প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৪
সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন বিক্রির নামে সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রতারণা, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ৪

সীমানা পিলার ও ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন কয়েন (ধাতব বস্তু) বিক্রি করে বিপুল মুনাফা পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এই প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।
|আরো খবর
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের কথিত 'এন্টিক পাওয়ার কয়েন', একটি নোহা গাড়ি, চেকবই, ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট ও জাল সার্টিফিকেটসহ প্রচুর সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা : ১. এস.এম. ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), ২. মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ৩. তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১), ৪. মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
এক নজরে যা যা জব্দ করা হলো : ১টি এন্টিক পাওয়ার কয়েন (কথিত মূল্য ২০০ কোটি টাকা), ১টি নোহা গাড়ি ও ১টি পকেট রাউটার, ৮টি মোবাইল ফোন ও ১০টি প্রতারণায় ব্যবহৃত সিমকার্ড, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট ও ৩টি চেকবই, ১টি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম ও ১টি ডায়েরি, ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬টি ভুয়া স্ট্যাম্প, ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে ১টি ভুয়া সার্টিফিকেট।
সংবাদ সম্মেলনে যা জানা গেলো
বৃহস্পতিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা জানান, জেলা পুলিশ ও ডিবি সদস্যদের যৌথ অভিযানে শ্রীমঙ্গল এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি আরও জানান, চক্রটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের হেরিটেজ অকশন, লকহীড মার্টিন, ব্ল্যাক রক ও মাইক্রোসফটের মতো খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। এর আগে ২০২৩ সালেও ঢাকার ডিবি পুলিশের হাতে এই চক্রের সদস্য তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামানসহ চারজন একই ধরনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল।
যেভাবে ফাঁদে ফেলা হয় ভিকটিমকে
মামলার নথি ও অভিযোগসূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম (৩৫) ও তার আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকে লক্ষ্য বানিয়ে প্রতারণার জাল বোনে চক্রটি।
প্রলোভন : ভিকটিমকে জানানো হয়, চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজন ব্যক্তির কাছে হাজার কোটি টাকা মূল্যের একটি ব্রিটিশ আমলের ধাতব বস্তু রয়েছে। ঢাকার এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এটি চড়া দামে কিনতে চায়।
ভুয়া এক্সপার্ট দিয়ে পরীক্ষা : চক্রের সদস্য তাহের-উল-ইসলাম নিজেকে ‘ইউএস হেরিটেজ অকশন’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয় দেন। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট ভুয়া এক্সপার্ট দিয়ে বাগানে গিয়ে ধাতব বস্তুটি পরীক্ষা করিয়ে সেটিকে আসল বলে বিশ্বাস জন্মায়।
টাকা হাতিয়ে নেওয়া : চুক্তি ও বাগান মালিকদের দেওয়ার কথা বলে প্রথমে ২৫ লাখ টাকা করে ৪টি চেক (১ কোটি টাকা) নেওয়া হয়। পরবর্তীতে হস্তান্তরের দিন নগদ ২ কোটি টাকা এবং আরও নানা অজুহাতে সব মিলিয়ে ২ কোটি ২১ লাখ টাকা নগদ ও চেকের মাধ্যমে বাগিয়ে নেয় চক্রটি।
বাক্স খুলতেই বের হলো জ্যান্ত সাপ!
টাকা লেনদেনের পর প্রতারক চক্রটি কাঠের একটি বাক্স ভিকটিমদের জিম্মায় দিয়ে জানায়, ভেতরে বহু মূল্যের সেই ধাতব বস্তুটি রয়েছে এবং দুই দিন পর তারা আরও ১০ কোটি টাকা দিয়ে বস্তুটি নিয়ে যাবে।
নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর সন্দেহ হলে ভিকটিমরা সিলেটে এনে বাক্সটি খোলেন। কিন্তু ভেতরে কোনো মূল্যবান ধাতব বস্তু পাওয়া যায়নি; মিলল একটি জ্যান্ত সাপ!
যোগাযোগ করা হলে চক্রটি দাবি করে, "টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে বস্তুটি 'জিনের মাধ্যমে' সাপে পরিণত হয়েছে, ২১ দিন পর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে।” এভাবে সময়ক্ষেপণ করে এবং পরবর্তীতে নতুন বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় তারা।
আইনি ব্যবস্থা
এক পর্যায়ে প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ভিকটিম আব্দুর রহিম কুলাউড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ তদন্তে নেমে আসামিদের গ্রেপ্তার করে। আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।








