প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১০:০৯
প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুর সফর, ফরিদগঞ্জ কোথায়?

২০ বছর পর প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরে এলেন। জেলার মানুষের জন্যে এটি নিঃসন্দেহে বড়ো একটি রাজনৈতিক ও আবেগের ঘটনা। দীর্ঘদিন পর এমন উচ্চপর্যায়ের সফর মানে নতুন আশার আলো, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক গুরুত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই বড়ো আয়োজনের মাঝেও একটি প্রশ্ন চুপচাপ বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে : ‘২৬৩ চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ)’ কোথায়?
প্রধানমন্ত্রীর সফরে চাঁদপুরের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ছিলো দৃশ্যমান। তারা মঞ্চে ছিলেন, বক্তব্য দিয়েছেন, নিজেদের এলাকার উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। কিন্তু পুরো আয়োজনজুড়ে ফরিদগঞ্জের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিলো না। যেন জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এই জনপদের অস্তিত্বই নেই। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক অনুপস্থিতি নয়, এটি হাজার হাজার সাধারণ মানুষের মানসিক বঞ্চনার প্রতীক।
ফরিদগঞ্জের মানুষ নতুন করে হতাশ হয়েছেন। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা। জাতীয় রাজনীতির পালাবদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক আসন সুবিধা পেয়েছে, উন্নয়ন পেয়েছে, রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ফরিদগঞ্জ যেন বারবার রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে পড়ে যায়।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহুবার দেখা গেছে—যে দল সরকার গঠন করেছে, সেই দলের বিপরীত মতের প্রার্থী কোনো কোনো আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। তারপরও অনেক এলাকায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন থেমে থাকেনি। কিন্তু ফরিদগঞ্জের চিত্রটি প্রায়ই ভিন্ন। এখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই উন্নয়নবিমুখ দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। আর সেই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড়ো শিকার হন সাধারণ মানুষ।
ফরিদগঞ্জের মানুষ বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বলির শিকার। নির্বাচনের সময় এই জনপদ হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতির কেন্দ্র। নেতারা আসেন, আশ্বাস দেন, উন্নয়নের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই স্বপ্নের অনেকটাই মিলিয়ে যায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অন্ধকারে।
এই অঞ্চলের মানুষ একটি অদ্ভূত বাস্তবতার সঙ্গে বসবাস করেন। তারা ভোট দেন, রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকেন, দল-মত নিয়ে সক্রিয় থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভের খাতায় নাম ওঠে না সাধারণ মানুষের। বরং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অনেক সময় পুরো এলাকাকেই উপেক্ষা করা হয়। যেন জনগণের অপরাধ—তারা ভুল মানুষকে ভোট দিয়েছে, অথবা ভুল রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন করেছে। যদিও এ দোষটাও সেই রাজনৈতিক দলগুলোরই!
ফরিদগঞ্জের মানুষ আজ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন। কারণ তারা দেখছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাশুল দিতে হচ্ছে তাদের সন্তানদের, শিক্ষার্থীদের, ব্যবসায়ীদের এবং কৃষকদের। একটি এলাকার উন্নয়ন থেমে গেলে তার প্রভাব পড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ—সবখানে। আর এই ক্ষতির বোঝা বহন করেন সাধারণ মানুষ, কোনো রাজনৈতিক নেতা নন।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, ফরিদগঞ্জের মানুষ নিজেদের কখনো পুরোপুরি ক্ষমতার অংশ মনে করতে পারেন না। সরকার বদলায়, নেতা বদলায়, কিন্তু বঞ্চনার গল্প বদলায় না। যেন এই জনপদ সবসময় রাজনৈতিক পরীক্ষাগারের একটি নাম।
ফরিদগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে হলে শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতির দিকেও তাকাতে হবে। কারণ এই জনপদের সংকট কেবল ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের বিভাজন এবং কমিটিকেন্দ্রিক রাজনীতিও এখানকার মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত ১৬ মে ২০২৬ তারিখে অমৃত ফরহাদের ‘ভোটের মতো কমিটি নির্বাচনেও ভুল করলে আমও যাবে, ছালাও যাবে’ শিরোনামের একটি লেখায় দলীয় বিপর্যয়ের একটা দারুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই লেখার মাধ্যমে ফরিদগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতির নির্মম বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ ভুল সিদ্ধান্ত নিলে শুধু পদ নয়, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও হারিয়ে যেতে পারে।
সমস্যা হচ্ছে, এই কমিটি ও গ্রুপভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। ফরিদগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতাদের আন্তকোন্দল ধীরে ধীরে পুরো এলাকার উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঠেকাতে ব্যস্ত, কিন্তু সেই লড়াইয়ে এলাকার স্বার্থ কোথাও হারিয়ে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও ফরিদগঞ্জ অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। বড়ো রাজনৈতিক কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ সফর কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সব জায়গাতেই এই বিভক্তির প্রভাব চোখে পড়ে।
এখানেই ফরিদগঞ্জের মানুষের কষ্টটা অন্যরকম। কারণ তারা দেখেন, পাশের কোনো আসনে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও একটি ন্যূনতম ঐক্য থাকে এলাকার স্বার্থে। কিন্তু ফরিদগঞ্জে অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি এতোটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, জনগণের চাওয়া-পাওয়া গৌণ হয়ে যায়। একটি গ্রুপ অন্য গ্রুপকে দুর্বল করতে গিয়ে পুরো জনপদকেই দুর্বল করে ফেলে। এর ফল হয় ভয়াবহ। উন্নয়ন থেমে যায়, রাজনৈতিক যোগাযোগ কমে যায়, আর সাধারণ মানুষ নিজেদের অসহায় মনে করেন।
‘আমরা কি শুধুই রাজনৈতিক পরীক্ষার মাঠ? আমাদের ভোট কি শুধু ক্ষমতার অঙ্ক মেলানোর জন্য?’
রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত নেতারা কখনো কখনো দল বদলে বা নতুন অবস্থান নিয়ে সামলে নিতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ পারেন না। তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজের সমস্যা, ভাঙ্গা রাস্তা, হাসপাতালের সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, সবকিছুর বোঝা তাদেরই বহন করতে হয়। তাই ফরিদগঞ্জের মানুষের মধ্যে আজ একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, ‘আমরা কি শুধুই রাজনৈতিক পরীক্ষার মাঠ? আমাদের ভোট কি শুধু ক্ষমতার অঙ্ক মেলানোর জন্যে?’
সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো, ফরিদগঞ্জের মানুষ রাজনৈতিকভাবে উদাসীন নন। বরং এই এলাকার মানুষ বরাবরই রাজনীতি সচেতন। চায়ের দোকান থেকে বাজার, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা—সব জায়গাতেই রাজনৈতিক আলোচনা হয়। মানুষ দল বোঝেন, মতাদর্শ বোঝেন, জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝেন। কিন্তু এতো সচেতন হওয়ার পরও কেন বারবার বঞ্চনা? কেন উন্নয়নের প্রশ্নে এই জনপদকে পিছিয়ে থাকতে হয়?
হয়তো এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেই। আমরা অনেক সময় ব্যক্তি আনুগত্যকে এলাকার স্বার্থের চেয়ে বড়ো করে দেখি। ফলে নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। যে কারণে একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি বিভক্ত কমিটি বা একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পুরো এলাকার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে ফেলে। আর তখন সাধারণ মানুষ বুঝে ওঠার আগেই “আমও যায়, ছালাও যায়।”
আজ ফরিদগঞ্জের সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু এলাকার স্বার্থে ন্যূনতম ঐক্যও থাকবে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, কিন্তু আত্মঘাতী বিভাজন কোনো এলাকার জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না।
প্রধানমন্ত্রীর চাঁদপুর সফরে ফরিদগঞ্জের অনুপস্থিতি তাই শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। যে বাস্তবতায় একটি জনপদ বারবার প্রমাণ করে তারা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সমীকরণে।
ফরিদগঞ্জের মানুষ আজও আশাবাদী। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন রাজনীতি ব্যক্তি ও গ্রুপের গণ্ডি পেরিয়ে জনগণের স্বার্থে ফিরে আসবে। সেদিন হয়তো আর কোনো ফরিদগঞ্জবাসীকে বলতে হবে না—“আমাদের ভাগ্যটাই খারাপ।” বরং তারা গর্ব করে বলতে পারবেন, রাজনৈতিক সচেতনতার কারণেই তারা তাদের ন্যায্য মর্যাদা আদায় করে নিয়েছেন। তবে আত্মসমালোচনার জায়গাও আছে। রাজনৈতিক সচেতনতা শুধু দলীয় আবেগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। সচেতনতা মানে নিজের এলাকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিভক্তির রাজনীতিকে না বলা। ফরিদগঞ্জে আমরা অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে এতোটাই বিভক্ত হয়ে পড়ি যে, সামষ্টিক স্বার্থ হারিয়ে যায়। ফলে বাইরের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যে এই বিভক্তিকে ব্যবহার করা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সব দায় কি সাধারণ মানুষের? হয়তো না। কারণ জনগণ বারবার আশার জায়গা খুঁজতে গিয়ে নেতৃত্বের ওপর ভরসা করেন। তারা উন্নয়ন চান, স্থিতিশীলতা চান, মর্যাদা চান। কিন্তু যখন নেতৃত্ব জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক কৌশলের কাছে বিক্রি করে দেয়, তখন সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন।
আজ প্রয়োজন ফরিদগঞ্জকে নতুনভাবে ভাবার। এই জনপদকে শুধু নির্বাচনী সমীকরণের অংশ হিসেবে নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে মূল্যায়ন করা দরকার। চাঁদপুর জেলার উন্নয়ন যদি সত্যিকার অর্থে সমন্বিত হতে হয়, তবে ফরিদগঞ্জকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সফরের আলো যদি জেলার একটি বড়ো অংশে না পৌঁছে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ গণতন্ত্রে প্রতিটি এলাকার মানুষ সমান মর্যাদা প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, নির্বাচনের ফল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি জনপদকে উপেক্ষা করা কখনোই সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়।
ফরিদগঞ্জের মানুষ করুণা চান না। তারা শুধু সমান গুরুত্ব চান। তারা চান, জাতীয় রাজনীতির বড়ো মঞ্চে তাদের অস্তিত্বও স্বীকৃতি পাক। তারা চান, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হয়ে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হয়ে বাঁচতে।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনা করার। ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে এসে সাধারণ মানুষের বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ রাজনীতি যদি মানুষের জীবন বদলাতে না পারে, তাহলে সেই রাজনীতির জৌলুস যতো বড়োই হোক, মানুষের হৃদয়ে তার স্থান তৈরি হয় না।
ফরিদগঞ্জ আজ শুধু একটি আসনের নাম নয়, এটি বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি। যেখানে জনগণ বারবার প্রমাণ করেন তারা সচেতন, অংশগ্রহণমূলক এবং আশাবাদী। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। তবুও আশা হারানো যাবে না। কারণ ইতিহাস বলে, জনগণের ন্যায্য দাবি একদিন না একদিন উচ্চারিত হয়ই। ফরিদগঞ্জের মানুষও নিশ্চয়ই একদিন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখবেন, যেখানে তাদের পরিচয় হবে না বঞ্চনার জনপদ হিসেবে, বরং মর্যাদা ও সমঅধিকারের জনপদ হিসেবে।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক। সাধারণ সম্পাদক, সরখাল ওলিভ তরুণ সংঘ, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।
ই-মেইল : [email protected]




