শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২

বন্যায় ভেসে যাওয়া ১০ বছরের আরিয়ানের পরিবার

সাদিয়া মজুমদার
বন্যায় ভেসে যাওয়া ১০ বছরের আরিয়ানের পরিবার

শ্রাবণ মাসের আকাশটা যেন কোনো এক গভীর অভিমানে ভেঙে পড়েছিল চট্টগ্রামের বুকে। টানা সাত দিনের অবিরাম বর্ষণ আর সেই সাথে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি মিলেমিশে পুরো বন্দরনগরীকে এক অচেনা জলরাজ্যে পরিণত করেছে। পাহাড়ী ঢল নেমে এসে শহরের ড্রেন আর খালগুলোকে গ্রাস করেছে অনেক আগেই। বহদ্দারহাট, চকবাজার, জিইসি মোড় থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক এলাকা খাতুনগঞ্জের শত শত গুদাম এখন পানির নিচে ভাসছে। কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে।

নগরের এক কোণে, কাপাসগোলা এলাকার একটি ছোট্ট আধাপাকা ঘরে বাস করে দশ বছরের ছেলে আরিয়ান এবং তার পরিবার। ঘরের মেঝেতে যখন পানি গোড়ালি ছুঁয়েছিল, তখন আরিয়ানের বাবা জলিল মিয়া খাটের চার পায়ার নিচে ইট দিয়ে উচ্চতা বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির শক্তির কাছে সেই চেষ্টা খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানি যখন কোমর সমান উচ্চতায় পৌঁছাল, তখন ঘরের আসবাবপত্র, আরিয়ানের স্কুলের ব্যাগ, আর মায়ের সাধের রান্নার জিনিসপত্র সব ভাসতে শুরু করল। শেষমেশ ঘরের মায়া ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না।

আরিয়ান তার প্রিয় সাদা বিড়ালছানা ‘মিন্টু’কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বাবার হাতটা চেপে ধরল। বাইরে তখন থইথই অথৈ পানি, তীব্র স্রোতে যেন এক একটা চেনা রাস্তাই একেকটি উত্তাল নদী হয়ে উঠেছে। বুক সমান পানি মাড়িয়ে, বৃষ্টির ঝাপটা সহ্য করে তারা যখন স্থানীয় একটি বহুতল স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাল, ততক্ষণে রাতের অন্ধকার চারপাশকে আরও ভয়ানক করে তুলেছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, চারদিকে শুধু মানুষের হাহাকার আর শিশুদের কান্নার আওয়াজ।

আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্রটা ছিল এক অদ্ভুত সমতার। সেখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ ছিল না; বহুতল ভবনের বাসিন্দারাও ফ্ল্যাট ছেড়ে নিচে নেমে এসেছে, আর বস্তির মানুষও এক ছাদের নিচে ঠাঁই নিয়েছে। সবার চোখে-মুখে এক অজানা আতঙ্ক। আরিয়ানের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার প্রিয় গল্প বই আর খেলনাগুলো ঘরের নোংরা পানিতে ভেসে যেতে দেখে। ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে সে যখন প্রায় অচেতন, তখনই ঘটল এক অন্যরকম ঘটনা। গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ, তখন দূর থেকে আলো আর মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। আরিয়ান জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, শহরের একদল সাধারণ তরুণ-যুবক বুক সমান নোংরা পানি ভেঙে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বড় বড় রান্নার ডেগ আর প্লাস্টিকের ড্রাম নিয়ে এগিয়ে আসছে। তারা কোনো সরকারি সাহায্য বা প্রচারণার জন্য অপেক্ষা করেনি; নিজেদের পকেটের টাকা জমিয়ে তারা তৈরি করেছে ‘ত্রাণ স্কোয়াড’।

আশ্রয়কেন্দ্রে এসে তারা সবার হাতে তুলে দিতে লাগল গরম খিচুড়ি, বিশুদ্ধ পানির বোতল আর শিশুদের জন্য দুধ। কেউ আবার পরম মমতায় বৃদ্ধদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ এগিয়ে দিচ্ছিল। সেই দুর্যোগের কালরাতেও এক কোণ থেকে ভেসে আসছিল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংসের চেনা সুবাস, যা এই কঠিন সময়েও ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত মানুষের মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে তুলছিল।

আরিয়ানের বাবা জলিল মিয়া এক দলা খিচুড়ি মুখে দিয়ে জানলার বাইরে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন: যত বড় আধুনিক শহরই আমরা বানাই না কেন বাবা, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে আমরা বড্ড অসহায়। কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষের এই কলিজাটাই আলাদা। বড় কোনো দুর্যোগ আসলেই বোঝা যায়, এখানকার মানুষ একে অপরকে কতটা ভালোবাসে। বিপদে এরা কখনো হাত ছেড়ে দেয় না।”

পরদিন ভোরে বৃষ্টির বেগ অনেকটাই কমে এল। আরিয়ান দেখল, কালো মেঘের বুক চিরে ভোরের সোনালী সূর্যের আলো এসে পড়েছে শহরের কর্দমাক্ত, শান্ত পানির ওপর। পানি হয়তো আগামী কয়েকদিনে নেমে যাবে, রাস্তাঘাট আবার শুকিয়ে যাবে, মানুষ ফিরে যাবে তাদের চেনা ব্যস্ততায়। কিন্তু এই ভয়াবহ বন্যা দশ বছরের আরিয়ানের মনে এক চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেল। সে বুঝল, প্রকৃতির দুর্যোগ যতই শক্তিশালী আর ধ্বংসাত্মক হোক না কেন, মানুষের ভেতরের পারস্পরিক ভালোবাসা, অদম্য সাহস আর সহমর্মিতার প্রাচীরকে তা কখনোই ভাঙতে পারে না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়