প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৫:৫৭
সেই মাদ্রাসা সুপারের আরেক কাণ্ড ফাঁস
১২ বছর মাদ্রাসায় না এসেও বহাল তবিয়তে এক শিক্ষক

দাখিল পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আটক ও পরিবর্তীতে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মাদ্রাসা সুপার (বর্তমানে সহকারী শিক্ষক) মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদের দ্বৈত চাকুরির ঘটনা ফাঁসের পর আরেক কাণ্ড সামনে এসেছে। এক যুগ ধরে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত এক শিক্ষকের এমপিও বহাল রাখা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তাকে মাদ্রাসায় যোগদান করিয়ে সেই এমপিও’র বেতন উত্তোলনের সুযোগদানের ঘটনা সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। এই অনৈতিক কাজের ঘটনা প্রকাশের পর মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রা.) মহিলা দাখিল মাদ্রাসার। আর ১২ বছর পর ফিরে আসা সহকারী শিক্ষক হলেন আল মামুন (এমপিও ইনডেক্স ঈ২০০০৮৯৬)।
ওই মাদ্রাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতারণার অভিযোগে পলাতক থাকা মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আল মামুন গণঅভ্যুত্থানের পরপর আগস্ট মাসে মাদ্রাসায় ফিরে এসে যোগদান করেন। তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন মাদ্রাসা সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ। তিনি তাকে যোগদানের অনুমতি দেন এবং তার বেতন বিলে স্বাক্ষর করতে শুরু করেন। যদিও ১২ বছর অনুপস্থিতির পর কোন্ নীতিমালা বা রেজুলেশনের ভিত্তিতে তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে, তা জানাতে পারেননি ওই মাদ্রাসা সুপার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আল মামুন মাদ্রাসায় চাকুরির পাশাপাশি এমএলএম কোম্পানিতে কাজ করতেন। মাদ্রাসার শিক্ষক হওয়ায় মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিকট থেকে এমএলএম কোম্পানির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। এ কারণে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পালিয়ে ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মামলা নেই বলেও নিশ্চিত করেছেন এলাকাবাসী ও সহকর্মীরা।
তৎকালীন মাদ্রাসা সুপার (বর্তমানে সহকারী শিক্ষক) মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ বলেন, ১২ বছর ধরে আল মামুনের অনুপস্থিতির তথ্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, মাদ্রাসা অধিদপ্তর বা বোর্ডকে জানাননি। শোকজ নোটিস দেয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, 'মনে নেই, দেখতে হবে।'
উল্লেখ্য, এমপিও নীতিমালা ২০২৬-এর ১৮ ধারার ১-এর (গ) উপধারা অনুযায়ী মিথ্যা তথ্য প্রদান ও নির্দেশ প্রতিপালন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের এমপিও বাতিলের বিধান রয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক আল মামুন বলেন, আমি রাজনৈতিক কারণে ১২ বছর মাদ্রাসার বাইরে ছিলাম সত্য। ওই ১২ বছরের বেতনের টাকা আমি ব্যাংক থেকে তুলিনি। মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ হুজুরের সহযোগিতায় মাদ্রাসায় যোগদান করে এখন বেতন তুলতে পারছি।মাদ্রাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার শামছুল আরেফিন মুকুল বলেন, মাদ্রাসার সাবেক সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল সাপ্লাইজনিত ঘটনায় আটক হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। তিনি দায়িত্ব থাকাকালীন সময়ে আল মামুনকে মাদ্রাসায় যোগদান করিয়েছেন। তাই আমি অন্যান্য শিক্ষকের সাথে আল মামুনের বেতনও তুলে দিচ্ছি। বর্তমানে মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদও সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালন করছেন।
মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, ওই মাদ্রাসায় শিক্ষক আল মামুন সম্পর্কে যে অনিয়ম হয়েছে, সকল অনিয়মের জন্যে দায়ী মাদ্রাসার তৎকালিন সুপার মাওলানা ইকরাম হোসেন হামিদ। নকল কাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আমি গত জানুয়ারি মাস থেকে মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। জনতা ব্যাংক ফরিদগঞ্জ শাখার ম্যানেজার কেএম ফখরুল ইসলাম জানান, পূর্ব এখলাছপুর দারুল এখলাছ আমেনা (রা.) মহিলা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আল মামুনের একাউন্ট থেকে ১২ বছরের বেতনের টাকা তোলা হয়নি। ২০২৪ সালে আগস্টের পর থেকে মাদ্রাসা প্রধান সুপারের স্বাক্ষরিত বিলের ভিত্তিতে বেতন দেয়া হয়।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোস্তফা কামাল ও চাঁদপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লা বলেন, বিষয়টি জেনেছি, তদন্ত চলমান রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত শিক্ষক ও ঘটনাটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।








