শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:৩৯

ব্যর্থতার দায় অন্যের, সফলতার কৃতিত্ব নিজের!

হাসান আলী
ব্যর্থতার দায় অন্যের, সফলতার কৃতিত্ব নিজের!

মানুষের জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি চলে। কেউ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্জন করেন, কেউ অনেক চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তৃপ্তির হাসি হাসেন, আবার কেউ সারাজীবন অতৃপ্তি, হতাশা ও না-পাওয়ার বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকেন। কিন্তু সাফল্য ও ব্যর্থতার হিসাব করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারলে আমরা স্বস্তি পাই, আর সফল হলে তার কৃতিত্ব নিজের করে নিতে চাই।

আমাদের চারপাশের মানুষের কথাবার্তা ও জীবন পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেউ বলেন, অভাবের সংসারে জন্মেছিলাম। ভালো স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ পাইনি। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ হয়নি। অনেক চেষ্টা করেও ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো করতে পারিনি। সংসার টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছি। সবার জন্য আত্মত্যাগ করলাম, অথচ এখন শুনতে হয়, কারও জন্য নাকি কিছুই করিনি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো না বলেই জীবনে কিছু অর্জন করতে পারলাম না। মামা-খালু কিংবা প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন থাকলে হয়তো অনেক দূর যেতে পারতাম। সংসার ও সন্তান সামলাতে গিয়ে নিজের উচ্চশিক্ষা এবং ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে।

আবার কেউ মনে করেন, অন্যরা তার উন্নতি সহ্য করতে পারেন না। তার ভালো কেউ চান না। আত্মীয়স্বজনের ঈর্ষা, মানুষের অসহযোগিতা কিংবা প্রতিকূল পরিবেশই তার ব্যর্থতার প্রধান কারণ। এভাবে নিজের জীবনের অপূর্ণতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অন্যদের ভূমিকার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেন। নিজের সিদ্ধান্ত, সীমাবদ্ধতা কিংবা ভুলের হিসাবটি অনেক সময় আর করা হয়ে ওঠে না।

অন্যদিকে, সফল মানুষের কথাবার্তায় প্রায়ই ভিন্ন একটি সুর শোনা যায়। তারা বলেন, নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও মেধার জোরেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তারা ‘সেল্ফ-মেড’ মানুষ। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে অন্য কারও তেমন ভূমিকা ছিলো না। যেন নিজের ইচ্ছাশক্তি ও একক প্রচেষ্টাতেই সাফল্যের সব দরজা খুলে গেছে।

কিন্তু বাস্তবতা কি এতোটাই সরল?

একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে তার ব্যক্তিগত মেধা, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, সাহস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাশাপাশি কাজ করে পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক যোগাযোগ, সময়ের অনুকূলতা, সুস্থতা, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা এবং অনেক মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা। শৈশবে মা-বাবার যত্ন, শিক্ষকের অনুপ্রেরণা, বন্ধুর পরামর্শ, সহকর্মীর সহযোগিতা কিংবা বিপদের দিনে কারও দেওয়া সামান্য সাহসও ভবিষ্যতের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যে মানুষটি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বনির্মিত বলে দাবি করেন, তিনিও হয়তো এমন অনেক মানুষের অবদান ভুলে যান, যাদের সহযোগিতা ছাড়া তার পথচলা আরও কঠিন হয়ে উঠতো। সাফল্যের কৃতিত্ব নিজের পরিশ্রমকে দেওয়ায় কোনো অন্যায় নেই; অন্যায় হলো সেই সাফল্যের পেছনে থাকা মানুষের অবদান অস্বীকার করা।

একইভাবে ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও কেবল অন্যের অসহযোগিতাকে দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়। প্রতিকূল পরিবেশ, বৈষম্য, সুযোগের অভাব, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অন্যের বিশ্বাসঘাতকতা কোনো মানুষের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সব মানুষ সমান সুযোগ নিয়ে জীবন শুরু করেন না। ফলে সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার করাও ন্যায়সংগত নয়। তবে প্রতিকূলতার পাশাপাশি নিজের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি, ভুল, সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ধরা যাক, একজন মানুষ সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। তার এই অপূর্ণতার পেছনে পারিবারিক বাস্তবতা ও দায়িত্বের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু তার ত্যাগের স্বীকৃতি না পাওয়া এবং নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়া—এ দুটি বিষয় এক নয়। একইভাবে, কেউ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজারের প্রতিকূলতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনার ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়নের ভুল কিংবা প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবও পর্যালোচনা করা দরকার।

জীবনকে বুঝতে হলে তাই একমাত্রিক ব্যাখ্যার বাইরে আসতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফসল নয়, আবার ব্যর্থতাও সব সময় ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। জীবনের ফলাফল তৈরি হয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির পারস্পরিক প্রভাবে। কোথাও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা প্রধান ভূমিকা রাখে, কোথাও সুযোগের প্রভাব বেশি হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে একাধিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করে।

নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করা মানে নিজেকে ছোট করা নয়; বরং নিজের ভুল চিহ্নিত করতে পারা ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। একইভাবে সাফল্যের পেছনে অন্যের অবদান স্বীকার করলে নিজের মর্যাদা কমে না; বরং মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বিনয় প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন, তিনি শেখার সুযোগ পান। আর যিনি অন্যের অবদানকে সম্মান করেন, তিনি সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন।

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের নিজেদের কয়েকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমি কী পেয়েছি, কী পাইনি, কেন পাইনি এবং আমার সিদ্ধান্তগুলোর ভূমিকা কতোটুকু ছিলো? একই সঙ্গে ভাবতে হবে, আমার অগ্রযাত্রায় কারা সহযোগিতা করেছেন, আর আমি অন্যের জীবনে কী অবদান রেখেছি?

অন্যকে দোষারোপ করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। আবার সব কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করলে আত্মতৃপ্তি মিলতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবনকে বিচার করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সহমর্মিতা, আত্মসমালোচনা ও বাস্তববোধ। ব্যর্থ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে, সফল মানুষের পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং উভয় ক্ষেত্রেই পারিপার্শ্বিক অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের প্রাপ্য কৃতিত্ব গ্রহণের পাশাপাশি অন্যের অবদান স্বীকার করা এবং নিজের ভুলের দায় নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে পরিণত মানুষের পরিচয়।

ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিজের করে নেওয়া—কোনোটিই পূর্ণ সত্য নয়। সত্যের কাছাকাছি যেতে হলে নিজের ভূমিকা ও অন্যের অবদান, দুটিকেই ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়