প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৪:১১
কেকের পাশে মৃত হাতি
কলেজ জীবন শেষ করে এখন যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে, তারা একটা বড়ো রিইউনিয়নের পরিকল্পনা করে। উপলক্ষ ছিল সামিউলের জন্মদিন। সামিউলÑবন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে চঞ্চল, সবচাইতে প্রাণবন্ত, আবার পরিকল্পনায় মাস্টার। অনেকদিন ধরেই বলে আসছিল, “এইবারের জন্মদিনটা হবে স্মরণীয়। পাহাড়ে, আকাশের নিচে, সত্যিকারের ‘ম্যাজিকাল’ কিছু। ”
তাই সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়া হবে।
নির্ধারিত দিন ভোরে একটি বাসে যাত্রা শুরু করে ওরা বারো জন বন্ধু। হাসি, গান, কার্ড খেলা, ফেসবুক লাইভÑসবকিছুর মধ্যে দিয়ে এক আনন্দময় যাত্রা। পাহাড়ের স্নিগ্ধতা, কুয়াশায় মোড়া গাছপালা আর দিগন্তজোড়া নীলিমা দেখে ওদের মন ভরে উঠছিল।
চূড়ায় উঠে রিসোর্টে পেঁৗছানোর পর, একটা ছোট কাঠের কটেজ বুক করা ছিল। চারপাশে ঝোপঝাড়, নিচে গভীর জঙ্গল, দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়Ñএমন জায়গায় জীবন যেন থেমে থাকে। রাতের জন্য ওরা প্রস্তুত ছিলÑবিবর্ণ বাল্বে সাজানো বারান্দা, কেক, কোল্ড ড্রিংকস, বারবিকিউ আর... আতশবাজি।
“এইটা না থাকলে জন্মদিন জমে না ভাই,”Ñবলেছিল রাফি, গর্বভরে ব্যাগ থেকে আতশবাজির প্যাকেট বের করে।
রাত দশটা নাগাদ কেক কাটার সময় আসে। সামিউল কেক কাটছে, সবাই ‘হ্যাপি বার্থডে’ গাইছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে। এমন সময় হঠাৎ এক গর্জনের মতো শব্দ! রাফি আতশবাজি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মুহূর্তে আকাশ রঙিন হয়ে উঠল। লাল, নীল, সবুজ আলোতে পাহাড় যেন ঝলসে উঠল। গর্জনের মতো শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
সেই মুহূর্তেই, নীচের জঙ্গল থেকে একটা গর্জন শোনা গেল।
কেউ প্রথমে বুঝতে পারল না।
তারপর... যেন চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
একটু পরে দূরে কঁাদো-কঁাদো শব্দে বন জেগে উঠল। কেউ বলল, “হাতির ডাক!”
কে বলল জানে না, কিন্তু সবাই যেন বুঝতে পারল কিছু একটা ঠিক হয়নি।
রাতটা ঘুমহীন কাটল।
পরদিন সকালে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা এসে রিসোর্টের পাশের ঝেঁাপ থেকে সবাইকে একটু দূরে নিয়ে গেল। সেখানে দেখা গেল একটি বিশাল মাদি হাতির নিথর দেহ। চোখ খোলা, অথচ প্রাণহীন। পাশে এক ছোট্ট গর্ত। কর্মকর্তারা জানাল, “ও গর্ভবতী ছিল। আতশবাজির বিকট শব্দে ভয়ে পাগল হয়ে ছুটেছিল। দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে যায়। হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়। ”
একজন কর্মকর্তা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, শহর থেকে এসে আনন্দ করেন, সেটা অন্যায় নয়। কিন্তু পাহাড়ে, জঙ্গলে যারা বাস করে, তাদের অনুভবের মূল্য কি একদমই নেই?”
ওই মুহূর্তে সবার মাথা নিচু।
কেকের ছবি, ফেসবুক লাইভ, ঝলমলে ভিডিওÑসব যেন হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে উঠল। স্মৃতি আর আনন্দ মিশে এখন এক অসহনীয় ভার।
শুধু সামিউল নয়, সবাই বুঝে গেলÑজন্মদিন স্মরণীয় হয়েছে ঠিকই, তবে অন্য এক অর্থে।
রিসোর্টের বারান্দায় বসে সামিউল নিঃশব্দে কেকের এক টুকরো চেয়ে নিল।
“এই কেক কি আমাদের অনুশোচনার স্বাদ মুছে ফেলতে পারবে?”Ñজিজ্ঞেস করল সে।
জুবায়ের তখন বলেছিল, “আমরা মানুষ হয়েছি, কিন্তু মনুষ্যত্ব?”
দিনটা আর কাটল না। সবার মুখে কেমন নিষ্প্রাণ এক স্তব্ধতা। প্রতিটা শব্দ যেন ভারি হয়ে উঠছিল।
তুষার হঠাৎ বলে উঠল, “এই জায়গাটায় আমরা গতকাল হাসছিলাম। আজ শুধু নিঃশব্দতা। ”
মাহির, যে সবার মাঝে সবচেয়ে সংবেদনশীল, হঠাৎ কান্না চেপে রাখতে পারল না।
“একটা প্রাণীর মৃত্যুর জন্য আমরাই দায়ী! তার পেটের বাচ্চাটাও... ও তো পৃথিবীর আলো দেখতেই পারল না!”
নীরবতা ছিন্ন করে সামিউল বলল, “আমরা যদি জানতাম, তাহলে তো কখনো...”
কথা শেষ হলো না। কারণ সবাই জানত, “জানা” না জানার অজুহাত নয়। এখনকার পৃথিবীতে দায়িত্ব না নেওয়া অপরাধ।
সন্ধ্যাবেলা বন বিভাগের এক কর্মকর্তা আবার এলো। পরিচয় দিলÑনাম মেহরাব ভাই। বয়স চল্লিশের আশেপাশে, কিন্তু চোখের নিচে গভীর ক্লান্তির রেখা।
তিনি বললেন, “আপনারা যদি সত্যিই অনুতপ্ত হন, তাহলে শুধু দুঃখ করে লাভ নেই। সচেতনতা গড়তে হবে। মানুষের মধ্যে বার্তা ছড়িয়ে দিনÑএই পাহাড়ে, এই বনে, শব্দ মানেই ভয়। উৎসব যদি প্রাণ কেড়ে নেয়, তবে সেটা আর উৎসব নয়। ”
তার কথা যেন ছুরি হয়ে বিদ্ধ করছিল সবাইকে।
তবে মেহরাব ভাই চলে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে গেলেনÑ
“প্রত্যেক মৃত্যু একটা গল্প রেখে যায়। যদি তোমরা চাও, এই গল্পটা হতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। ”
ঢাকায় ফিরে আসার পর, দিনগুলো একদম বদলে গেল। কারো আর কোনো ফেসবুক লাইভ নেই, ঝলমলে হাসিমুখ নেই। এক ধরণের মৌনতা জেঁকে বসেছে।
তাদের বন্ধুত্বের আরেকটি রূপ দেখল সবাই। ওরা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলÑ
প্রতি বছর সামিউলের জন্মদিনে কোনো বড় আয়োজন নয়, বরং গাছ লাগানো হবে,
“সাইলেন্ট বার্থডে” নামে একটি পরিবেশ সচেতনতা উদ্যোগ শুরু করল।
রাফি ভিডিও বানাতে জানত, সে পরিবেশ বিষয়ে তথ্যচিত্র বানানো শুরু করল
মাহির বনবিভাগের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত ।
ঘটনার প্রায় এক বছর পর, ওরা আবার বান্দরবানে গেল।
এইবার কোনো কেক ছিল না, আতশবাজি তো দূরের কথা, মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিল। তারা গিয়েছিল একটা ছোট ফলজ গাছ নিয়ে, সেই জায়গায় লাগাতে, যেখানে সেই হাতিটি শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে সামিউলের চোখ ভিজে যাচ্ছিল।
পাশে দঁাড়িয়ে থাকা অন্য বন্ধু বলল, “যতদিন এই গাছ থাকবে, ততদিন আমাদের অপরাধের সাক্ষী থাকবে। আর সেইসাথে আমাদের পরিবর্তনেরও। ”
হঠাৎ আকাশে ঝিরঝির বৃষ্টি নামল। চারদিকের পাতা স্নিগ্ধ হয়ে উঠল। পাহাড় যেন আবার নতুন করে বঁাচতে শিখল।
সময় অনেক কিছু বদলায়। কিন্তু কিছু ঘটনা মানুষের মনোজগতের গায়ে কালি দিয়ে যায়।
তারা হয়তো ভুলে যেতে পারে না, কিন্তু শিখে নিতে পারে।
সেই বন্ধুরা এখন কেউ শিক্ষক, কেউ সাংবাদিক, কেউ প্রকৌশলী।
কিন্তু প্রত্যেকেই আজীবন বয়ে বেড়ায় সেই একটি রাতের আলো আর ছায়া।
একটি মৃত্যু শিখিয়ে দিয়েছিল জীবনের প্রকৃত মূল্য।
কখনো কোনো সেমিনারে, কখনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামনে, তারা আবার করে শোনায় সেই দিনের কথা
“আমরা মানুষ ছিলাম, কিন্তু সেদিন থেকে আমরা মানুষ হতে শিখেছি।”
বন্ধুত্ব
সাদিয়া মজুমদার
তুই আমার বান্ধবী হও বা না হও, আমার ভালোবাসার গল্পের সেরা নায়িকা শুধু তুই থাকবি...
কোনো এক বৃষ্টির রাতে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়,
“তোমার সবচেয়ে বড় অর্জন কী?”
আমি কোনো টাকা, বাড়ি বা সফলতার কথা বলবো না।
আমি বলবো,
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অর্জন হলো
তোকে বান্ধবী হিসেবে ভালোবাসতে পারা।
কারণ এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ আসে,
অনেক মানুষ চলে যায়,
কিন্তু সবাই হৃদয়ের এত গভীরে জায়গা করে নিতে পারে না।
তুই পেরেছিস।
তুই জানিস না,
তোর একটা “কেমন আছো?
মেসেজ আমার সবচেয়ে খারাপ দিনটাকেও সুন্দর করে দিতে পারে।
তোর একটা হাসি আমার হাজারটা কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে।
আর তোর একটা চোখের জল...
আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে দেয়।
আমি তোর কাছে নিখুঁত মানুষ হওয়ার দাবি করি না।
আমি শুধু চাই,
তুই যখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাবি,
তখন তোর পাশে দঁাড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন আমি হই।
তুই যখন ভেঙে পড়বি,
আমি তোর শক্তি হতে চাই।
তুই যখন ভয় পাবি,
আমি তোর সাহস হতে চাই।
তুই যখন কঁাদবি,
আমি তোর আশ্রয় হতে চাই।
আর তুই যখন হাসবি,
আমি দূর থেকে হলেও সেই হাসির কারণ হতে চাই।
মানুষ বলে,
সত্যিকারের বন্ধুত্ব নাকি পাওয়া যায় না।
আমি বলি,
বান্ধবী সত্যিকারের বন্ধুত্ব হলো এমন একজনকে পাওয়া,
যার সুখকে নিজের সুখের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
তুই সেই মানুষটা।
হয়তো আমি প্রতিদিন “ভালোবাসি” বলি না,
কিন্তু প্রতিদিন তোর জন্য দোয়া করি বান্ধবী ।
হয়তো সবসময় প্রকাশ করি না,
কিন্তু প্রতিদিন তোকে হারানোর ভয় পাই।
কারণ তুই আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়,
যেটা ছাড়া পুরো বইটাই অসম্পূর্ণ।
যদি কোনোদিন আমার চুল সাদা হয়ে যায়,
বয়স আমাকে দুর্বল করে দেয়,
হঁাটার শক্তি কমে যায়
তবুও আমি চাই,
আমার শেষ বিকেলের সূর্যটা তোর হাত ধরে দেখতে।
কারণ আমি তোর সাথে শুধু কিছু মুহূর্ত কাটাতে চাই না...
আমি তোর সাথে একটা পুরো জীবন কাটাতে চাই।
কাঠগোলাপী
ইসরাত জাহান তন্নি
আমি তো লেখালেখির সূচিটা কীভাবে করবো সেটাও ভুলে গিয়েছিলাম!
এক গভীর বাস ভবনে নিজের রাজত্ব ও শুরু করেছিলাম!
চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু সবুজ বনলতার খুন শুঁটি দেখতাম!
যেনো কোন দিন আমি কবিত্বময় জীবন বহন করিনি সেই পথে হঁাটা শুরু করেছিলাম!
কিন্তু না এ ঘোর আমার শতভাগের হলেও মনের কোথায় যেনো আপনি রয়েই গিয়েছিলেন!
তাইতো নির্বাসনে অবস্থান করেও আপনার ছবি পূর্নিমার আলোর মতো চকচক করে উঠল মনের আঙ্গিনায়!
আমি যেনো প্রান ফিরে পেলাম!
আবার কড়া নাড়লো আমার ঘরে শব্দেরা!
আমি ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হলাম!
আপনি নামক কাঠগোলাপীর রূপে মগ্ন হয়ে ফিরে এলাম কবিতার শহরে!
আপনার নাম নিতেই হৃদপিণ্ড পরিমিত ভাবে চলা শুরু করলো!
আমার সকল অমাবস্যা কেটে গেলো!
আমি সন্ধি করে নিলাম শব্দ চয়নের সাথে!
সেই থেকে বুঝে নিলাম প্রিয়দের কঁাচে বঁাধা থাকে সকল বসন্ত গুলো!
শুধু প্রকাশের স্বাধীনতা একেক সময় একেক রকমের হয়!
প্রিয় হৈমন্তী আমি হঠাৎই মায়ায় পড়ে ছিলাম আপনার!
শত আবেগের দুর্যোগ মোকাবেলা করে প্রেমের রাজত্ব গড়েছিলাম!
যা কাব্যের কাহিনিবিস্তারে সাক্ষরীত!
ম-ম রূপী সম্রাজ্ঞী ইন্দ্র রাণী মুহেবিয়া,
আপনার সিল্কি চুলের ভঁাজে এক গুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া গুঁজে দিতে চাই!
সোনালুর হলুদরঙের ফুলে কান জুড়ে ঝুমকোলতা একে দিতে চাই!
লাল রঙের সাজপোশাকে আপনার মুখ খানি আবার দেখতে চাই!
দেখে দেখে আবার ফিরতে চাই মায়ার মোহনজালে!
ফিরতে চাই আপনার শহরে!
যে শহরে আমি নীরবে নিভৃত ভাবে আমি আমার সেই প্রথম দেখার কাঠগোলাপীকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারবো।







