প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০৬:৪৩
স্মৃতির খোর্দ্দ খাল থেকে ঘোষেরহাটের ‘বিশ্ব খাল’: উৎপাদনমুখী রাজনীতির পুনর্জাগরণ ও চাঁদপুরের টেকসই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত!

ইতিহাসের জাদুকরী বৃত্ত ও এক মহাকাব্যিক পুনরাবৃত্তি — ইতিহাস কখনো কখনো এক অদ্ভুত, জাদুকরী ও নিয়তি-নির্ধারিত বৃত্ত সম্পন্ন করে। সেই বৃত্তের কেন্দ্রে যখন কোনো অবহেলিত জনপদ বা গোটা জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের রেখাচিত্র আঁকা থাকে, তখন তা হয়ে ওঠে যুগান্তকারী ও অবিনশ্বর। ২০২৬ সালের ১৬ মে, শনিবার। উত্তরমেঘের আকাশ চিরে আসা তপ্ত জ্যৈষ্ঠের রোদের মাঝে চাঁদপুরের শাহরাস্তি এবং সদর উপজেলার ঘোষেরহাট যেন এক ঐতিহাসিক মহাকাব্যের জীবন্ত ও স্পন্দিত মঞ্চে পরিণত হয়েছিল।
|আরো খবর
আজ থেকে প্রায় ৪৭-৪৮ বছর আগে, ঠিক এই পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে, এই চিলতে বাতাসের মুখোমুখি হয়ে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর ও সচল করতে কোদাল হাতে নেমেছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের দূরদর্শী রূপকার, গণমানুষের নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। কালের নিয়মে আজ সেই মাটিতেই পা রাখলেন তাঁরই রক্ত, চিন্তা ও আদর্শের উত্তরসূরি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সুপ্রতিষ্ঠিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান
এই সফর কেবলই একজন সরকারপ্রধানের রুটিনমাফিক জেলা সফর ছিল না; প্রথাগত ফিতা কাটা আর ভিআইপি প্রটোকলের বেড়াজাল ভেঙে এটি ছিল মূলত শহীদ জিয়ার শুরু করা এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ অবহেলায় থমকে যাওয়া খাল খনন বিপ্লব বা উৎপাদনমুখী রাজনীতির এক আধুনিক পুনর্জাগরণ। শাহরাস্তির ঐতিহ্যবাহী ‘খোর্দ্দ খাল’ এবং চাঁদপুর সদরের প্রাণভোমরা ‘বিশ্ব খাল’ পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী নদী, নালা ও জলাশয় সংস্কারের যে মহাপরিকল্পনা শুরু হলো, তা বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন ও টেকসই সূর্যোদয়ের বার্তা দেয়।
স্মৃতির স্মারক: ১৯৭৮ থেকে ২০২৬—পিতা ও পুত্রের উন্নয়ন-সেতু এবং আদর্শিক উত্তরাধিকার — ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার এক বলিষ্ঠ ও জাতীয়তাবাদী প্রত্যয় নিয়ে দেশব্যাপী স্বপ্রণোদিত খাল খনন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন। তখনকার দিনে শাহরাস্তির এই ‘খোর্দ্দ খাল’ খনন ছিল সেই দেশাত্মবোধক বিপ্লবেরই একটি অন্যতম ঐতিহাসিক অংশ। তৎকালীন উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত—বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে গ্রামীণ জনপদের খাদ্য উৎপাদন এক ধাক্কায় দ্বিগুণ করা।
দীর্ঘ চার দশক পর, উদ্বোধনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে শাহরাস্তির ওয়ারুক বাজারে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ঘড়ির কাঁটায় যখন দুপুর ২টা ৪০ মিনিট, তখন সমবেত লাখো জনতার করতালি, আকাশ কাঁপানো স্লোগান আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে সভাস্থলে এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি প্রথমে ফলক উন্মোচন করেন এবং এরপর প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার খোলস ভেঙে সরাসরি খালের তীরে নেমে নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন।
উপস্থিত স্থানীয় প্রবীণরা, যাঁরা আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক আগে তরুণ বয়সে শহীদ জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোদাল ধরেছিলেন, তাঁদের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। তারা বলছিলেন, “বাবার শুরু করা স্মৃতিবিজড়িত খালটি যখন বছরের পর বছর ধরে পলি জমে ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দখলে ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় রূপ নিয়েছিল, তখন ছেলে এসে তা পুনর্জীবিত করার দায়িত্ব নিলেন। এটি কেবল মাটির ছোঁয়া নয়, এ যেন পূর্বপুরুষের অসমাপ্ত স্বপ্নের সাথে বর্তমান প্রজন্মের এক আত্মিক ও অর্থনৈতিক কোলাকুলি।”
খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন: পাল্টে যাবে শাহরাস্তির কৃষি ও গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতির চালচিত্র — পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ‘খোর্দ্দ খাল’ পুনঃখনন প্রকল্প শাহরাস্তির সামগ্রিক কৃষি-অর্থনীতিতে এক আমূল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। একটি মাত্র খালের পুনর্জন্ম কীভাবে পুরো উপজেলার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে, তার একটি পরিসংখ্যানগত ও তাত্ত্বিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
খোর্দ্দ খাল প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ: • কৃষিজমি উদ্ধার ও সেচ সম্প্রসারণ: খালটি দীর্ঘকাল ভরাট ও অচল থাকায় বর্ষায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা এবং শীতে তীব্র খরা লেগেই থাকত। সংস্কারের ফলে এলাকার প্রায় ২৪১ হেক্টর (প্রায় ১,৮০০ বিঘা) আবাদি জমি সরাসরি সুনিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। • উপকারভোগী পরিবার: দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাস অবসান ঘটিয়ে এলাকার প্রায় ২,৭৮৮টি প্রান্তিক কৃষক পরিবার সরাসরি এই সেচ ও জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সুফল ভোগ করবে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। • বহুমাত্রিক সুবিধা ও মৎস্য চাষ: শুধু সনাতন ধান চাষ নয়, খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষের এক বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে গ্রামীণ বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় বাজারে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি দূর হবে।
ঘোষেরহাটের ‘বিশ্ব খাল’: চাঁদপুর সদরের প্রাণভোমরা পুনরুদ্ধার ও জনসমুদ্রের গর্জন — শাহরাস্তির কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে এসে পৌঁছান চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের ঘোষেরহাটে। এখানকার ‘বিশ্ব খাল’ পুনঃখনন প্রকল্পটিও চাঁদপুরের মানুষের জন্য এক দীর্ঘদিনের লালিত ও আবেগময় স্বপ্ন। প্রায় ৪৭ বছর আগে জিয়াউর রহমান এই খালটি খনন করেছিলেন, যা যুগ যুগ ধরে অবহেলায় অচল হয়ে পড়েছিল। চাঁদপুর সদরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই জলপথটি কালের বিবর্তনে, ড্রেজিংয়ের অভাবে এবং নানামুখী আবর্জনা ও দূষণে প্রায় মৃতপ্রায় নর্দমায় রূপ নিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষেরহাটে পৌঁছানোর সাথে সাথেই পুরো এলাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল, দূরবর্তী চর ও ইউনিয়ন থেকে ব্যানার, ফেস্টুন ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষ দুপুরের আগেই সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে খালের পাড়ে একটি ওষুধি গুণসম্পন্ন এবং পরিবেশবান্ধব নিম গাছের চারা রোপণ করেন এবং স্বহস্তে পানি ছিটিয়ে দেন। এরপর কোদাল হাতে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিককে সাথে নিয়ে খনন কাজের শুভ সূচনা করেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন চাঁদপুরের পুলিশ...
এখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে উল্লেখ করেন, “ঢাকায় বড়ো বড়ো ফ্লাইওভার নির্মিত হলেও গ্রামাঞ্চলের প্রকৃত টেকসই ও উৎপাদনমুখী উন্নয়ন বিগত ১৬ বছরে হয় নি। মেগা প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে, কিন্তু কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনে কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিশ্ব খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে চাঁদপুর সদরের জলাবদ্ধতা চিরতরে নিরসন হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকেরা ফসলি জমিতে অনায়াসে সেচ দিতে পারবেন।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: নিম গাছের চারা রোপণের প্রতীকী দর্শন — বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাঁদপুর সফরে খালের পাড়ে নিম গাছ রোপণের ঘটনাটি গভীর প্রতীকী ও পরিবেশগত বার্তা বহন করে$. নিম গাছ কেবলই একটি ওষুধি বৃক্ষ নয়, এটি বায়ু শোধন এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক অতুলনীয় উপাদান। বৃক্ষরোপণ শেষে তিনি সুধীজন ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন: "শুধু জলাশয় সংস্কার করলেই চলবে না, আমাদের প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও সবুজ বলয়কেও টিকিয়ে রাখতে হবে। নিম গাছ আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেয়। এই ঐতিহাসিক খালের দুই পাড় সবুজায়নে ভরে উঠুক, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।"
সরকার ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও জলাশয় সংস্কার ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। শাহরাস্তির খোর্দ্দ খাল ও ঘোষেরহাটের বিশ্ব খালের এই প্রকল্পগুলো মূলত সেই জাতীয় মেগা পরিকল্পনারই মাঠপর্যায়ের সফল ও প্রথম বাস্তবায়ন, যা দেশের ২০ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার।
কুমিল্লা বিভাগ গঠন: জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা — চাঁদপুর সফরের পথে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখার সময় এক অনন্য ও প্রশংসনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পথসভায় বক্তব্য রাখার একপর্যায়ে যখন উপস্থিত হাজার হাজার জনতা সমস্বরে ‘কুমিল্লা বিভাগ চাই’ স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আবেগকে বিন্দুমাত্র খাটো করে না দেখে অত্যন্ত পজিটিভ ও হাসিমুখে আশ্বস্ত করে বলেন: “কুমিল্লাকে নতুন বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা যদি এই অঞ্চলের সর্বস্তরের জনগণের প্রাণের দাবি হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। বিএনপি জনগণকে যে ওয়াদা দেয়, সরকারে এলে সেই ওয়াদা পর্যায়ক্রমিকভাবে পূরণ করে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎক্ষণিক ও ইতিবাচক ঘোষণা প্রমাণ করে যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের আবেগ ও দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক দাবিকে কতটা আন্তরিকতার সাথে মূল্যায়ন করে। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পথসভাটি সংক্ষিপ্ত হলেও তা পুরো কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষের মাঝে এক নতুন আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে।
চাঁদপুরকে যা যা দিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী: এক নজরে মেগা প্রকল্প ও প্রাপ্তির খতিয়ান — ১৬ মে ২০২৬ তারিখের এই রাষ্ট্রীয় সফরটি চাঁদপুরবাসীর জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক ‘প্রাপ্তির দিন’। সন্ধ্যার প্রাক্কালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশ প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্যদের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা ও সরাসরি আশ্বাস দেন। চাঁদপুরের সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাগ্য উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রধান প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্পগুলো নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
| ক্রমিক | প্রকল্পের নাম / প্রতিশ্রুতি | অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব |
|---|---|---|
| ০১ | ইপিজেড (EPZ) স্থাপন | বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীকে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ। হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। |
| ০২ | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস | ঘোষেরহাটে নির্ধারিত জমি পরিদর্শন। তরুণ সমাজকে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর। |
| ০৩ | মেডিকেল কলেজের স্থায়ী campus | চাঁদপুরে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ চিকিৎসক তৈরির পথ সুগম করা। |
| ০৪ | নদী রক্ষা ও স্থায়ী তীর রক্ষা বাঁধ | মতলব থেকে হাইমচর পর্যন্ত মেঘনার ভাঙন রোধে স্থায়ী এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ। |
| ০৫ | কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা | প্রতি বছর প্রতি কৃষকের হাতে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ২,৫০০ টাকা সরাসরি পৌঁছানো (সার ও কীটনাশক ক্রয়ের জন্য)। |
| ০৬ | ফ্যামিলি কার্ড (Family Card) বিতরণ | অসহায় ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও পরিবার পরিচালনায় সরাসরি আর্থিক সহায়তা। |
সামাজিক সুরক্ষায় নতুন ডিজিটাল মডেল: ফ্যামিলি কার্ড ও নারী ক্ষমতায়নের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ — চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিজিটালি ল্যাপটপের বাটন টিপে দেশের ২০টি জেলার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীদের ডাটাবেজ ও অর্থ প্রাপ্তি কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের সময় তিনি অত্যন্ত বিনম্রভাবে সমবেত জনতাকে সাথে নিয়ে বলেন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”—যা উপস্থিত জনতাকে দারুণভাবে উজ্জীবিত ও আবেগাপ্লুত করে। আনুষ্ঠানিকভাবে চাঁদপুর সদর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ১০ জন প্রান্তিক ও অসহায় নারীর হাতে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে এই ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। এই দশজন সৌভাগ্যবতী নারী হলেন: ১. হাসিনা খাতুন, ২. সোহাগী আক্তার, ৩. ফাতেমা খাতুন, ৪. আমেনা খাতুন, ৫. মোহসেনা বেগম, ৬. মনোয়ারা বেগম, ৭. মাহমুদা খাতুন, ৮. তাছলিমা, ৯. রুমা আক্তার এবং ১০. নাজমা বেগম।
এই ফ্যামিলি কার্ডের মূল দর্শন হলো নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং পরিবার পরিচালনায় সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, আগামী বাজেটে এই ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি আরও বাড়ানো হবে যাতে কোনো দরিদ্র পরিবার এর বাইরে না থাকে। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের উৎপাদনশীল হাতে রূপান্তর করার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তার প্রাথমিক সামাজিক ভিত্তি হলো এই কর্মসূচি।
শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক এমপি: চাঁদপুরবাসীর প্রাণের সব দাবির বলিষ্ঠ ও অহিংস কণ্ঠস্বর — এই ঐতিহাসিক সফরের পেছনে এবং চাঁদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর দরবারে সুচারুভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে অগ্রণী ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক। শনিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তাঁর কণ্ঠ জুড়ে ছিল কেবলই চাঁদপুরের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার আকুতি। সবচেয়ে গঠনমূলক বিষয় ছিল, তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় প্রতিপক্ষের প্রতি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার গরল বা কটু উচ্চারণ ছিল না। তিনি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিগত সরকারের আমলে শুরু হওয়া কিন্তু বর্তমানে থমকে থাকা চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে রূপান্তরের দাবি জানান। একই সাথে হাইমচরের অর্থনৈতিক জোন এবং মতলব-হাইমচর স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তাঁর এই দূরদর্শী ও উন্নয়নমুখী উপস্থাপনা প্রধানমন্ত্রীর মন জয় করতে সক্ষম হয়, যার ফলশ্রুতিতে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাৎক্ষণিক সবুজ সংকেত দেন।
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভা: অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড ও ঐক্যের কঠোর বার্তা — দিনের সরকারি ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি শেষে রাতে চাঁদপুর ক্লাবে আয়োজিত জেলা বিএনপির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার সাংগঠনিক সভায় মিলিত হন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক এমপির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এ কে এম সলিম উল্যা সেলিমের পরিচালনায় এই সভায় দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় এক কঠোর চেইন অব কমান্ড মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন: “দলের স্বার্থে নেতাকর্মীদের যেকোনো মূল্যে সুদৃঢ় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। তা না হলে গুপ্ত-সুপ্ত ও স্বৈরাচারী শক্তিগুলো আবার এক হয়ে যাবে। নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য বা দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, কিন্তু দলের বৃহত্তর স্বার্থে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল মনোনীত একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করা বরদাশত করা হবে না।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ চরম প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়ে নির্বাচিত করেছে এবং দল সরকার গঠন করেছে। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকার পেয়েছে একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাত এবং রাজনৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা অপরিহার্য। উক্ত সাংগঠনিক সভায় দেশের ও দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এমপি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, সমাজকল্যাণ সচিব ড. আবু ইউসুফ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রাশেদা বেগম হীরা, এবং কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেলিম ভূঁইয়া এমপিসহ বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ (সালেহ শিবলী) অন্যতম। এছাড়াও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে দেওয়ান মো. শফিকুজ্জামান, এম এ শুক্কুর পাটোয়ারী, আক্তার হোসেন মাঝি, হযরত আলী ঢালী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক সচেতনতা ও অপপ্রচার রুখে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান — চাঁদপুরের মাঠের জনসভা এবং রাতের সাংগঠনিক—উভয় সভাতেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। তিনি বলেন, “আমরা খালে পানি আনার রাজনীতি করি, আমরা কৃষকের চোখের জল মোছার ও দুর্দশা লাঘবের রাজনীতি করি। কীভাবে মানুষের ভাগ্য বদল করা যায়, সেসব আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি। কিন্তু একটি মহল রাজনীতির নামে দেশে বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। দেশের মানুষ এখন সচেতন, তারা ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে প্রমাণ করেছে তারা উন্নয়ন ও শান্তি চায়।” তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের যে মহাপরিকল্পনা সরকার হাতে নিয়েছে—তাতে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে চাইলে এদেশের জনগণই নিজেদের স্বার্থে সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করে দেবে, আমাদের কিছু করা লাগবে না।
উপসংহার: ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের বাস্তব ও উৎপাদনমুখী রূপায়ণ — প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক দিনের চাঁদপুর সফর জেলার ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবময় স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা করল। স্মৃতির খোর্দ্দ খাল থেকে শুরু করে ঘোষেরহাটের বিশ্ব খাল পুনঃখনন, কিংবা রাজরাজেশ্বর চরের অবহেলিত নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপই বাস্তবসম্মতভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকারের মূল দর্শন হচ্ছে গ্রামীণ জনপদের টেকসই উন্নয়ন এবং প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। “করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই কালজয়ী স্লোগানটি কেবল মুখের কথা বা দেয়াল লিখনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কোদাল হাতে খালের পলিমাটি কাটার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। চাঁদপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—ইপিজেড, মেডিকেল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস এবং নদী রক্ষা বাঁধের যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়ে গেলেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মেঘনাপারের এই ঐতিহ্যবাহী জেলাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে—এটাই আজ চাঁদপুরবাসীর শতভাগ প্রত্যাশা ও ধ্রুব বিশ্বাস।
ডিসিকে /এমজেডএইচ
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।








