শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩১

পান্তা ভাতের স্বাদ

আহমেদ মুসা
পান্তা ভাতের স্বাদ

আরে, এই অসময়ে বিদ্যুৎ যেতে হলো! অগত্যা ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে খুঁজে নিলাম একটি পেঁয়াজ আর কয়েকটি শুকনো মরিচ। ইলেকট্রিক লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শুকনো মরিচগুলো ভেজে নিলাম। এই পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ আমার কখনোই সহ্য হয় না। কাশতে শুরু করলাম। এরপর পেঁয়াজ কেটে নিয়ে অন্ধকারে ফ্ল্যাশ জ্বেলে পান্তা ভাতের আয়োজন। ভাজা ইলিশের অভাব বোধ হচ্ছে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে ঝুম বৃষ্টির আওয়াজ।

মাঝেমধ্যে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দে অতীতের স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছি। আমি শুনতে পাচ্ছি, মা আমাকে খাবার খেতে ডেকে যাচ্ছেন। আমি তখন সাড়া না দিয়ে কানে বালিশ চেপে ফোনের স্ক্রিনে আমার প্রিয় সাইমুম সিরিজের উপন্যাসে মগ্ন। মা যখন সামনে এসে দাঁড়াতেন, ফোনটা ধীরে ধীরে সরিয়ে রেখে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম। মা কিছুক্ষণ বকাঝকা করে চলে যেতেন। তিনি আমার অসময়ে ঘুমের ভান বুঝতে পারতেন।

কিংবা কখনো কলেজে বা কাজে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে যখন খাবার না খেয়ে বের হব, তখন মা কিংবা বড় বোন এসে মুখের সামনে খাবার তুলে দিয়ে বলতেন, ‘খাবার না খেয়ে কোথাও যেতে পারবি না।’ করুণ সুরে বলতাম, ‘দয়া করে আমাকে যেতে দাও, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ তাঁরা নাছোড়বান্দা। মা বলতেন, ‘দেরি হলে হোক, আগে খাবার, পরে কাজ।’ তার ওপর আপুর রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বাধ্য হয়ে খেয়ে বের হতাম। তখন তাঁদের মমতাময়ী চেহারায় যে স্বস্তির চিহ্ন দেখতে পেতাম, তা আমার কাজ কিংবা কলেজে দেরির জন্য বকা শোনার কষ্টকে সামান্যতমও বাড়িয়ে দিত না।

আজ ফ্ল্যাশের আলোয় আয়োজন করা পোড়া মরিচ আর পেঁয়াজের টুকরো দিয়ে পান্তা ভাত আমাকে কল্পনার জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনল। চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আমি বুঝলাম, আজ অশ্রুরা আমার বারণ শুনবে না। তাদের আজ বাধা দিলাম না, গড়িয়ে পড়তে দিলাম নিজস্ব গতিপথে। টুপ করে পড়ে পান্তা ভাতের পানির সঙ্গে মিশে গেল।

নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য ভালো একটি কলেজে পড়ব বলে যেদিন গ্রাম ছেড়ে নতুন শহরে আসি, সেদিন দুদিন খাবার না খেয়ে থাকলেও কারও বকা শুনতে হয়নি কিংবা কেউ মুখের সামনে খাবার এনে বলেননি, ‘আগে খেয়ে নে, পরে কাজ।’ মনে পড়ে, দুদিন পর একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বিষয়টি জানতে পেরে খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। খাইয়ে না দিলেও দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন। তোমাদের অনুপস্থিতিতে তাঁর উপকার আমি আজও ভুলিনি। অচেনা পরিবেশে তিনিই ছিলেন একমাত্র চেনা কেউ।

এরপর পরিবারের সবার সঙ্গে খাবার খেতে যে আমি অভ্যস্ত ছিলাম, সেদিন হাত পুড়িয়ে নিজ হাতে রান্না করা খাবার একা একা খেতে কেমন লেগেছিল, তা আজ মনে নেই। রেস্তোরাঁর খাবারও খেয়ে দেখেছি, মায়ের মমতা মেশানো রান্নার স্বাদ আমি পাইনি। তারপর কত শতবার হাত পুড়িয়ে রান্না করলাম, সেই স্বাদ আর পেলাম না। খাচ্ছি তো কেবল বেঁচে থাকার জন্য, খাওয়ার জন্য বাঁচছি না।

তবে সুযোগ পেলেই বাড়িতে যাই মায়ের বকা শুনে খাবার খেতে। একটু আবদার করি, ‘মা, অনেক দিন তোমার হাতে খাইনি, দাও না একটু খাইয়ে।’

পুরোনো অভ্যাসে যখন খাব না বলে ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত হই, কিংবা ঘুমের ভান করে বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকি, কিংবা মাঝে মাঝে পড়ার টেবিলে বসে পড়ায় মগ্ন হই, তখন মা খাবার খেতে বললেই আমার এক কথা, ‘খাইয়ে দিলে খাব, নইলে খাব না।’ মা অগত্যা খাইয়ে দেন, আমি তৃপ্তি নিয়ে খাই।

কখনো মায়ের হাতে পান্তা ভাত খাইনি। আজ যখন সময়ের স্বল্পতার কারণে পান্তা ভাত নিয়ে বসতে হলো, আমার চোখ তখন ঝাপসা। এই সংগ্রামের অধ্যায়ে অন্ধকারে ফ্ল্যাশের আলোয় আজ নেওয়া যাক পান্তা ভাতের স্বাদ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়