প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৮
নদী তীরে পাথরে

চারদিকজোড়া প্রকাণ্ড রেইনট্রির ছায়ায় সরকারি খাদ্য গুদামের অবস্থান, যেখানে আমি হিসাব-নিকাশের কাজ করি। কাজ বলতে, দালাল-ফড়িয়াদের সঙ্গে দিনভর কুতর্কের দোকানদারি। আমি নতুন এসেছি, এখনও ওদের ধান্দাবাজির ফন্দি-ফিকির সব বুঝে ওঠতে পারিনি ভেবে তারা যে বাইরে বসে ঠাট্টা করে মিটমিট হাসে তা দু-একবার লক্ষ্য করেছি। এটা মন্দ না, এতে আমিও গভীরে ঢুকার চেষ্টা আরম্ভ করেছি। পরে ভেবেছি, চুরির এতো রকমফের আবিষ্কার করতে গিয়ে আমি কি একা জীবন দিব নাকি, তা হয় না। আমারও অন্য কাজ আছে, অন্য ভাবনা-কল্পনা আছে। সকলটা যে শুরু হয় কতক বাজে লোকের সঙ্গে হট্টোগোলের মধ্য দিয়ে, এটা মনে হলে চাকুরি ছাড়ার কথা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আবার মা এবং কিছু দরিদ্র স্বজন-পরিজনের কথা মাথায় এলে নিশ্চুপ হয়ে যাই। সবাই একজীবনে ডাক্তার বা কূটনৈতিক হতে পারে না, কাউকে তো খাদ্য গুদামের কেরানী হতে হবেই। আমি না হয় জীবনের বিমর্ষতা বইবো।
এখানে ধান্দা-ফিকিরের বাইরে আরও একটা কারণে মন খারাপ থাকতো, তা হলো গুমোট পরিবেশ। পাশ দিয়ে ডাকাতিয়া নদী বয়ে গেলেও ভেতরে যেন একটা বদ্ধতা বছরের পর বছর এখানে রুক্ষ হয়ে বসে আছে। এর পেছনের কারণ রেইনট্রির বিস্তৃত ডালপালা, যা নিচের পরিবেশটাকে শতবর্ষের পুরোনো আবরণে ঢেকে রেখেছে আর আবাসিক ভবনগুলোর জীর্ণতাও পুরো পরিমণ্ডলটিকে এমন একটা অবয়ব দিয়েছে, যেটা মুক্ত জীবনের পক্ষে অকিঞ্চিৎকর। আমি রাতে ঘুমানোর সময়টা ছাড়া বাকি সময় এখানে থাকি না। অফিসের কাজ শেষ হলেই হাঁটতে বেরিয়ে পড়ি। নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যাই, ফিরতে ফিরতে মাঝেমধ্যে রাত নয়টা-দশটাও বাজে। এসে, টিফিন-ক্যারিয়ারে রেখে যাওয়া নির্ধারিত খাবার খেয়ে বই নিয়ে বসি। ফ্রয়েডের স্বপ্নদর্শন ও ফুকোর তত্ত্ববিশ্বের জালজটায় জড়িয়ে হাই তুলি এবং কোনোমতে মশারি খাটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
দুই.
আমার বয়স তখন চব্বিশ কি পঁচিশ হবে। নিজের বয়স সম্পর্কে এমন অনিশ্চয়তা তখন অনেকের ছিলো, টিকাকার্ডের মারফত যে প্রকৃত দিনক্ষণ বের করবো সে সুযোগও অবারিত ছিলো, কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখনও এসব বাধ্যতামূলকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তখন কেবল স্বপ্ন দেখতাম; স্বপ্নের মূর্ছনার মধ্যে ঘুম ভাঙে আবার জেগে ওঠে নতুন স্বপ্নচারণ করি। এতো এতো স্বপ্ন যে, জান্তব বাস্তবের জন্যে অনুকূল নয় তাও টের পেয়েছি, তবু স্বপ্নের ঘোরে ছেদ পড়েনি। গুদামের মালামাল এন্ট্রি করার আটঘন্টা বাদে বাকি দিনটাই ছিলো স্বপ্নময়। দালালদের সঙ্গে কুতর্কের কথা বাদ রেখে অফিসের কোনো সহকর্মীর সাথেও যে আমার খুব সখ্য ছিলো তা নয়। স্বপ্নের রথযাত্রায় আমি ছিলাম রাজা আমিই সারথী। সেসব আকাশ-কুসুম নিদ্রিত ও জাগ্রত স্বপ্নের কতক বিবরণ যদি লিখে রাখতাম, মন্দ হতো না। কীসব অনিষ্পন্ন ইতিহাসের জ্বাল-যন্ত্রণা আর হৃদয়ের অফুরান আকাঙ্ক্ষায় ঠাঁসা সেসব স্বপ্ন। এমন অতিলৌকিক দৃশ্যকল্প আর মনোবৈকল্যের বিবরণ ছিলো তা ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিন্দা করবে। কেন পৃথিবীতে সীমানাপ্রাচীর গড়ে ওঠলো, কেন পাখি-মন থাকা সত্ত্বেও মানুষ নিজেই নিজেকে শক্তবেড়িতে সীমিত করে ফেললো। পায়ে হেঁটে পৃথিবী দেখার বাসনা নিয়ে কি একমাত্র আমারই জন্ম হলো আর লোকেরা কেন এমন স্বপ্ন ফলাতে এগিয়ে এলো না। হৃদয়ের ইচ্ছেগুলো কি অনন্ত-আগামীজুড়ে সমাজবিধির যূপকাষ্ঠের নিচে রক্তাক্ত হবে, কখনও কি সে স্বাধীনতার চূড়ান্ত স্বাদ পাবে না! বাতাসের তোড়ে ফাগুনের ফসল যেমন দোল খায়, প্রাণে প্রাণে আনন্দ ছড়ায়, মানুষের হৃদয় কি এমন অপার্থিব উচ্ছ্বাসে মাথা ঝাঁকাবে না কোনোদিন! মানুষ কি চিরদিন ক্লেদের বিছানায় শুয়ে পঙ্কজের স্বপ্নই বুনে যাবে। কবে মানুষের স্বপ্ন চোখের সামনে এসে তাকে সম্ভাষণ জানাবে। কবে মানুষ জাগতিক দুর্ভাবনা ছেড়ে রত হবে অনন্ত-আগামীর সন্ধানে। কবে সে আপন স্বরূপের খোঁজে অবমুক্ত হবে বন্ধনের যাঁতাকল থেকে। এসব ছন্ন ও বিচ্ছিন্ন স্বপ্ন-ভাবনা তখন এমনভাবে লেপ্টে ছিলো যে তার থেকে বাস্তবের মেদ-মাংস বের করা বেশ জটিল ছিলো। ভেবে ভেবে পথ এগিয়ে চলতো নদীর তীর ঘেঁষে।
এই নদী নিঃশেষ হয়েছে মেঘনায়। যেখানে মেঘনায় এসে নদীটি নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে তার অদূরে পদ্মাও মিলেছে। সেখানে তিনটি নদীর ত্রিতাল যে পাক তৈরি করেছে তা ভয়াল; মাঝে মধ্যে সেই ত্রিবেণীর কাছে বসতাম। তবে জায়গাটি আমার মনমতো ছিল না। কোন্ কালে এখানে কোন্ ফকিরের আস্তানা ছিলো তা নিয়ে এখন কিছু স্থানীয় লোকের কারবারি চলছে। যতোসব ছন্নছাড়া উদ্বাস্তু দরবেশের লীলাখেলা এখন সেখানে। চারপাশ থেকে টং, ছালা-ছাপরার গিজগিজের বাইরে নদীকে নিঃস্ব মনে হতো, তাই অন্য কোনো নিস্তারলোকে সন্ধানে প্রতিদিন বিকেলে বেরিয়ে পড়তাম।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে পুরাণবাজারের ঘাটে এসে ভাবলাম, আসল শহরটা একবার ঘুরে আসি। তখন এক টাকায় নদী পার হওয়া যেত। নৌকা থেকে নতুন বাজার ও পুরাণবাজারকে দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মনে হলো। নদীর তরলতা যেন এই প্রথম আমাকে ছুঁয়ে দিলো, ভাসতে ভাসতে ভাসানের গানের মতো দোলে ওঠছিলো দেহ। নদী তার নির্মল সুধায় আমাকে সেদিন বিমোহিত করেছিলো।
ঘাট থেকে নেমেই প্রবেশ করলাম বাজারে । অপ্রশস্ত জনাকীর্ণ পথঘাট আর টিনের চালা-দেয়া হরেকরকম পণ্য-পশরার পট্টি। পণ্য-দ্রব্যের ভিন্নতা অনুযায়ী একেকটি পট্টির নাম রাখা হয়েছে। চালপট্টি, ডালপট্টি, যুগিপট্টি, বাতাসাপট্টি, তেলপট্টি, তামাকপট্টি, সুতাপট্টি, লবণপট্টি, পট্টি আর পট্টি। এখানে বাজারের শেষদিকের গ্রামগুলো থেকে জেলেরা ইলিশ ধরতে নদীর নামায় কখনো বা সাগরে চলে যায়। চাঁদপুরের ইলিশের যে সুখ্যাতি তার সঙ্গে এসব জেলের শ্রম-ঘামের গভীর যোগ রয়েছে। যুগী পট্টিতে দেখলাম মাছধরার বহুবিধ সরঞ্জামের ছড়াছড়ি। মাছ ধরা নিয়ে যে এতো এতো কাজ কারবার, এতোসব পণ্যবিস্তার ও কর্মযজ্ঞ রয়েছে তা জানা ছিলো না। আমি একটি পট্টি পেরিয়ে আরেক পট্টিতে গিয়ে পড়ছি, এ যেন পট্টির অফুরান পরিসর। এখানে দিনরাত মানুষের ব্যস্ততা, হাঁকাহাঁকি, দৌড়ঝাঁপ লেগেই থাকে। ভাবলাম, জীবনের কর্মরূপ তো এমনই যা ছড়িয়ে রয়েছে ফসলের মাঠে, কামারশালায়, বাজারে-বন্দরে, শিক্ষালয়ে এবং কলকারখানায়। যেখানে কর্মের চেয়ে আদেশ-নির্দেশ, খবরদারি ও শাসনের ছড়াছড়ি অধিক, সেই প্রাঙ্গণ প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রকাশের ক্ষেত্র হতে পারে, কিন্তু সেটা জীবনের চিরায়ত রূপ নয়। অবশেষে পট্টির সীমা শেষ হলো। অনেক বিচ্ছিন্ন পথের সীমা দুটি পথে এসে মিললো। একটি কর্দমাক্ত নালায় দেখলাম আধখানি ডুবে শুয়রেরা ঘোঁত ঘোঁত করছে। একটি পরিচ্ছন্ন প্রবাহিনীর পাশে কীভাবে এমন বদ্ধ খাল থাকে বুঝে আসলো না। খালের ওপরে দেখলাম কিছু টংঘরের সামনে বিচিত্র বেশে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে, গান করছে। চলতি পথে এসব উদ্ভিন্ন রমণীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব নয়, ওরা কি এই শ্রম-শ্রান্ত শহরের পাশে শরীরের স্বাদের সঙ্গে নিজের আত্মাকেও নিলামে তুলেছে! যদি তা হয় তবে একে তো কর্মের অভাবে ন্যুব্জ-পরাজিত মানুষের নিরূপায় অবলম্বন বলা যাবে না, বরং বলা যাবে, মানুষের আদিম অভ্যাসের দাসরূপে কিছু লোককে বলি হতে হয় এবং ওরা তার শিকার!
আমি হাঁটতে লাগলাম পুব থেকে পশ্চিমে তারপর দক্ষিণে বাঁক নিয়ে। দেখলাম হরিসভায় হরিজনের বিপুল সমাগম, ভেতর থেকে সন্ধ্যাগমনের স্তবধ্বনি আসছে। ক্ষণিক পরে একযোগে চারদিক থেকে আজানের ধ্বনি শোনা গেলো। এই পথটি একেবারে নদীর ধার ঘেঁষে এগিয়েছে। অনেক জায়গায় নদী-সিকস্তির করাল চিহ্ন দেখা গেলো। কিছু জায়গায় পাথরের চাঁই দিয়ে বাঁধ দেয়া হয়েছে। বুঝলাম, নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পেতেই মানুষ আজকাল ধীরে ধীরে নতুন বাজারে বসতি গাঁড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে একটি জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম তিনদিকে এখানে নদীর প্রসার। কেবল পূর্বদিকে গ্রাম-জনপদ। স্তূপীকৃত পাথরের চাঁইয়ের ওপর ঝড়ের বেগে জোয়ারের জল আছড়ে পড়ছে এবং বাতাসের ব্যাকুল মাতামাতি চারদিকে। জায়গাটি বেশ মনোময় ঠেকেছে আমার কাছে। মাঝে মাঝে দু-একজন মানুষের আসা যাওয়া ছাড়া তেমন সাড়া-শব্দ নেই। জাগতিক কোলাহলের বাইরে যে প্রকৃতির বিশদ শোরগোল আছে তা এখানে প্রবল। আমি একটি বর্গাকৃতির চাঁইয়ের ওপর প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে থাকি। বসে নানাকিছু ভাবি, স্বপ্ন দেখি, অনেক ভাবনাই অর্থহীন কিংবা অনেক স্বপ্ন অঙ্কুরেই মরে যাবে তবু অচিন্ত্য-কল্পনায় পালে হাওয়া দিই। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি, জোয়ার-ভাটার খেলা দেখি। কখনো আটটা বেজে যায় রাত, তারপর ধীরে ধীরে নতুন শহরের দিকে হাঁটতে লাগি।
এভাবে অনেক দিন পেরিয়েছে, একাই আসি-যাই, তেমন বন্ধুও জোগাড় হয়নি যে তাকে নিয়ে বেড়াতে আসবো। শরতের এক স্নিগ্ধ-বিকেলে এসে দেখলাম আমার গোধূলিযাপনের স্থানটিতে অন্য একজন বসে আছে। লোকটিকে দেখলাম নদীর দিকে নিমগ্নভাবে তাকিয়ে আছে। তার মগ্নতায় ব্যাঘাত ঘটালাম না। আমি নিঃশব্দে অন্য একটি পাথরের ওপর বসলাম। মনে মনে ভাবলাম ব্যাপারটা মন্দ নয়, নিজের মতো অন্তত একটি লোক পাওয়া গেলো, যে নদী ভালোবাসে। তার সঙ্গে নিশ্চয়ই অনেক বিষয়ে আমার মিলবে, কথা বলা যাবে। তার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, লোকটি কী প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে নদীকে দেখছে, যেন নদীর প্রতিটি ধ্বনি তার আরাধ্য, যেন নদীর উছলে পড়ার গান শোনার জন্যে সে কতকাল তৃষ্ণার্ত। তাকে প্রথমে কী জিজ্ঞেস করবো, নাম নাকি কোথায় থাকে, নাকি জানতে চাইবো--আজই কি এখানে প্রথম এসেছেন, কতোদিন থাকবেন এ শহরে; এমন অনেক প্রশ্ন ঘুরছে আমার মাথায়। লোকটিকে নিয়ে সেদিন এতো এতো প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিলো যে, নদীর দিকে তাকিয়ে নিসর্গ-যাপনের অবকাশ পাইনি। নিচের দিকে তাকিয়ে কেবল ভাবছি আর ভাবছি, কী বলে আলাপ শুরু করা যায়। একটু পর হঠাৎ ওপরে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে তারা জ্বলছে এবং অন্ধকার ঘিরে ফেলেছে নদীর চারপাশ। যেখানে লোকটি বসেছিলো সেখানে কেউ নেই। চারদিকে ঝিঁঝিস্বর ও আঁধারের স্তব্ধতা বিরাজ করছে। আমি দাঁড়ালাম এবং নিজেকে আবিষ্কার করলাম পরিচিত চৌকোণা পাথরের সামনে। তাহলে এতোক্ষণ আনমনে কে বসেছিলো এই পাথরে, কে সেই নিসর্গবিহারী!








