল।

২. ধৈর্য

বড় শ্রেণিকক্ষে সব শিশুর শেখার গতি এক নয়। তাই ধৈর্য ধরে পিছিয়ে পড়া শিশুদের পাশে থাকা প্রয়োজন।

উদাহরণ: ৩য় শ্রেণির রিফাত কিছুতেই “গুণের নামতা” বুঝতে পারছে না। ক্লাসের অন্য সবাই পারলেও সে বারবার ভুল করছে।

শিক্ষক বিরক্ত না হয়ে তাকে আলাদা ডেকে হেসে বললেন, “কোনো সমস্যা নেই রিফাত, আমরা মার্বেল গুনে গুনে আরেকবার চেষ্টা করি।”

তিনি রিফাতকে ৫ মিনিট আলাদা সময় দিলেন। শিক্ষকের এই ধৈর্য দেখে রিফাত হীনম্মন্যতায় না ভুগে বারবার চেষ্টা করার সাহস পেল।

৩. অভিযোজন ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা

উপকরণের অভাব বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায়ে পড়াকে আনন্দদায়ক করে তোলা।

উদাহরণ: বর্ষাকালে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষ অন্ধকার হয়ে গেল। গরমও বেড়ে গেল। বিজ্ঞান ক্লাসে প্রজেক্টর বা চার্ট ব্যবহার করার উপায় নেই।

শিক্ষক পড়া থামিয়ে না দিয়ে সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে স্কুলের বারান্দায় বা গাছের নিচে গোল হয়ে বসলেন। সেখানে বসেই গাছের পাতা, ফুল ও মাটির উপাদানের সরাসরি উদাহরণ দিয়ে বিজ্ঞানের পাঠটি শেষ করলেন।

এতে পড়াটি বইয়ের চেয়েও বেশি কার্যকর হলো।

৪. স্পষ্ট যোগাযোগ ও সক্রিয় শ্রবণ

শিশুদের ভাষায় সহজ করে কথা বলা এবং তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে শিশুরা অনেক সময় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। শিক্ষক যদি শহুরে বা কঠিন বাংলায় বকা দেন, শিশুটি চুপসে যাবে।

এর বদলে শিক্ষক হাসিমুখে শিশুর আঞ্চলিক শব্দটিকে প্রমিত বাংলায় বুঝিয়ে বললেনÑ

শিক্ষার্থী: “স্যার, হেতে আমার খাতা টানি লইছে!”

শিক্ষক: “ওহ! ও তোমার খাতাটা নিয়ে নিয়েছে? এসো, আমরা সুন্দর করে বলিÑ‘সে আমার খাতাটি নিয়েছে।’ এখন চলো দেখি খাতা নিয়ে কী হয়েছে।”

এতে শিশুটি অপমানিত বোধ না করে সঠিক বাংলা শিখল। একই সঙ্গে নিজের সমস্যাও বলতে পারল।

৫. দ্বন্দ্ব নিরসন

কোমলমতি শিশুদের মধ্যকার মারামারি বা ঝগড়া ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা।

উদাহরণ: টিফিনের সময় ফুটবল খেলা নিয়ে ৪র্থ শ্রেণির দুই দল শিক্ষার্থীর মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো।

শিক্ষক কোনো পক্ষকে ঢালাওভাবে শাস্তি না দিয়ে দুজনকে আলাদা ডেকে বসালেন। তাদের প্রত্যেকের কথা মন দিয়ে শুনলেন।

তিনি বললেন, “খেলায় হার-জিত থাকবেই, কিন্তু তোমরা তো বন্ধু। তোমরা মারামারি করলে খেলাটাই বন্ধ হয়ে যাবে।”

এরপর তিনি দুজনকেই হাত মেলানোর ব্যবস্থা করে দিলেন।

৬. সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তি

সব ধর্ম, নৃগোষ্ঠী ও শারীরিক সামথের্যর শিশুকে সমান চোখে দেখা ও সম্মান করা।

উদাহরণ: পার্বত্য অঞ্চলের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তঞ্চঙ্গ্যা বা চাকমা সম্প্রদায়ের নতুন এক শিশু ভর্তি হলো। সে ভালো বাংলা বলতে পারে না।

শিক্ষক ক্লাসের সবাইকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় তার ভাষার একটি সুন্দর শব্দ, যেমন অভিবাদন জানানো, পুরো ক্লাসকে শেখালেন।

এতে নবাগত শিশুটি নিজেকে আলাদা না ভেবে সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারল।

৭. প্রেষণা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

শিশুর ছোট সাফল্যকেও বড় করে দেখা এবং তাকে উৎসাহিত করা।

উদাহরণ: যে শিশুটি কোনোদিন হাতের লেখা সুন্দর করতে পারে না, সে যেদিন সামান্য ভালো লিখল, শিক্ষক তার খাতায় একটি লাল কালির “খুব ভালো!” লিখে নিচে একটি ‘স্টার’ এঁকে দিলেন।

পুরো ক্লাসকে বললেন, তার জন্য তালি দিতে। এই একটি ছোট উৎসাহ শিশুটিকে প্রতিদিন খাতা পরিষ্কার করে লেখার প্রেরণা দেয়।

শিক্ষকতা কেবল জ্ঞান বিতরণের কাজ নয়। এটি হৃদয় দিয়ে হৃদয়কে ছেঁায়ার শিল্প।

আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকের সামান্য কোমল দক্ষতা ও ইতিবাচক আচরণ একটি শিশুর জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

লেসন প্ল্যান বা পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে পড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের আগেই যে শিশুরা সঠিক প্রাক-প্রাথমিক বা ঘরোয়া শিখন পায়, পরবর্তীতে তাদের পড়ার প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। ঝরে পড়ার ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।

নৈতিকতা, সততা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রাথমিক শিক্ষা শিশুকালেই অর্জিত হয়। এই শিখন পরবর্তী জীবনে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।

প্রতিটি কাজ শিশু শ্রেণি থেকেই পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষক শেখালে শিশুর কাছেও সেই পড়াটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়।

রাশেদা আতিক রোজী : ইনস্ট্রাক্টর, শিক্ষাকর্মী ও গবেষক, ইউপিইটিসি, চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়