প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০০
সংসদে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি
রাষ্ট্র যখন ‘চাঁদাবাজ’—গণতন্ত্রের মুখোশ ছিঁড়ে পড়ার নির্মম সত্য!

জাতীয় সংসদ—যেখানে প্রতিটি শব্দ হওয়ার কথা সত্যের সমার্থক এবং প্রতিটি উচ্চারণ হওয়ার কথা শোষিতের আর্তনাদ। সেই পবিত্র সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে যখন একজন জনপ্রতিনিধি নিজের জীবনের নৃশংসতম রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অধ্যায় উন্মোচন করেন, তখন সেটি আর কেবল ব্যক্তিগত হাহাকার থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একটি কলঙ্কিত সময়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় চার্জশিট। চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী যে বর্বরতার চিত্র অঙ্কন করেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ নয়—বরং ইতিহাসের কাঠগড়ায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে দাঁড় করানোর এক সাহসী পদক্ষেপ।
|আরো খবর
অদৃশ্য কারাগার ও ছায়া-রাষ্ট্রের নগ্নতা
২০০৭ সালের ২৭ জুলাই। রাজধানীর বুক থেকে একজন নাগরিককে উঠিয়ে নেওয়া হলো। কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল না, ছিল না কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। চোখ বেঁধে তিন মাসের জন্য এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে অদৃশ্য করে দেওয়া হলো একজন মানুষকে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিককে এভাবে ‘গুম’ করে রাখা কোনো আইনি প্রক্রিয়া হতে পারে না; এটি ছিল একটি ‘শ্যাডো স্টেট’ বা ছায়া-রাষ্ট্রের কার্যক্রম। যেখানে আইন ছিল কেবল শাসকের চাবুক, আর নাগরিকের মর্যাদা ছিল ধূলিলুণ্ঠিত।
রাষ্ট্র যখন মুক্তিপণ আদায়কারী
এই নিষ্ঠুর গল্পের সবচেয়ে ভয়াবহ মোড় আসে তখন, যখন জানা যায়—মুক্তির বিনিময়ে দাবি করা হয়েছিল ৪ কোটি টাকা! ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, রাষ্ট্র নিজেই যখন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে, তখন আইন ও দস্যুবৃত্তির মধ্যকার সীমারেখাটি মুছে যায়। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৭, ঢাকা ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি কোডে সেই অর্থ জমা দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশ্ন ওঠে—এটি কি বিচারিক জরিমানা ছিল? নাকি রাষ্ট্রীয় পোশাকে পরিচালিত এক সুসংগঠিত ‘মুক্তিপণ’ আদায়? যখন কোনো রাষ্ট্র বা তার সংস্থা নাগরিককে জিম্মি করে অর্থ লেনদেনে বাধ্য করে, তখন তাকে আর ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র’ বলা যায় না; সেটি পরিণত হয় একটি প্রাতিষ্ঠানিক দস্যুদলে।
ন্যায়বিচারের দায় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা
২০০৮ সালের ২ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন সত্য, কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি তার দায় থেকে মুক্তি পেয়েছে? ১৯ বছর পর আজ যখন শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক সেই ৪ কোটি টাকা ফেরত চান, তখন সেটি কোনো করুণা বা ভিক্ষা নয়। এটি স্রেফ অর্থের দাবি নয়; এটি এক অনিবার্য ন্যায়বিচারের আহ্বান। এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি নৈতিক পরীক্ষা—রাষ্ট্র কি তার নিজের করা অপরাধের প্রতিকার করবে, নাকি সেই লুণ্ঠিত অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের সাফাই গাইবে?
ওয়ান-ইলেভেন: একটি অন্ধকার ইতিহাসের পুনর্পাঠ
ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই ‘কালো অধ্যায়’, যেখানে শুদ্ধি অভিযানের নামে চলেছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা আর ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ লুণ্ঠন। বহু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ সেদিন এই রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজির শিকার হয়েছিলেন, কিন্তু তারা নীরব ছিলেন প্রাণভয়ে কিংবা সামাজিক মর্যাদার সংকটে। শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক আজ সেই নীরবতার দেয়ালে প্রথম কুঠারাঘাতটি করেছেন। সংসদের ভেতরে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের মতো, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের শিকড় নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সিদ্ধান্ত এখন রাষ্ট্রের
রাষ্ট্রের ধর্ম কেবল শাসন করা নয়, বরং অতীতের ভুল বা অন্যায় স্বীকার করে নিজেকে সংশোধন করা। যদি লুণ্ঠিত সেই ৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া না হয়, তবে ধরে নিতে হবে রাষ্ট্র আজও সেই অন্ধকার সময়ের অন্যায়কে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে। আর যদি তা ফেরত দেওয়া হয়, তবে ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে—প্রমাণিত হবে যে, এ দেশে আইনের শাসন এখনো বিলীন হয়ে যায়নি।
মাননীয় স্পিকার, আজ সময় এসেছে স্পষ্ট করার—আমরা কি একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ব, নাকি ‘রাষ্ট্রীয় দস্যুবৃত্তি’র কলঙ্কিত উত্তরাধিকারকে বয়ে চলব? ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজকের এই দাবিই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে আমাদের রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড। ন্যায়বিচারের সূর্যোদয় কি হবে, নাকি অন্ধকারই হবে আমাদের নিয়তি? সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময়।
লেখক:অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








