শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৯

ইকরাম চৌধুরী: এক সংগ্রামের নাম, এক যুগের প্রতিচ্ছবি!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ইকরাম চৌধুরী: এক সংগ্রামের নাম, এক যুগের প্রতিচ্ছবি!

কিছু মানুষের অন্তর্ধান কেবল একটি স্বাভাবিক শারীরিক অবসান। কিন্তু কিছু মানুষের চিরবিদায় বয়ে আনে একটি সমৃদ্ধ কালখণ্ডের ইতি এবং একটি পুরো ঐতিহ্যের সমাপ্তি। ইকরাম চৌধুরী ছিলেন ঠিক সেই বিরল প্রকৃতির মানুষ। তাঁর প্রস্থান কেবল মফস্বলের একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকের বিদায় ছিল না—তা ছিল চাঁদপুরের বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার এক স্বর্ণযুগের যবনিকাপাত। বস্তুনিষ্ঠতার যে দীপশিখা তিনি স্বহস্তে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তা আজ মফস্বল সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকা

সুনিশ্চিত আরাম ত্যাগ করে অনিশ্চয়তার পথে

তিনি জন্মেছিলেন মধ্যবিত্ত জীবনের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ছায়ায়। হাতে ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মর্যাদাপূর্ণ সনদ, যা তাঁর জন্য সরকারি বা কর্পোরেট চাকরির নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও সুসংহত জীবনের দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু সাধারণের ভিড়ে নিরাপদ জীবনযাপনের সেই সুযোগ তিনি অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

১৯৯৯ সালে টেকনিক্যাল অফিসারের সুনিশ্চিত পদ পরিত্যাগ করে ধুলোবালিঘেরা অনিশ্চিত সংবাদজগতে পা রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। নব্বইয়ের দশকে দৈনিক ইনকিলাবের চাঁদপুর জেলা সংবাদদাতা হিসেবে তাঁর হাতেখড়ি হয়। বৈষয়িক মোহের বিপরীতে সত্য প্রকাশের এই কণ্টকাকীর্ণ পথ বেছে নেওয়ার দিন থেকেই তিনি পরিণত হন এক অদম্য যোদ্ধায়—যার একমাত্র অস্ত্র ছিল সত্যের অনুসন্ধান, আর মূল পুঁজি ছিল সীমাহীন আত্মত্যাগ

‘দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ’: সীমিত সম্পদে স্বপ্নের নির্মাণ

‘দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ’ কেবল একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল না। এটি ছিল তাঁর জীবনের রক্ত-ঘামে গড়া স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ ও সত্য প্রকাশের রণভূমি। মফস্বল সাংবাদিকতার কঠোর বাস্তবতায় যেখানে আর্থিক সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সীমিত পাঠকমহল—এই প্রতিকূলতার দুর্গ পদে পদে বাধা সৃষ্টি করত, সেখানে তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে একটি আঞ্চলিক পত্রিকাকে জাতীয় মানে উন্নীত করেছিলেন।

কেবল স্থানীয় সাংবাদিকতাই নয়, জাতীয় গণমাধ্যমেও তাঁর অবদান ছিল সমভাবে উজ্জ্বল। চ্যানেল আইয়ের একুশ বছরের দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন নিষ্ঠা, দৈনিক যুগান্তরের প্রায় দেড় দশকের দায়িত্ব এবং জাগো নিউজের জেলা প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে তিনি মফস্বলের সংবাদকে জাতীয় মঞ্চে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতা কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়; এটি এক প্রকারে আত্মনিবেদন ও পবিত্র দায়িত্ব

প্রেসক্লাব ও অন্যান্য সংগঠন: ব্যক্তিভিত্তিক প্রভাব থেকে সার্বজনীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

চাঁদপুর প্রেসক্লাব তাঁর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ছোঁয়া পেয়ে অর্জন করেছিল প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও সার্বজনীন রূপ। তিনি প্রথমে আট বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে তিন দফায় সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। যে প্রতিষ্ঠানটি একসময় অল্প কিছু মানুষের ব্যক্তিগত প্রভাব ও বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েছিল, ইকরাম চৌধুরী তাকে সাধারণ ও তরুণ সাংবাদিকদের মূল আস্তানায় রূপান্তর করেন।

নিজস্ব জমিতে চারতলা আধুনিক ভবন নির্মাণের যে নিঃশব্দ, অক্লান্ত ও দীর্ঘ সংগ্রাম তিনি পরিচালনা করেছিলেন, তা আজও ইটে ইটে তাঁর অবদানের সাক্ষ্য দেয়। তিনি কেবল সংগঠনের নেতা বা সভাপতি ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন সার্থক প্রতিষ্ঠানের রূপকার। তাঁর সততা, দূরদর্শিতা ও সংগঠকসুলভ গুণাবলির কারণেই প্রেসক্লাব পরিণত হয়েছিল সাংবাদিকতার এক নিবেদিত মন্দিরে।

সাংবাদিকতার বাইরেও তিনি সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন। ফরিদগঞ্জ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে তিনি স্থানীয় উন্নয়ন ও মানবিক কাজে অবদান রেখেছিলেন। চাঁদপুরের শ্রমিকদের জন্য শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দাবি বাস্তবায়নেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর হাত ধরে প্রায় দুই ডজন তরুণ সাংবাদিকের হাতেখড়ি হয়েছে—যারা আজ চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।

শারীরিক ব্যাধি ও অদম্য পেশাদারিত্ব

সাংবাদিকতার এই অবিরাম মহাসংগ্রামের মাঝে তিনি নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি কখনোই খেয়াল রাখেননি। প্রায় দেড় দশক ধরে ডায়াবেটিসের নীরব ক্ষয়ক্ষতি, কিডনির ধীর ও মারাত্মক অসুস্থতা, হৃদযন্ত্রের এনজিওপ্লাস্টি এবং একের পর এক যন্ত্রণাদায়ক ডায়ালাইসিসের ধকল—কোনো কিছুই তাঁর খবরের পেছনের ছুটকে থামাতে পারেনি। অসুস্থ শরীরেও তিনি সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ে ছুটে গেছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

২০২০ সালের বৈশ্বিক করোনা মহামারীর সেই ভয়াবহ সময়ে উন্নত ও সময়োপযোগী চিকিৎসার সুযোগও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে ২০২০ সালের ৮ আগস্টের এক বিষাদময় ভোরের নীরব মুহূর্তে তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন।

চেতনায় অমলিন বাতিঘর

কিন্তু সত্যের কান্ডারিদের মৃত্যুতে আদর্শের পতন ঘটে না। ইকরাম চৌধুরী মরেও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।

‘দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ’-এর প্রতিটি মুদ্রিত পাতায় তাঁর মেধা ও শ্রম জাগ্রত।

তাঁর হাতে খড়ি পাওয়া ও দিকনির্দেশনায় গড়ে ওঠা অসংখ্য সাংবাদিকের কলমে তিনি বেঁচে আছেন।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট-পাথরের গাঁথুনিতে তাঁর অবদান খোদাই হয়ে আছে।

সর্বোপরি, চাঁদপুরের সাংবাদিকতার নীতি, মূল্যবোধ ও চেতনায় তিনি চিরকাল অম্লান।

উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা ও প্রেরণা

ইকরাম চৌধুরীর পুরো জীবন ও সংগ্রাম আমাদের একটি চিরন্তন সত্য শিক্ষা দেয়—সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার পথে হাঁটতে গেলে ব্যক্তিগত লোভ, লালসা ও সুবিধাকে কখনোই বড় করে দেখা যায় না। সততা ও ত্যাগই হলো সত্য সাংবাদিকতার আসল মূলধন। আর ইকরাম চৌধুরী ছিলেন সেই মূলধনের এক মহিমান্বিত উদাহরণ।

আজ যখন আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করি, তখন আমাদের দায়িত্ব কেবল স্মৃতিচারণ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তাঁর নীতি, আদর্শ ও আপসহীন সংগ্রামের মশালটি তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে নেওয়া প্রয়োজন।

ইকরাম চৌধুরীর মতো মানুষেরা শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁদের জ্বালিয়ে যাওয়া আলোর শিখা কখনো নেভে না। সেই আলো আজও আমাদের দিকনির্দেশনা দেয়—সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে এবং সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ মর্যাদা ও মহিমা রক্ষার পথে।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল ত্যাগ ও নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।

প্রতিবেদক : অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়