প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০২:২৯
শোকের চর্বিতচর্বণ নাকি কঠোর অ্যাকশন: রাষ্ট্র কি কেবলই বিবৃতির দোকান?
ইতিহাস নির্মম, রাষ্ট্র সাবধান!

|আরো খবর
যে বয়সে তার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল গল্পের বই, রঙিন ফিতা, পুতুল আর নিষ্পাপ হাসিতে ভরা—সেই বয়সেই তাকে ফিরতে হলো সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে। এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুক ভেঙে দেয়নি; এটি পুরো জাতির বিবেকের ওপর এক রক্তাক্ত প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। কারণ কোনো সভ্য সমাজে শিশুদের কবর এত দ্রুত বড় হতে পারে না। যেখানে একটি শিশুও নিরাপদ নয়, সেখানে উন্নয়ন, অগ্রগতি, সভ্যতা—সবকিছুই কেবল মিথ্যার অলংকার।
রামিসার মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি পচে যাওয়া সমাজব্যবস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এটি এমন এক রাষ্ট্রের ভয়াবহ ব্যর্থতার দলিল, যেখানে অপরাধীরা ক্রমশ বেপরোয়া, আর সাধারণ মানুষ ক্রমাগত অসহায় হয়ে পড়ছে। আজ দেশের মানুষ ঘরের ভেতরেও নিরাপত্তা খুঁজে পায় না। মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকে, বাবা সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় বুক কাঁপায়, আর নারীরা প্রতিনিয়ত অনুভব করে—এই সমাজে তাদের নিরাপত্তা এখন ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো, অপরাধীরা এখন আর আইনকে ভয় পায় না। কারণ তারা জানে—এই দেশে বিচার দীর্ঘ, রাষ্ট্র দুর্বল, প্রভাবশালীরা শক্তিশালী, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু চাপা পড়ে যায়। মামলার পর মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, সাক্ষীরা ভয় পায়, ভুক্তভোগীর পরিবার হয়রানির শিকার হয়, আর অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে সমাজের বুকেই ঘুরে বেড়ায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের হাতে কার্যত নতুন অপরাধের লাইসেন্স তুলে দিচ্ছে।
রামিসার হত্যাকাণ্ডের পর মানুষের যে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে, সেটি কেবল একটি শিশুর জন্য কান্না নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জাতিগত অপমানের বিস্ফোরণ। মানুষ আজ প্রশ্ন করছে—রাষ্ট্র কি কেবল ঘটনার পর শোকবার্তা দেবে? কয়েকটি বিবৃতি, কয়েকটি আশ্বাস আর কয়েকদিনের নাটকীয় তৎপরতার পর কি আবার সব আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যাবে? আর কত রামিসার লাশ দেখলে রাষ্ট্র বুঝবে যে কোমল ভাষার নিন্দা দিয়ে পাশবিকতা থামানো যায় না?
আজ বাংলাদেশের সমাজ এক ভয়ংকর নৈতিক পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, কিশোর গ্যাং, মাদক, পারিবারিক সহিংসতা, পরকীয়াজনিত খুন, সামাজিক বিকৃতি—এসব যেন আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। ভয়াবহ বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি। লাশ আমাদের আর কাঁপায় না, শিশুর কান্না আমাদের বিবেককে আর বিদীর্ণ করে না। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে, যেখানে অপরাধ আর ব্যতিক্রম নয়—বরং স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়?
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে—অপরাধ দমনে দুর্বলতা কোনো মানবিকতা নয়; এটি নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শাস্তির ভয় যখন বাস্তব হয় না, তখন অপরাধীর সাহসই কেবল বাড়ে।
একইসঙ্গে সমাজের ভেতরের পচনও ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করছে। পরিবার, যা একসময় মূল্যবোধের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছিল, আজ সেখানে অনৈতিকতা, দায়িত্বহীনতা, অবিশ্বাস এবং সহিংসতা ঢুকে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মত্ততা, মাদকের ভয়াল বিস্তার, অর্থলোভী প্রতিযোগিতা এবং বিকৃত সংস্কৃতির আগ্রাসনে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মানসিক ও নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে অপরাধ শুধু আইনের দুর্বলতার কারণে নয়, সমাজের আত্মিক মৃত্যুর কারণেও বিস্তার লাভ করছে।
অন্যদিকে মাদক ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে জনগণের ভবিষ্যৎ গ্রাস করছে, তারা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধী নয়—তারা জাতির বিরুদ্ধে সক্রিয় ধ্বংসযজ্ঞের কারিগর। এদের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার নয়, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের উন্মোচন এবং সামাজিকভাবে কঠোর বিচ্ছিন্নতার পথেও রাষ্ট্রকে হাঁটতে হবে।
আজ মানুষ আর সান্ত্বনা চায় না। তারা দেখতে চায় রাষ্ট্রের কঠোর মুখ। তারা দেখতে চায়—একটি শিশুর রক্ত বৃথা যায় না, অপরাধীরা ক্ষমতার ছায়ায় পালিয়ে যেতে পারে না, এবং কোনো মা যেন আর সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে বিচারহীনতার অভিশাপ না কাঁদে।
রামিসার ছোট্ট কবর আজ নীরবে পুরো জাতিকে প্রশ্ন করছে—
“এই রাষ্ট্র কি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারবে, নাকি ভবিষ্যতেও নিষ্পাপ শিশুর লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কেবল শোকের ভাষণই দেবে?”এই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়কেই দিতে হবে। সরকারকে দিতে হবে। প্রশাসনকে দিতে হবে। সমাজকেও দিতে হবে।
কারণ ইতিহাস নির্মম। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, একদিন সেই রাষ্ট্রের সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








