প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৪:১৭
শ্বশুর বাড়ির মামলার জালে সন্তানসহ বিপাকে গৃহবধূ
সালিসের তারিখ নিয়ে মতদ্বৈততা

স্বামী ও সন্তানের অধিকারের দাবি নিয়ে থানায় দায়ের করা এক অভিযোগ নিয়ে দু পক্ষের মধ্যকার সালিসি বৈঠকের তারিখ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে মতদ্বৈততা। আর এই তারিখ নিয়েই জট পেকেছে। সালিসি বৈঠকের সময় হামলায় রক্ত ঝরানো মরধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে প্রথম অভিযোগের বিবাদী তথা ছেলের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেখানে ঘটনার স্থান ঠিক থাকলেও তারিখ দেখানো হয়েছে ২২ এপ্রিল বুধবার। ওই হামলার ঘটনায় কয়েক জন গুরুতর আহত হয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে মামলার বাদী মফিজুর রহমান পাটওয়ারী নিশ্চিত করেছেন।
|আরো খবর
অন্যদিকে সালিসি বৈঠক ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মেয়ে পক্ষ । তারা বলেছেন , তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে সময় নিয়েই সালিসের সময় ২১ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই বৈঠকে উপস্থিত একজন গণমাধ্যমকর্মীর করা ভিডিও রের্কডই বড়ো প্রমাণ যে সালিসি বৈঠক ২১ এপ্রিল হয়েছে। তাছাড়া হামলা মারধর ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেনি বলে তারা জানান। তাদের দাবি পুরো মামলাটি সাজানো। একদিকে ৭ মাসের শিশু সন্তানের জননীকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে, আবার অন্যদিকে মামলা দায়েরের দিনই তাকে ডিভোর্স লেটারও পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরোটাই ষড়যন্ত্রমূলক। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার। এদিকে ৭ মাসের কন্যার পিতৃত্ব দাবি ও স্বামীর অধিকার ফিরে পেতে থানায় অভিযোগ করাই যেনো কাল হলো গৃহবধূ ইতি আক্তারের। তার দাবি অনুযায়ী, মিথ্যা মামলার জালে ফেঁসে এখন সন্তানসহ বিপাকে তিনি। রক্তক্ষয়ী কাল্পনিক মামলার প্রধান আসামি হয়ে পালিয়ে থেকে জেলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার স্বামীর কাছ থেকেও পেয়েছেন ডিভোর্স লেটার। ফলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দিন কাটছে ওই গৃহবধূর।
সালিসি বৈঠকের পরবর্তীতে মফিজ পাটওয়ারী গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইতি আক্তারকে প্রধান আসামি করে মোট ৮ জনকে অভিযুক্ত করে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে তিনি ঘটনাটিকে ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংঘটিত হয়েছে বলে বর্ণনা করেন। এছাড়া মামলায় সালিসদার হেলাল পণ্ডিতকে আসামি করা হয়েছে। একই সাথে ২৬ এপ্রিলই চাঁদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী রেহানা ইয়াসমিনের মাধ্যমে ইতি আক্তারকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছেন তার স্বামী শরীফ পাটওয়ারী।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস পণ্ডিতের মেয়ে ইতি আক্তারের সাথে পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামের মফিজ পাটওয়ারীর ছেলে শরীফ পাটওয়ারীর বিয়ে হয় ২০২৪ সালে। ইতির সুখের সংসারে উইপোঁকা বাসা বাঁধে বিয়ের ক'মাস পরেই-- স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগে শাশুড়ি-ননদের নির্যাতন, অন্যদিকে ব্যবসা করার জন্যে স্বামীর যৌতুকলোভের কারণে।
ইতি আক্তার বলেন, বাবার কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে স্বামীর হাতে যখন তুলে দিয়েছি, তখন আমি ভালো স্ত্রী। কিন্তু পুনরায় যখন টাকা চাইলে দিতে রাজি হইনি, তখনই রূপ পাল্টে গেছে, আমি হয়েছি স্বামীর অবহেলা আর শাশুড়ি, ননদের নিপীড়নের শিকার। অনাগত সন্তানের দিকে চেয়ে নির্যাতন সহ্য করে গেলেও শেষ পর্যন্ত স্বামীর বাড়িতে থাকা হয়নি। শ্বশরবাড়ি থেকে কৌশলে বাপের বাড়িতে চলে আসতে হয়েছে। এরই মধ্যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ৭ মাস। তবু একবারের জন্যেও
পিতৃস্নেহ জোটেনি শিশু ইনিইয়া পাটওয়ারী সারার ভাগ্যে। এমনকি সন্তান প্রসবের প্রাক্কালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্বামীর সাহচর্য মেলেনি আমার।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার পর সন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে থানায় একটি অভিযোগ করি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তার নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কারণে উভয় পক্ষের মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) স্থানীয়ভাবে সালিসি বৈঠক হয়। তার বাপের বাড়ির এই সালিসি বৈঠকটির সুন্দর সমাপ্তি না হওয়ায় কাল হয়ে দাড়ায় ।এ গৃহবধূ জানান, ২১ এপ্রিল সালিসি বৈঠক হলেও তার শ্বশুর ঘটনাটিকে ২২ এপ্রিল দেখিয়ে মামলা সাজায়। মামলায় কাল্পনিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ক'জন আহত হয় এমনকি চিকিৎসা সনদ নেন। সেই সনদ নিয়েই ফরিদগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন শ্বশুর মফিজ পাটওয়ারী। সেই মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে তিনি সন্তানসহ গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
সালিসি বৈঠকে গোবিন্দপুর উত্তর ইউপি সদস্য জাকির হোসেন, গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউপি সদস্য মোহেব উল্যাহ মীর, বালিয়া ইউপি সদস্য আব্দুল কাদির, গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের পাটওয়ারী, রাজনৈতিক কর্মী হেলাল উদ্দিন, মাসুদ আলম, সাংবাদিক মো. ফাহাদ সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ইতি আক্তার দীর্ঘদিন যাবত বিচারের জন্যে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে শিশু বাচ্চাটিকে নিয়ে। তার শ্বশুর প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ এ বিষয়টি সমাধানকল্পে এগিয়ে আসেনি। ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দেওয়াতে তাদের এলাকার মেম্বারের আহ্বানে আমরা ভুক্তভোগীর বাড়িতে ২১ এপ্রিল সালিসি বৈঠকে বসি। এ সময় ভুক্তভোগী মেয়েটির স্বামীর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে হট্টগোল বাধায়, পরে তারা উঠে চলে যায়। এখানে কথা কাটাকাটি হলেও রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা জানতে পেরেছি, উল্টো মেয়েটির শ্বশুর তাদের ফাঁসাতে মিথ্যা মামলা দিয়েছে, সঠিক তদন্ত হলে ভুক্তভোগীরা বিচার পাবে।
গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. মোহেব উল্যাহ মীর বলেন, থানায় দায়ের করা অভিযোগ নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা থানায় বসার কথা বললেও আমি এবং ওই পক্ষের হেলাল পণ্ডিত দায়িত্ব নেই। আমরা পুলিশ কর্মকর্তাকে আশ্বস্ত করি, সেখানে কোনো ঝামেলা হবে না। সেই অনুযায়ী মেয়েদের বাড়িতে আমরা সালিসি বৈঠকে বসেছি, সেখানে উভয়পক্ষের অসহযোগিতার কারণে বৈঠক পণ্ড হয়েছে। সেখানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা চিন্তা করিনি। ওই সময়ে অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তাও আমাকে কয়েকবার ফোন দিয়েছিলেন,আমি ধরতে পারিনি, পরে আমি দেখেছি। এক পর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকে
মোটরসাইকেলযোগে আমি শরীফ পাটওয়ারীকে উদ্ধার করে নিজ এলাকাতে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে ওই সময় শরীফের মাথায় বা শরীরে কোনো প্রকার রক্তক্ষরণ হতে দেখিনি।
ঘটনার সময়ে উপস্থিত বেসরকারি টেলিভিশন মোহনা টিভির প্রতিনিধি মো. ফাহাদ বলেন, সালিসি বৈঠকটি ২১ এপ্রিল হয়েছে, আমার কাছে ভিডিও রয়েছে। ফলে দায়েরকৃত মামলার ঘটনা কাল্পনিক। মামলার ঘটনায় বর্ণিত আহতরা যে সালিসি বৈঠক থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবে গিয়েছেন তার ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগেও এসব দেখে আমি নিজেই হতাশ। দারোগার নিষেধ সত্ত্বেও যারা এই বৈঠকটি এলাকায় করতে চাপ প্রয়োগ করেছেন তারাই এই ঘটনা ও পরবর্তী মামলার জন্যে দায়ী।ইতি আক্তারের শ্বশর মফিজ পাটওয়ারী মুঠো ফোনে বলেন, ঘটনাটি ২২ এপ্রিল বুধবার বিকেলে হয়েছে। সালিসি বৈঠকে আমরা হামলা, মারধর ও ছিনতাইয়ের শিকার হই। আমার ছেলেসহ দুজন মারাত্মক আহত হয়। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছি। তিনি জানান, সালিসি বৈঠকে সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘরের ভেতরে আমাদের মারধরের ভিডিও না করলেও আমরা বের হয়ে যাওয়ার সময় ভিডিও করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদগঞ্জ থানার পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক মো. জুমায়েত হোসেন বলেন, ইতি আক্তারের অভিযোগটি আমার তত্ত্বাবধানে আছে। ২১ এপ্রিল ২০২৬ মঙ্গলবার ছেলে পক্ষের মোহেব উল্যাহ মেম্বার এবং মেয়ে পক্ষে হেলাল পণ্ডিত বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিষয়টি তারা সেদিন মিমাংসা করতে পারেননি। তবে এ ঘটনায় কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিষয়ে কোনো পক্ষ থেকেই আমি অবগত নই।
ফরিদগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ওই গৃহবধূর অভিযোগ ও তার শ্বশুরের মামলা দুটিই তদন্তাধীন রয়েছে।








