প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩৫
আট হাজার কোটির ‘সমুদ্র-সমাধি’: রাষ্ট্রীয় অদূরদর্শিতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি
উন্নয়ন নয়, এটি কি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক আত্মহত্যা?

বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি আজ মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে—একটি লৌহমানবের মতো, যার প্রাণ নেই, গতি নেই, কিন্তু দায় আছে হাজার কোটি টাকার। ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্প—যার প্রতিটি ইঞ্চিতে জনগণের করের টাকা, বিদেশি ঋণের সুদ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বোঝা জমাট বেঁধে আছে—আজ কার্যত এক ‘ডেড অ্যাসেট’।
|আরো খবর
৮ হাজার ৩৪০ কোটি টাকার এই অবকাঠামো ২০২৪ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সাশ্রয়ের স্বপ্ন কে হত্যা করল?
প্রকল্প আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ‘মগজ’ নেই
এ যেন এক নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়, কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতার কাছে সম্পূর্ণ পরাজিত। পাইপলাইন বসানো হয়েছে, জেটি নির্মাণ হয়েছে, সমুদ্রের গভীরে প্রযুক্তিগত কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে—কিন্তু নেই অপারেটর, নেই প্রস্তুত ব্যবস্থাপনা, নেই কার্যকরী পরিকল্পনা।
সাত বছরেও অপারেটর নিয়োগ ব্যর্থতা—এটি কি শুধুই অযোগ্যতা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও গভীর কোনো ‘গেম প্ল্যান’?
রাষ্ট্র যখন ডলার সংকটে জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়র এই ‘মেশিন’ অচল পড়ে থাকা নিছক ব্যর্থতা নয়—এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধ।
ঘোড়া ছাড়া গাড়ি: ERL-2 ছাড়া SPM—কার এই তুঘলকি বুদ্ধি?
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিকল্পনাগত অসঙ্গতি হলো—এসপিএম প্রকল্প চালুর পূর্বশর্ত হিসেবে প্রয়োজন ছিল দ্বিতীয় তেল শোধনাগার ইউনিট (ERL-2)। কিন্তু সেই প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের আলো দেখেনি।
ERL-2 না থাকলে এসপিএম দিয়ে আনা কাঁচা তেল শোধনই করা যাবে না—এই মৌলিক বাস্তবতা কি নীতিনির্ধারকদের অজানা ছিল?
নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘সিরিয়াল মিসম্যাচ’ তৈরি করে প্রকল্পের নামে অর্থ অপচয়র পথ প্রশস্ত করা হয়েছে?
ঋণের ফাঁদ: উন্নয়নের আড়ালে অর্থনৈতিক দাসত্ব
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে নেওয়া হয়েছে বিদেশি ঋণ। অর্থাৎ, প্রকল্প চালু হোক বা না হোক—ঋণের কিস্তি কিন্তু থেমে থাকবে না।
ঋণের বোঝা এখন রাষ্ট্রের ঘাড়ে এক ‘টাইম বোমা’।
যখন ডলার রিজার্ভ চাপে, আমদানি ব্যয় বাড়ছে, তখন এই অচল প্রকল্প শুধু আর্থিক বোঝা নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক গভীর ঝুঁকি।
দায়হীনতার সংস্কৃতি: ‘ফাইলবন্দি দুর্নীতি’র নতুন অধ্যায়
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
কে এই প্রকল্পের নকশা অনুমোদন করেছে?
কারা বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যাচাই করেনি?
বাংলাদেশে এক ভয়ংকর দায়হীন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—প্রকল্পের উদ্বোধন আছে, ব্যর্থতার বিচার নেই। হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেলেও কেউ জবাবদিহি করে না। ফাইল ঘুরে, তদন্ত হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু ধুলোয় ঢেকে যায়।
এসপিএম প্রকল্প সেই ‘দায়হীন রাষ্ট্রব্যবস্থা’রই প্রতিচ্ছবি—যেখানে উন্নয়ন মানে বাস্তব ফল নয়, বরং কাগুজে সফলতা আর রাজনৈতিক প্রচারণা।
এখন কী করা জরুরি?
এই মুহূর্তে তিনটি বিষয় জরুরি—
১. জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিয়োগ
২. ERL-2 প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন
৩. একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই তিনটির কোনোটিই যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব না হয়, তবে এই প্রকল্প আরও কয়েক বছর ‘সমুদ্রের কবরস্থান’েই পড়ে থাকবে।
শেষ কথা: উন্নয়ন নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা
মহেশখালীর এসপিএম আজ শুধু একটি ব্যর্থ প্রকল্প নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা।
এটি বলছে, উন্নয়ন যদি পরিকল্পনাহীন হয়, যদি জবাবদিহিহীন হয়, তবে তা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না—বরং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
এই আট হাজার কোটি টাকা কেবল অর্থের অপচয় নয়—এটি জনগণের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার এক নির্মম অপমান।
বাংলাদেশ আজ উত্তর চায়—
এই ‘সমুদ্র-সমাধি’র দায় কে নেবে?
আর কবে শুরু হবে প্রকৃত জবাবদিহির রাজনীতি?
লেখক:অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








