প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫
ইলিশ-বচন

এখন অক্টোবর মাস। কিছুদিন পরেই বড় পূর্ণিমায় ঝঁাকে ঝঁাকে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে মেঘনায় আসবে। তাই এখন ইলিশ ধরা নিষেধ। শিশুদের মধ্যে মা ইলিশ ও জাটকার জন্যে তৈরি হোক মায়া ও ভালোবাসা। মা ইলিশ এবং শিশুদের নিবেদন করেই রচিত হলো ইলিশ-বচন।
ভূমিকা
অনেকের মনে ক্ষোভ ইলিশেরা বাঙালির
এ আমার গর্বই যত হোক ভাঙা নীড়
তেল-সোনা খনি নেই পৃথিবীর ধনী নেই
ইলিশের দৌলতে তবু জয়ধ্বনি দেই।
ইলিশ তো মাছ নয় এ যে মান আমাদের
আছি ঋণী আমি-তুমি আর কাকা-মামা ঢের
এতকিছু নাই তবু ইলিশতো আছে ভাই
সৌরভে গৌরবে চল চড়ি গাছে তাই!
১. ইলিশের কথা
ইল্লীষ হতে ইলিশের শুরু
ইল-ঈষ আসে ভাঙালে
গভীর জলের রাজা ইলিশেই
হয়েছে কাঙাল বাঙালে।
নয়শ শতকে জানা গেছে নাম
বলেছে জীমূত বাহনে
হ্যামিলটনের লেখাতে হিলসা
মাতে জলে অবগাহনে।
ইলিশের আছে জীবনচক্র
ডিম হতে হয় জাটকা
লোভী জেলেদের দলে ফেলে জাল
বলে খোকাদের আটকা।
জীবনের শুরু মিঠাজলে তার
লবণ জলেতে সে বাড়ে
তরুণ ইলিশে ওমেগার পুর
ধীর হয়ে চলে সে ভারে।
২. ইলিশেরা পঁাচবোন
ইলিশেরা আছে এ পৃথিবী জুড়ে
পঁাচবোন তারা গোষ্ঠীতে
তিনবোন থাকে বাংলার জলে
লেখা আছে কথা কোষ্ঠীতে।
একজন হলো চন্দনা টলি
একজন কেলি ডাকনামে
হিলসা নামের বোন বেশী দামি
প্রজননকালে ঝঁাক নামে।
আর দুইবোনে থাকে ঐ পারে
গোরাদের দেশে ঠাণ্ডাতে
এদেশের তাপ সয় না তাদের
চাই শীতলতা জানটাতে।
চন্দনা দিদি কঁাটা ভরা থাকে
কেলি দিদিমণি বড় চোখ
হিলসা দিদির রূপের বাহারে
ঈর্ষায় সবে করে শোক।
৩. ইলিশের প্রজনন
বছরজুড়ে সে হয় মা জননী
পেটে পেটে তার ডিম বাড়ে
মা হবার আগে তার দেহে মেদ
মোছে না সহজে ভিম বারে।
মার্চ-এপ্রিলে অক্টোবরেও
আসে তারা নদী মেঘনায়
সাগরের জলে লবণ অতল
মিঠাজলে এসে বেগ পায়।
এক মা ইলিশে ডিম পাড়ে কত?
গুণতে গেলে তা কুড়ি লাখ
মা মাছেরে তাই মেরো নাকো ভাই
জাল তুলে রাখো, ঝুড়ি থাক।
ইলিশের ছানা মারতে যে মানা
যতদিন তারা বড়ো হয়
বড় হলে তবে মেরে খেয়ো সবে
যখন নদীতে জড়ো হয়।
৪. ইলিশের নারী-পুরুষ
তোমরা কি জানো ইলিশের দেহে
নারী-পুরুষের আছে ভেদ
বড় হয় তারা সমতালে দুয়ে
কুড়ি শেষে নারী ধরে জেদ।
কুড়ি সেমি গেলে নারী বাড়ে দ্রুত
পুরুষেরা বাড়ে আস্তেই
নারীরা শরীরে ওমেগার পুরে
হয় রূপবতী স্বাস্থ্যেই।
কাল যত যায় নারীরা আগায়
চল্লিশ সেমি হয় পার
পুরুষেরা যায় তিরিশের ঘরে
তার বেশি কভু নয় আর।
ইলিশেরা বঁাচে তিন থেকে পঁাচ
বছর কিংবা আরো কম
এটুকু সময়ে আয়ু গেলে ক্ষয়ে
যায় নিভে হায় তারো দম।
৫. ইলিশের দেহ
ইলিশের গায়ে কত কঁাটা আছে
নয়শ কিংবা ন’হাজার!
কঁাটার সে ভয়ে যায়নি কো পাতে
বৃটেনের রানি ও রাজার।
যদি তারা খেতো বাঙালি কি পেতো
এমন নধর মাছেদের?
সেই কথা ভেবে বেহুঁশ হিসেবে
ইলিশ লুকিয়ে হাসে ঢের!
ইলিশের লেজ কঁাটা ভরা কঁাথা
শক্তিতে যেন লড়ে ভীম
সেই লেজে চলে ইলিশেরা দলে
মনে হয় তারা করে জিম।
খঁাটি ইলিশের তিনকোণা মাথা
দেহজুড়ে খেলে জোছনায়
গঙ্গায় তারা জলকেলি করে
মেঘনার জলে রোজ নায়।
৬. ইলিশের রেসিপি
ইলিশকে নিয়ে কত কথা আছে
গল্পের কোনো শেষ নেই
বাঙালি যেখানে ইলিশ সেখানে
তার নিজ কোনো দেশ নেই।
বাঙালি হেঁশেলে মা উনুন জ্বেলে
ইলিশ ভাজলে কড়কড়ে
জিভে জল আসে মিউ ঘোরে পাশে
উপোসীরা হয় নড়বড়ে।
ইলিশের সাথে বেগুনেরা মিশে
অমৃত রসের ধারা বয়
ইলিশ যে খায় স্বর্গ সে পায়
ধরণীর ধূলি হারা হয়।
সর্ষে ইলিশে নাকে জ্বলে তবু
পাত ছেড়ে কেউ উঠে না তো
ভাপা ইলিশের ঘ্রাণ পেয়ে নাকে
আর দঁাতে নখ কুটে না তো।
৭. হৃদয়ের বন্ধু ইলিশ
ইলিশেরা নাকি হৃদয়ের সখা
ডাক্তার বাবু বলেছে
এই কথা শুনে রসনা বিলাসী
বাঙালির চোখ জ্বলেছে।
তার দেহে আছে ওমেগার তেল
যার কাজ মেদ কমানো
রক্তের চাপ কমে গিয়ে হয়
হৃদয়ের জেদ দমানো।
ইলিশের তেল মায়ে খেলে হয়
গর্ভের শিশু চতুর
এই কথা শুনে বাঙালি নারীর
স্বামী গোবেচারা ফতুর।
শুনি আজকাল বহুমূত্রের
উপশম আছে ইলিশে
এই কথা শুনে ইলিশ-ধীবর
খেলো পান শত খিলি সে।
৮. উৎসবে ইলিশ
বারো মাসে হয় তেরো পাবনের
উৎসব ঘরে ঘরে
বৈশাখ এলে পান্তা-ইলিশে
মন মজে নড়েচড়ে।
জামাই ষষ্ঠী ইলিশকে ছাড়া
কোনো শাশুড়িরা মানে
ইলিশেই আছে বনেদীয়ানার
ভাব সে কথা কে জানে?
গোপালের হাতে জোড়া ইলিশের
বাহার দেখেই লোকে
এমন ভঙ্গি তাকিয়েছে যেন
ধরেছে হাজার জেঁাকে।
কনে আশিসের পবিত্র ক্ষণে
জামাই চেয়েছে খুঁজে
পদ্মার এক আস্ত ইলিশ
আগেভাগে নিবে বুঝে।
৯. ইলিশের রসালাপ
রবিবাবু ইলিশের কথা বেশি লেখেনি
পদ্মার ইলিশ কি চেখে তবে দেখেনি!
বঙ্কিম লিখেছিলো ‘দলনী’র বরাতে
ইলিশকে খেতে নাকি কষ্ট এ ধরাতে।
নজরুল ইলিশের ঘ্রাণে গেল ভড়কে
বেড়ালের নাক যদি ধরে ফেলে চোরকে!
ইলিশকে জোছনার তুলনা যে দিয়েছে
বুদ্ধের নামে নাম বসু শেষে নিয়েছে।
রামকৃষ্ণের কাছে ইলিশের ধারণা
খেলে পেট খারাপের হয় নাকি তাড়না
ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক রঁাধলে
মা’র কথা মনে করে ঠাকুর যে কঁাদলে!
দুনিয়াতে লোক আছে দুরকম জানবে
দুজনের কথা দিয়ে তবে ইতি টানবে
একদল ইলিশের খুব অনুরক্ত
অন্যরা ইলিশ না পেয়ে অভিশপ্ত।
১০. ইলিশের বিয়ে
বর এলো ধূতি পরে কনে বেনারসিতে
লগ্নটা হয় পার রূপাজ্যোতি শশীতে
বর নাকি জলে থাকে সাগরের কন্যা
বিয়ে হলে বয়ে যাবে আনন্দে বন্যা।
ইলিশের বর খাটো কনে নাকি লম্বা
কনে গুণে গুণবতী বর কাজে রম্ভা
প্রীতিভোজে এলো যারা তারা সবে ধূর্ত
একখানা মাছ পেতে নদীতীরে ঘুরতো।
ইলিশের বিয়ে হবে গয়নার বাক্সে
কন্যার মাতা যিনি দেখি তেল মাখছে
বর শুধু থেকে থেকে ওজনটা মাপছে
আর ভয়ে নিজে নিজে গিরগির কঁাপছে।
ইলিশের বিয়ে নিয়ে রমরমা হৈচৈ
শেষপাতে সংকটে খুঁজে বলে কই দৈ?
অবশেষে কনেমাতা দু’পা গেল পিছিয়ে
বর তাই কেঁদে সারা ফুটো থালা বিছিয়ে।
১১. ইলিশের বাড়ি চঁাদপুর
ইলিশের বাড়ি চঁাদপুরে জানি
ইলিশ যে তার মেয়ে
মেঘনার জল করে কল কল
অপলক থাকে চেয়ে।
মায়ের বুকের আদরে-মায়ায়
কন্যা যখন আসে
চঁাদপুরে চঁাদ জলে ডুব দিয়ে
তরল রূপায় হাসে।
জাটকারা চঁাদপুরেরই নাতি
মামার বাড়িতে এলে
জেলেদের দল কারেন্ট জালের
ফঁাদ পেতে ধরে ফেলে।
ইলিশেরা তাই অভিযোগ দেয়
কবির কানের কাছে
একটা বিহিত করতে হবে, কে
তুমি ছাড়া বলো আছে?
১২. বাঙালির গর্ব ইলিশ
ইলিশেরা আজকাল যায় প্রতিযোগিতায়
তাকে দেখে ঈর্ষায় হয় সবে রোগী হায়।
তারা যদি যায় হেঁটে ক্যাটওয়াকে র্যাম্পে
বুঝি তবে সেনাদের রাখা চাই এ ক্যাম্পে।
ইলিশেরা রূপবতী কাড়ে মন যুবকের
সেই ফঁাদে পড়ে টানে যদু-মধু-শুভ ঢের।
ইলিশের শিরোতাজে রূপা করে জ্বলজ্বল
বাঙালিনী ললনার চোখে জল ছল ছল।
কি নধর দেহ তার! কী যে তার শোভা-সাজ!
আমাদের নায়িকারা দেখে হয় বোবা-লাজ।
বাঙালির গর্বের একটাই আলামত
যেন রাখে ঈশ্বর তাকে সহি ছালামত।
মেঘনার পদ্মার ইলিশেরা সেয়ানাই
তারে ধরে রাখে বটে তেমন যে খেয়া নাই!
বুঝে নিও অন্যরা বাঙালি যে কী জিনিষ
বাঙালির গর্বের আছে বটে, জ্বী, ইলিশ!








