শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৪

ধারাবাহিক উপন্যসা-৩৯

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

২২.

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, দিন দিন বয়স বাড়ছে আর বয়স বাড়ছে নিকুঞ্জ নিকেতনেরও। সময়ের বারতায় এটা এখন একটি জীর্ণ বাড়ি ঠিকই কিন্তু জনশূন্য নয়। নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারে যোগ হয়েছে আরও দুজন সদস্য দিলরুবা ও নওশাদ জুটি। উনারা দুজনেই ছিলেন স্কুল শিক্ষক কিন্তু কোনো সন্তান নেই। স্কুলের চাকরি শেষে বড়বেশি একাকী হয়ে পড়েন। স্কুলটা যেখানে ছিল পরিবারের মতো সেখান থেকে অবসরে আসার পর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বেসরকারি স্কুল তাই পেনশনও নেই। শত মানুষের ভীড়ে একেলা হয়ে থাকা নিঃসন্তান দম্পতির স্থানও হয় এই নিকুঞ্জ নিকেতনে। এদিকে অনিমেষ, পিটার, সারোয়ারের চাইতে নরেন্দ্রদা একটু বেশি বয়স ছুঁয়ে এগিয়েছেন। প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়েন আর ওষুধের বাক্সের ওজনটাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বিশাখা হরহামেশাই আসে এখানে এবং তার কাকাবাবুর দেখভাল করে যায়। হঠাৎ একদিন দেখা যায় ব্লাড সুগার বেড়ে বেহাল অবস্থায় তিনি যার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। সেদিন সারারাত আমরা সকলেই হাসপাতালে কাটিয়েছিলাম। পুরো রাত ঘুমের সাথে যুদ্ধ করে আর পেরে উঠতে পারছি না তাই সকালে বিশাখার ভরসায় রেখে আমরা চলে আসি। বিশাখার সেবা আর যত্নে দাদা অল্প কয়েকদিনেই অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠে। ডাক্তার বলেছিল আরও দু-একদিন অবজারবেশনে থাকুক হাসপাতালে। আমরা কেহই উনাকে একা রাখি না আর, প্রতিদিনই আমাদের মাঝে একজন উনার সাথে রাতে থাকছে আর দিনের বেলায় বিশাখার সঙ্গ।

‘কাকাবাবু তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে যাও আমরা বাপ-বেটি সেই আগের মতো পেয়ারা বানানি খাব বারান্দায় বসে।’

‘আমাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছিস। জীবনটা বুঝি আর বেশি টানতে পারব না, শেষ স্টেশন হয়তো কাছাকাছি।’

‘তুমি অমন করে কেন ভাবছ? তুমি না বলতে যখন মৃত্যু আসবে তখন কেউ আটকে রাখতে পারবে না তাহলে মরার আগে বারবার কেন মরা। তারচেয়ে যতটুকুই বাঁচ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচ কাকাবাবু আমার মতো করে।’

‘হা হা হা...ওরে, এই বয়সটাতে স্বপ্নগুলোও যে সাদাকালো। একটা কথাÑআমার অসুস্থতার বিষয়ে রাজীবকে জানানোর প্রয়োজন নেই।’

‘কেন?’

‘শুনলে পাগল ছেলেটা সবকিছু ফেলে ছুটে চলে আসবে। ও যে পথ বেঁচে নিয়েছে সেটায় তাকে অনেক দূর যেতে হবে। পিছুটান তার পথকে করতে পারে বাঁধাময়। এমনিতে আমার মোহে সে বাঁধা পড়ে আছে আর আমিও। মায়ার বাঁধনটা ছিন্ন করতে পারছি না বলেই হয়তো চলে গিয়েও বারবার ফিরে আসা।’

‘কাকাবাবু! আমি কখনো ভাবতে পারি না যে অন্যকে বাঁচতে শিখানো ব্যক্তিটা আজ নিজেই হেরে যাবে, এটা কেন? আপনি তো হারতে পারেন না।’

‘ওরে পাগলি আমরা চাওয়ার কে? যিনি বিধির বিধান লিখেছেন তিনিই সবকিছু লিখে পাঠিয়েছেন আমরা মানুষ তো নিমিত্ত মাত্র। শুধু আশা একটা।’

‘আশা? কী ধরনের? আমাকে বলে দাও আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব পূরণ করতে নতুবা রাজীব তো আছেই। আমার সাধ্যে না হলেও রাজীব ঠিকই করতে পারবে।’

‘সত্যি বলছিস?’

‘অবশ্যি। আমার উপর তোমার আস্থা না থাকতে পারে কিন্তু রাজীব, ওর ওপর তো ভরসা করতে পার। তা এখন বল তোমার আশাটা কী?’

‘রাজীবের বউ দেখে যেতে চাই।’

কথাটা বলার সাথে সাথেই বিশাখা কেমন যেন হতচকিয়ে গেল। আমার ভাবনাগুলো এখন আর অবাস্তব বলে মনে হয় না। বিশাখার মনে রাজীবের জন্য শুধুই বন্ধুত্ব বাসা বাঁধেনি এর চাইতেও একধাপ এগিয়ে যার রূপ হয়েছিল অন্যধারায়। সে এখন অস্বস্তি বোধ করছে আমার সামনে বসে থাকতে। আমাকে আজ কিছু একটা করতে হবে নতুবা এদের মনের টানকে যুক্ত করা হবে না। চলে গিয়েও ফিরে আসার লক্ষণটা যদিও ভালো না তবু বুঝতে বাকি নাই প্রলয়ের ঘণ্টা যেকোনো সময়ই বেজে উঠতে পারে। সারোয়ার-অনিমেষ-পিটারকে বাঁচার মূলমন্ত্র তো শিখাতে পেরেছি কিন্তু আমার বিয়োগ তাদের নিশ্চয় ঝামেলায় ফেলবে।

‘কাকাবাবু আমি একটু আসছি।’

‘না, আমার কাছে বস। আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।’

‘বাহ রে এই প্রশ্নের উত্তর আমি কীভাবে দিব? তোমার ছেলের বউ তার মতো করেই তো হবে এখানে আমার বলার কী আছে?’

‘কিছুই নেই? অন্যদিকে তাকিয়ে নয় কথাগুলো আমার চোখে চোখ রেখে বল।’

‘কাকাবাবু!’

‘আমার ছেলের বউ হতে তোর আপত্তি থাকবে না তো? মাথা নুইয়ে বসে আছিস কেন আপত্তি থাকলে চলে যাস নতুবা বলে দিস।’

আমরা দুজনেই নীরব কিছু সময় ধরে। বিশাখা মাথা নুঁইয়ে বসে আছে বেডের পাশে আমি বসে মোবাইলে মনমোহনের নাম্বারটা খুঁজছি। ঝোঁক নাম্বার খোঁজার দিকে নয় উত্তর জানা জরুরি তাই অপেক্ষায় আছি বিষয়টার ইতি দেখার জন্য। হঠাৎ বিশাখা উঠে দাঁড়াল। ভাবছি হয়তো এই প্রশ্নটায় তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছি। আমি যা ভাবছি সেটা না হতেও পারে নতুবা হতে পারে তাদের আন্তরিকতা শুধুই বন্ধুত্ব এর বেশি কিছু নয়। মেয়েটা হয়তো আমাকে সমীহ করে বলেই প্রত্যুত্তর দিচ্ছে না নতুবা মুখের উপর না বলতে পারত। আমি তো তার কাছে অপশন রেখেছি চলে যাওয়ার, বুদ্ধিমতি মেয়ে সে তাই উত্তর না হলে চলে গিয়ে আমায় বুঝিয়ে দিবে। আমি না তাকিয়েও তার গতিবিধি লক্ষ্য করছি হঠাৎ দেখি তার গায়ের ওড়নাটা মাথায় ঘোমটা দিয়ে চরণ স্পর্শে আমাকে প্রণাম করল তারপর ঝটপট বেড়িয়ে গেল। বুঝতে আর বাকি নেই এবং আমি খুশিতে আত্মহারা, বেশ বুদ্ধিমতির পরিচয় দিল তাই চরন ছুঁয়ে কিছু না বলেও হ্যাঁ সূচক উত্তর জানিয়ে বিদায় নিল। কথাটা কী আগে অনিমেষ, পিটার, সারোয়ারকে জানাব নাকি ডায়েরিতে লিখে রাখব! দুটোই হবে তবে আগে কোনটা সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। যাক কিছুটা ধৈর্য ধরি তারপর ভেবে নেওয়া যাবে। সন্ধ্যায় চলে আসবে আমার আড্ডা পার্টি আর মনমোহনকেও বলে দিব ডায়েরিটা সাথে দিয়ে দিতে। সন্ধ্যায় হাসপাতালে যেন আনন্দের বন্যা বহেছিল। কথাগুলো বলতে বলতে আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাই আর মনে ছিল না যে এটা হাসপাতাল এখানে জোরে কথা বললে পরিবেশ নষ্ট হয়। ইচ্ছে করছে কেবিন থেকে বেরিয়ে ছুঁটে গিয়ে সকলকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠি।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়