শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৩

কলসভরা সোনার মোহর

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
কলসভরা সোনার মোহর

নদীর তীরঘেঁষা একটা ছোট গ্রাম চরণদ্বীপ। গ্রামখানি আয়তনে ছোট। তবুও এ গাঁয়ের আছে ঝুড়িভরা কিংবদন্তির ইতিহাস। কিংবদন্তি মানে হলো লোকমুখে প্রচার হতে হতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা। নানারকম ভয়ের গল্পে এ গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা সমৃদ্ধ। এ যেন কিংবদন্তির হাট। বুড়োবুড়িদের মুখে মুখে ফোটে কিছু ভয়ঙ্কর কাহিনির শিহরণ জাগানো বয়ান। অনেক অনেক আগে এ গাঁয়ে এক কূলবধূ ছিলেন। নাম ছিলো চঞ্চলতা। তার ছিলো তিন ছেলে। প্রতিদিন রাতে তিনি ঘুমুলে শব্দ পেতেন, পুকুরের ঘাটে ঝন ঝনাৎ আওয়াজ হচ্ছে। শুনলেই বুঝা যায়, কোনো ধাতব কলস ঘাটে বাড়ি খেয়ে চলেছে। কলস ঘাটে বাড়ি খাওয়ার পর পর একজোড়া লালচোখ কালো মুখের আদল নিয়ে ফিসফিস করে তার শিয়রে দাঁড়িয়ে বলতো, চঞ্চলতা, ও চঞ্চলতা, কলসভরা মোহর নিবি? সোনার মোহর? কলস ভরা সোনার মোহরের লোভ দেখাতে দেখাতে লাল চোখা যক্ষ চঞ্চলতাকে একসময় ফাঁদে ফেলে দেয়। যক্ষরা হলো ধনের দেবতা কুবেরের অনুচর। আগেকার দিনের মানুষেরা বলতো, যক্ষরা নাকি গুপ্তধন পাহারা দেয়। মানে মাটির নিচে পুঁতে রাখা ধনরত্ন। যক্ষ প্রতিরাতে চঞ্চলতাকে রাজি করাতে আসে যাতে সে কলস ভরা সোনার মোহর নেয়। এভাবে যেতে যেতে একদিন সে বললো, তুই রাজি থাকলে আমি তোকে একশোটা করে সোনার মোহর ভর্তি সাতটা কলস দেবো। তুই নিতে রাজি হলে আমি তোকে ঘরে এনে দেবো। শুধু তোর একটা ছেলে দিবি। কলসভরা সোনার মোহরের লোভের ফাঁদে চঞ্চলতা পড়লেও সে কিন্তু তার ছেলেকে দেওয়ার কথা ভাবেনি। কয়েকদিন টানা বিরক্ত করার পর লাল চোখা যক্ষ আর আসেনি। কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবারো রাতদুপুরে যক্ষ এসে চঞ্চলতার কানে ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকে। ও চঞ্চলতা, চঞ্চলতা! সোনার মোহর নিবি নে? এবার ঘুমের ঘোরে চঞ্চলতা বলে ফেলেছে, দাও তাহলে কলসভরা সোনার মোহর। ব্যস্! বলতে যত সময় লাগলো। ওমনি গট গট করে কোথা থেকে জানি ঘরে একে একে সাতটা কলস এসে ঢুকলো। দেখেই বুঝা যায়, কলসগুলো মোহরে ভরা। চকচকে সোনার মোহর দেখে চঞ্চলতার পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এই মোহর লুকিয়ে রাখতে গেলেও বেশ বেগ পোহাতে হবে তাকে। কোনোমতে মাটির মেঝে খুঁড়ে রাতারাতি চঞ্চলতা আর তার স্বামী মিলে কলসগুলো পুঁতে ফেললো। তারপর তার ওপর পাটি বিছিয়ে তাদের বিছানা পেতে রাখলো। এতে আর বুঝবার অবকাশ নেই কারও, এখানে কী পোঁতা হয়েছে।

চকচকে সোনার মোহর পেয়ে চঞ্চলতার মুখে সুখের অন্ত নেই। যে কেউ এ উৎফুল্ল মুখ দেখেই বুঝতে পারবে, চঞ্চলা লক্ষ্মী তার মুখে থিতু হয়ে বুঝি গেঁড়ে বসেছে। এর দিন তিনেক পরে চঞ্চলতা পুকুর ঘাটে যায় চান করতে। সাথে তার ছোট ছেলেকেও নিয়ে যায়। শুকনো ধুন্দুলের জালিতে সাবান মাখিয়ে ছেলেকে ডলতে ডলতে একেবারে ময়লাশূন্য করে ফেললো। সাবানের গড়ানো পানি দেখেই টের পাওয়া যায়, ছেলেটা কি পরিমাণ ময়লা গায়ে মেখেছিলো! ছেলের গায়ের রঙ খোলতাই হতে দেখে চঞ্চলতা আরও সাবান লাগাতে গেছিলো ছেলের গায়ে। ওমনি তার হাত থেকে পিছলে পুকুরের জলে পড়ে গেলো তিন বছরের ছোট ছেলেটি। হায় হায় করতে করতে চঞ্চলতা নিজেই পুকুরে ডুব দিলো ছেলেকে তুলতে। কিন্তু সে কি আর আছে! যার নেওয়ার সে মুহূর্তেই টেনে নিয়ে গেছে মোহরের বিনিময় হিসেবে। চঞ্চলতা ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগল হয়ে গেলো। কিন্তু ছেলের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। জাল ফেলা হলো, জেলে নামানো হলো। কিন্তু না, কিছুতেই ছেলের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেলো না। দুচারদিন পরে, গভীর রাতে শোনা গেলো এক ছোট্ট বাচ্চা কাঁদছে। কান্নার উৎস বুঝি পুকুরঘাট! বাচ্চাটা ভয়ার্ত চিৎকারে যেন বলছে, মা বাঁচাও, মা বাঁচাও। পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও বুঝতে কষ্ট হয় না। এ কান্না শুনে চঞ্চলতা ছুটে গিয়েছিলো রাতে পুকুরের পাড়ে। কিন্তু না, কোথাও কেউ নেই। কেউ না। সেই হতে চঞ্চলতা আধা পাগল হয়ে যায়। অকারণ হাসে, অকারণ কথা বলে। নিজে নিজে, কেউ না থাকলেও। শিশুটির খেলনা পুতুলের গায়ে ধুন্দুলের জালি দিয়ে প্রতিদিন ঘষে, প্রতিদিন ধোয়। মুখে মুখে বলে, এত্ত ময়লা কোত্থেকে লাগালি? তোরে না বলছি, ধূলায় না গড়াতে।

আজও প্রতি অমাবশ্যায় গভীর রাতে পুকুরঘাট হতে শিশুর কান্নার আওয়াজ কানে আসে। ‘মা বাঁচাও! মা বাঁচাও!

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়