প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৪
শুধু শুনলেই হবে না, মানুষের কথাকে গুরুত্বও দিতে হবে

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস : নীরবতা ভেঙে বাস্তব পরিবর্তনের পথে
কিছুদিন আগে আমার মেয়ের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। কথোপকথনের একপর্যায়ে সে হঠাৎ বলে উঠলো, “বাবা, তুমি তো আমার কথা শুনছ না, বরং তুমি কী বলবে, সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ!”
কথাটি শুনে আমি থমকে গেলাম। আমি তো ভেবেছিলাম, মনোযোগ দিয়েই তার সঙ্গে কথা বলছি। তার বক্তব্যের জবাব দিচ্ছি, নিজের যুক্তি তুলে ধরছি, বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার মেয়ে আমাকে অন্য একটি বাস্তবতা দেখিয়ে দিল। আমি তার কথা শুনছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাকে বোঝার চেয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেই বেশি ব্যস্ত ছিলাম।
সেদিনের সেই কথোপকথন আমাকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো : আমরা কি সত্যিই অন্যের কথা শুনি, নাকি তার কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করি, যাতে এবার নিজের কথাটি বলতে পারি?
প্রশ্নটি শুধু বাবা-মেয়ের সম্পর্কের নয়। এটি আমাদের পরিবার, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি বৃহত্তর সমাজেরও প্রশ্ন। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু তাদের কতজনকে এমন অনুভূতি দিই যে তাদের কথা আমাদের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
সেই ভাবনা থেকেই উপলব্ধি করলাম, মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে মন দিয়ে শোনার সম্পর্ক কতো গভীর। অনেক সময় মানুষ সমাধান পাওয়ার আগেই চায়, কেউ তার অভিজ্ঞতাকে বুঝুক, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিক এবং তাকে বিচার না করে কথা বলার সুযোগ দিক।
মানসিক স্বাস্থ্য দিবস কেন প্রয়োজন?
প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৯২ সালে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন দিবসটি চালু করে। এর উদ্দেশ্য মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “খরাবফ ঊীঢ়বৎরবহপবং ঐবধৎফ : জবধষ ঠড়রপবং, জবধষ ঈযধহমব”। এর মর্মার্থ হলো, যাঁরা নিজের জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সেই অভিজ্ঞতা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রতিপাদ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যারা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের শুধু নিজেদের কষ্টের গল্প বলার সুযোগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞানকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে হবে। কারণ কোনো ব্যবস্থার ভালো-মন্দ সবচেয়ে গভীরভাবে বুঝতে পারেন অনেক সময় তারাই, যারা নিজেরা সেই ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে গেছেন।
অভিজ্ঞতা এমন এক জ্ঞান, যা শুধু বই পড়ে অর্জন করা যায় না।
একজন মা যিনি সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন, একজন তরুণ যিনি দীর্ঘদিন বিষণ্ণতার সঙ্গে লড়ছেন, একজন নারী যিনি পারিবারিক চাপের মধ্যে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলছেন, কিংবা একজন কর্মী যিনি কর্মক্ষেত্রে অপমান ও মানসিক চাপের শিকার হচ্ছেন—প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা। তাদের অভিজ্ঞতা কোনো একক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। কিন্তু তাদের কথা মন দিয়ে শুনলে এমন বাস্তবতা সামনে আসে, যা শুধু পরিসংখ্যান, গবেষণা বা পাঠ্যবই থেকে সব সময় জানা সম্ভব নয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবশ্য পেশাগত জ্ঞানের বিকল্প নয়। বরং অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করা সম্ভব।
শোনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কেউ যখন নিজের কষ্টের কথা বলেন, তখন তিনি শুধু তথ্য জানান না। অনেক সময় তিনি নিজের ভয়, লজ্জা কিংবা এমন কোনো স্মৃতি প্রকাশ করেন, যা এতদিন কাউকে বলতে পারেননি। সেই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হতে পারে এমন একজন মানুষ, যিনি তাড়াহুড়ো করে বিচার করবেন না, উপদেশ দেবেন না কিংবা তার কষ্টকে তুচ্ছ করে দেখবেন না।
মন দিয়ে শোনা মানুষকে এই অনুভূতি দিতে পারে যে, তার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, তার অনুভূতির মূল্য আছে এবং তিনি একা নন। অন্য কারও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেলে মানুষ বুঝতে পারেন, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুধু তাকেই যেতে হচ্ছে না। এতে লজ্জা কমতে পারে এবং সাহায্য চাওয়ার সাহস তৈরি হতে পারে।
তবে শোনা মানেই সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়। কখনো মানুষ পরামর্শ চান, কখনো বাস্তব সহায়তা, আবার কখনো শুধু চান কেউ তার কথা শুনুক। তাই প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘তুমি কি চাও আমি শুধু তোমার কথা শুনি, নাকি আমরা একসঙ্গে কোনো সমাধানের পথ খুঁজি?’
এই ছোট প্রশ্নটিই কথোপকথনের ধরন বদলে দিতে পারে। কারণ মানুষকে সাহায্য করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, তিনি আসলে কী চাইছেন।
জীবনের কোন্ কোন্ পর্যায়ে শোনার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি?
বয়ঃসন্ধিকাল ও কৈশোরে একজন মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন তৈরি হয়। শরীর, পরিচয়, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ, আত্মবিশ্বাস এবং অন্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দ্বিধা কাজ করতে পারে। কিন্তু ‘বললে কে কী ভাববে’ এই ভয় অনেককে নীরব করে রাখে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি নিরাপদে প্রশ্ন করার এবং কথা বলার পরিবেশ না থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরি হতে পারে।
একজন নতুন মা কিংবা সন্তানসম্ভবা নারীর অভিজ্ঞতাও জটিল হতে পারে। আনন্দের পাশাপাশি ভয়, ক্লান্তি, উদ্বেগ, অভিমান কিংবা বিষণ্ণতাও দেখা দিতে পারে। তাঁর অনুভূতিকে ‘এমন তো হয়ই’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা জরুরি।
কর্মক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ, সহকর্মীর আচরণ, হয়রানি, অনিশ্চয়তা কিংবা কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যহীনতা মানুষের মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মীরা যেন প্রতিশোধ, অপমান বা গোপনীয়তা ভঙ্গের ভয় ছাড়াই সমস্যার কথা জানাতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব।
ডিজিটাল জগতেও মানুষের অভিজ্ঞতা কম জটিল নয়। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, অপমানজনক মন্তব্য, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা ক্রমাগত অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই অনলাইন নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সামাজিক পরিবেশ, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি সাহায্য চাইতে পারবেন এবং তার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কেন মানুষ নিজের কষ্টের কথা বলতে ভয় পান?
এর পেছনে রয়েছে কিছু প্রচলিত ধারণা।
* ‘কষ্টের কথা বলা দুর্বলতা।’ অথচ নিজের অসুবিধা স্বীকার করে সহায়তা চাওয়ার মধ্যে সাহস রয়েছে।
* ‘সবারই সমস্যা আছে, মানিয়ে নাও।’ কিন্তু সবার সমস্যা এক নয়, আর একই পরিস্থিতি সবাইকে সমানভাবে প্রভাবিত করে না।
* ‘মানসিক সমস্যা মানেই পাগল।’ এই কলঙ্কজনক ধারণা মানুষকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে দূরে রাখতে পারে।
* ‘লোকে কী বলবে?’ সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্মান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হারানোর ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
* ‘ব্যস্ত থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কাজ, ব্যায়াম, ধ্যান, শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুশীলন কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস অনেকের ভালো থাকার সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এগুলো সব ধরনের মানসিক সমস্যার একক সমাধান নয়।
এসব ধারণা বদলাতে হবে। মানুষের কষ্টকে ছোট করে না দেখে বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
শোনারও শিক্ষা আছে, দায়িত্বও আছে
মন দিয়ে শোনার অর্থ শুধু চুপ করে বসে থাকা নয়। যিনি কথা বলছেন, তাকে সময় দেওয়া, তার কথার মাঝখানে নিজের অভিজ্ঞতা চাপিয়ে না দেওয়া, মোবাইল ফোনের মতো মনোযোগ নষ্টকারী বিষয় দূরে রাখা এবং তার অনুভূতিকে তুচ্ছ না করা এর অংশ।
কেউ কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলে তাকে তাড়াহুড়ো করে কথা বলাতে হবে না। নীরব থাকার প্রয়োজন হলে সেই নীরবতাকেও সম্মান করতে হবে। কেউ কাঁদলে তাকে লজ্জা দেওয়া কিংবা কান্না থামানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। কান্না মানুষের আবেগ প্রকাশের স্বাভাবিক একটি উপায় হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাউকে নিজের অভিজ্ঞতা বলতে বাধ্য করা যাবে না। তার সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমা ও গোপনীয়তাকে সম্মান করতে হবে। তবে কারও নিজের বা অন্যের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর আশঙ্কা দেখা দিলে উপযুক্ত সহায়তা নেওয়া জরুরি।
পরিবারের সদস্য, বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী এবং কমিউনিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা সমস্যার লক্ষণ বুঝতে সাহায্য করতে পারেন, প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারেন এবং উপযুক্ত পেশাজীবীর কাছে যেতে উৎসাহিত করতে পারেন। তবে জটিল বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ক্ষেত্রে শুধু সহানুভূতিশীল কথোপকথনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা অন্য যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর মূল্যায়ন ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যদি ব্যয়বহুল হয়, প্রশিক্ষিত পেশাজীবী সহজে না পাওয়া যায়, কিংবা প্রয়োজনীয় সেবা শুধু বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সচেতনতা বাড়লেও অনেক মানুষ সাহায্য পাবেন না। গ্রাম ও শহর, ধনী ও দরিদ্র, শিশু ও প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সংকটের মধ্যে থাকা মানুষের জন্য সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্য সেবা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সোপযোগী মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যারা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতাকে সেবার পরিকল্পনা ও মূল্যায়নে যথাযথ স্থান দিতে হবে।
এখানেই এ বছরের প্রতিপাদ্যের গভীরতা। মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি না বদলায়, সেবার মান না বাড়ে কিংবা মানুষের প্রতি বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে সেই শোনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পরিবর্তন শুরু হোক আমাদের নিজেদের দিয়ে
আজ আমরা প্রত্যেকে একটি ছোট কাজ করতে পারি। পরিবারের কারও কথা মন দিয়ে শুনতে পারি। কোনো সহকর্মীকে অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ দেখলে বিচার না করে তাঁর খোঁজ নিতে পারি। সন্তানের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে পারি। বন্ধুর কষ্টকে ‘এত ভাবছ কেন’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে জানতে চাইতে পারি, তিনি কী অনুভব করছেন এবং কী ধরনের সহায়তা তার প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক মানুষকে একা অন্যের সব সমস্যার সমাধান করতে হবে না। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারা, প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার পথ দেখানো এবং নির্ভরযোগ্য সেবার সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করাও দায়িত্বশীল আচরণ।
মানসিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, সামাজিক সম্পর্ক, বিশ্রাম এবং চাপ সামলানোর স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট, দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় অসুবিধা কিংবা গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে পেশাদার সহায়তা নিতে হবে। প্রতিরোধ, প্রাথমিক সহায়তা ও চিকিৎসা—তিনটিই প্রয়োজন।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালন নয়। এটি আমাদের নিজেদের আচরণ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পর্যালোচনা করার সুযোগ।
আমার মেয়ের সেই একটি বাক্য আমাকে নিজের কথোপকথনের ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। হয়তো আমিও অনেক সময় অন্যের কথা শুনতে শুনতে নিজের উত্তর তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এই উপলব্ধি আমাকে মনে করিয়ে দেয়, অন্যকে বোঝার জন্য শুধু মনোযোগী হওয়ার দাবি করলেই হয় না; নিজের আচরণও যাচাই করতে হয়।
আমরা প্রায়ই বলি, একজন মানুষকে সাহায্য করতে হলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত হতে পারে, তাকে সত্যিকার অর্থে শোনা। তারপর তার প্রয়োজনকে সম্মান করা, প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ তৈরি করা এবং তার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো।
কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবন গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার নিজস্ব মূল্য আছে এবং প্রত্যেকেরই মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
শুধু মানুষের মুখের কথা শুনলেই হবে না, তার অভিজ্ঞতার অর্থ বুঝতে হবে। শুধু বুঝলেই হবে না, সেই বোঝাপড়াকে কাজে লাগাতে হবে। আর শুধু দিবস পালন করলেই হবে না, এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে যেখানে কেউ মানসিক কষ্টের কারণে একা হয়ে পড়বেন না, সাহায্য চাইতে লজ্জা পাবেন না এবং তার কথা বলার জন্য নিরাপদ একটি জায়গা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবেন না।
শোনা হোক সম্মানের সঙ্গে, সহায়তা হোক প্রয়োজন অনুযায়ী, আর মানুষের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠুক বাস্তব পরিবর্তনের শক্তি।
রহমান মৃধা : গবেষক ও লেখক; সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
লেখক ও তার সহধর্মিণী।






