শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৫০

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের বয়সন্ধিকালীন সুরক্ষা

রোকেয়া সুলতানা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের বয়সন্ধিকালীন সুরক্ষা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উচ্চতর শ্রেণিতে, বিশেষ করে ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত মেয়ে শিশুরা জীবনের একটি স্পর্শকাতর সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। এ সময় তারা শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। এই সময়কে বলা হয় বয়সন্ধিকাল।

এ সময় সঠিক তথ্য, মানসিক নিরাপত্তা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব থাকলে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এমনকি তাদের ঝরে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।

বিদ্যালয়ে নিরাপদ, সহমর্মিতাপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ ত্রিপক্ষীয় মেলবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা

বয়সন্ধিকালীন সুরক্ষা কেবল একটি সামাজিক বা অবকাঠামোগত বিষয় নয়। এটি একটি গভীর মানসিক ও শিক্ষাগত চাহিদা।

ভীতি ও সামাজিক সংকোচ দূরীকরণ: অধিকাংশ মেয়ে শিশু লজ্জা ও সংকোচের কারণে শারীরিক পরিবর্তনের কথা কাউকে বলতে পারে না।

সহিংসতা ও বুলিং প্রতিরোধ: বিদ্যালয়ে সমবয়সী ছেলে শিশু বা সহপাঠীদের হাসাহাসি ও অসচেতন আচরণ প্রতিরোধে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা প্রয়োজন।

শিক্ষায় ধারাবাহিকতা রক্ষা: সুস্থ শারীরিক ও মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পিরিয়ডকালীন অনুপস্থিতির হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।

ত্রিপক্ষীয় মেলবন্ধন গড়ে তোলার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ

ক. প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা

প্রশাসনিক ও নীতিগত সহায়তা: প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক হিসেবে জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিতের দিকনির্দেশনা দেবেন।

সংবেদনশীল নেতৃত্ব প্রদান: বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে প্রধান শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন: মেয়েদের জন্য আলাদা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করতে হবে। স্লিপ ফান্ড ও স্থানীয় সহায়তায় মেয়েদের জন্য পৃথক টয়লেট, সাবান ও নিরাপদ পানির সংস্থান রাখা যেতে পারে। স্যানিটারি প্যাড ফেলার জন্য ঢাকনাযুক্ত বিনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

জরুরি স্যানিটারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা: প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে বিদ্যালয়ে স্থায়ী ‘জরুরি স্যানিটারি কিট/প্যাড ব্যাংক’ স্থাপন করা যেতে পারে। এর জন্য বাজেট অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

খ. সহকারী শিক্ষকের ভূমিকা

নিবিড় মেন্টরশিপ ও বিশ্বস্ততা তৈরি: সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে ‘ফোকাল মেন্টর’ নির্বাচন করা যেতে পারে।

অন্তর্মুখী মেয়ে শিশুরা প্রধান শিক্ষকের চেয়ে সহকারী শিক্ষকের, বিশেষত নারী শিক্ষকের সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারে। তাই অন্তত একজন নারী সহকারী শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের সরাসরি মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

সহজাত ও বৈজ্ঞানিক পাঠদান: শারীরিক ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে সংকোচহীনভাবে সহজ ভাষায় খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।

ছেলে শিশুদের সচেতন করা: বয়সন্ধিকালীন বিষয়গুলোকে কৌতুক বা হাসাহাসির বিষয় হিসেবে না দেখে সহমর্মিতার সঙ্গে দেখার জন্য ছেলে শিশুদের মানসিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

গ. মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

নেতৃত্ব ও মুক্ত প্রকাশ: স্টুডেন্ট লিডারশিপ বা হেলথ ক্লাব গঠন করা যেতে পারে।

৫ম শ্রেণির মেয়েদের সমন্বয়ে একটি ছোট দল গঠন করা যেতে পারে। তারা সহপাঠীদের শারীরিক বা মানসিক যেকোনো সমস্যা ফোকাল শিক্ষকের কাছে পেঁৗছে দেবে।

মালিকানার অনুভূতি: স্যানিটারি কর্নার ও প্যাড ব্যাংকের হিসাব রাখা এবং টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা তদারকিতে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথও নিরাপদ রাখা জরুরি। যাতায়াতের পথে মেয়ে শিশুরা যেন ইভটিজিং বা হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের যৌথভাবে নজর রাখতে হবে। কোনো সমস্যা হলে প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানাতে হবে।

অভিভাবক ও প্রধান শিক্ষকের সমন্বিত উদ্যোগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুদের বয়সন্ধিকালীন সুরক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে অভিভাবক এবং প্রধান শিক্ষকের সমন্বিত উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

অনেক সময় সচেতনতার অভাব বা সামাজিক সংকোচের কারণে অভিভাবকরা এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দ্বিধা করেন। তবে অভিভাবকরা এগিয়ে এলে প্রধান শিক্ষকের পক্ষে বিদ্যালয়ে একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা অনেক সহজ হয়।

অভিভাবকরা, বিশেষ করে মায়েরা, যেভাবে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেনÑ

১. মা-সমাবেশ ও পিটিএ সভায় সক্রিয় অংশগ্রহণ

নিয়মিত উপস্থিতি ও খোলামেলা আলোচনা: বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত মা-সমাবেশ বা অভিভাবক-শিক্ষক সমিতির (পিটিএ) সভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতে হবে। মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে সংকোচ না করে আলোচনা করতে হবে।

বিদ্যালয়ের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া: বাড়িতে সন্তান কোনো অস্বস্তি বা ভয়ের কথা বললে তা সরাসরি প্রধান শিক্ষককে জানাতে হবে। যেমনÑটয়লেটের অপরিচ্ছন্নতা, সহপাঠীদের কৌতুক বা স্যানিটারি প্যাডের অভাব। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

২. জরুরি স্যানিটারি ব্যাংক ও ওয়াশ সুবিধায় সহায়তা

‘প্যাড ব্যাংক’-এ স্বেচ্ছায় অনুদানে অংশগ্রহণ: প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে জরুরি স্যানিটারি প্যাডের যে উদ্যোগ নেন, তাতে অভিভাবকরা সামথর্য অনুযায়ী অংশ নিতে পারেন।

তারা স্যানিটারি প্যাড, সাবান বা টিস্যু দান করতে পারেন। তহবিল তৈরিতেও সাহায্য করতে পারেন।

টয়লেট ও ওয়াশ সুবিধা তদারকিতে সহায়তা: অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে মায়েরা মাঝে মাঝে বিদ্যালয়ের মেয়েদের টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা ও জলের সংস্থান ঠিক আছে কি না, তা দেখতে পারেন। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে গঠনমূলক পরামর্শ দিতে পারেন।

৩. স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে সামাজিক চাপ প্রদান

বাজেট বরাদ্দে প্রধান শিক্ষককে সমর্থন: বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভায় অভিভাবক প্রতিনিধিরা মেয়েদের স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটারি প্যাড বজর্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার জন্য বাজেট বরাদ্দের দাবি তুলতে পারেন।

এতে প্রধান শিক্ষকের জন্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সহজ হয়।

৪. বাড়ি ও বিদ্যালয়ের মধ্যে তথ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা

শারীরিক পরিবর্তনের খবর জানানো: সন্তানের প্রথম ঋতুস্রাব বা বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা শুরু হলে অভিভাবক, বিশেষ করে মা, যেন প্রধান শিক্ষক বা ফোকাল শিক্ষিকাকে তা জানান।

এতে শিশু বিদ্যালয়ে এলে শিক্ষকরা তার প্রতি বাড়তি খেয়াল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে পারেন।

কুসংস্কারমুক্ত মানসিকতা গড়ে তোলা: বাড়িতে মেয়েকে পিরিয়ড বা বয়সন্ধিকাল নিয়ে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দিতে হবে। এতে বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে আলোচনা হলে শিশু তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারবে।

দ্বিমুখী ফিডব্যাক ব্যবস্থা

এছাড়াও দ্বিমুখী ফিডব্যাক ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

‘আনন্দ ও কষ্টের বাক্স’

বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ বাক্স রাখা যেতে পারে। সেখানে শিক্ষার্থীরা নাম না লিখেও তাদের যেকোনো ভয়, শারীরিক সমস্যা বা পরামর্শের কথা জানাতে পারবে।

সহকারী শিক্ষক বক্সের চিঠিগুলো নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কোনো শিক্ষার্থীর নাম প্রকাশ না করে অ্যাসেম্বলি বা ক্লাসে সবাই মিলে তার সমাধান বের করা যেতে পারে।

বয়সন্ধিকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি নিরাপদ, সহমর্মিতাপূর্ণ ও ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে।

রোকেয়া সুলতানা : প্রধান শিক্ষক, হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীগঞ্জ, চঁাদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়