শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৭

ক্ষুদীরাম দাস

অন্ধ বিশ্বাসের মূল্য
ক্ষুদীরাম দাস

আশ্বিনের এক মিঠে রোদের সকালে নদীর ঘাটে প্রথম দেখা হয়ে ছিলো সুচরিতা আর অসীমের। সুচরিতা নদীর জলে থালা-বাসন মাজতে এসেছে, আর অসীম এসেছে শহরের নতুন পোশাকের সম্ভার নিয়ে গ্রাম গঞ্জে ঘোরাঘুরি করতে। অসীমের চেহারাটা ছিলো দেখার মতোÑসুন্দর কাটছাঁট মুখ, টানা চোখ আর মুখে মিষ্টি হাসি। পরনে শহরের কেতাদূরস্ত জামাকাপড়। কথা বলার এমন ঢং যে, যে কোনো মানুষের মন সহজেই জয় করে নিতে পারতো।

সুচরিতা ছিলো গ্রামের এক সাধারণ ঘরের মেয়ে। প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি সে স্থানীয় টোলে সংস্কৃত ও ধর্মশাস্ত্র শিখতে যেতো। শান্ত, ধার্মিক আর সরল স্বভাবের সুচরিতাকে গ্রামের সকলেই ভালোবাসতো। অসীম যখন সুচরিতার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে পথের ঠিকানা জিজ্ঞেস করছিলো, সুচরিতার বুকের ভেতর অচেনা এক স্পন্দন তৈরি হয়ে ছিলো।

প্রথম দেখার পর থেকেই অসীম বারবার সুচরিতার টোলে যাওয়ার পথে দেখা করতে শুরু করলো। অসীমের প্রতিটি মিষ্টি কথা সুচরিতার মনকে জয় করে নিচ্ছিলো। অসীম বলতো, সুচরিতা, তুমি এ এতোটা সরল আর এতোটা সুন্দর যে, তোমাকে না দেখলে আমার একটা দিনও ভালো যায় না। শহর থেকে এসে এই গ্রামে তোমাকে খুঁজে পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো উপহার।

ধীরে ধীরে সুচরিতার মনে অসীমের জন্যে গভীর ভালোবাসার সৃষ্টি হলো। সে ভাবতেও পারেনি অসীমের এই সুন্দর চেহারার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর শিকারি। সুচরিতার বিশ্বাস যতো গভীর হচ্ছিলো, অসীমের সুচতুর চালগুলোও ততোটাই জোরালো হচ্ছিলো। অসীম সুচরিতাকে নিয়ে আলাদা এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতো। বলতো, শহরে আমাদের নিজেদের একটা সুন্দর ঘর হবে। সেখানে আমরা দু'জনে খুব সুখে থাকবো।

সুচরিতার নিজের আবেগ, ভালোবাসা আর নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় হিসেবে অসীমকে মেনে নিয়ে ছিলো। অসীমের ছলাকলায় ভুলে একদিন সে তার সবটুকু বিশ্বাস অসীমের হাতে সঁপে দিয়ে ছিলো। তাদের সম্পর্ক হয়ে উঠে ছিলো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সুচরিতা মনে করেছিলো, এই ভালোবাসা বুঝি চিরদিনের।

কিন্তু ভালোবাসা কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন অসীমের লক্ষ্য ছিলো না। তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো অন্য কিছু। সুচরিতার চরম বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অসীম তার আসল চাল চাললো। একদিন সন্ধ্যায় সে সুচরিতাকে বললো, ‘শহরে আমার নতুন ব্যবসার কাজ গোছানো হয়ে গেছে। চলো, এবার আমরা দুজনে পালিয়ে গিয়ে বিয়েটা করে নিই। গ্রামের মানুষ এখন জানলে আমাদের আর এক হতে দেবে না।’

সুচরিতা সরল মনে অসীমকে বিশ্বাস করলো। মা-বাবার কথা ভেবে বুক কেঁপে উঠলেও অসীমের হাত ধরে সে রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো।

শহরে পৌঁছানোর পর অসীম সুচরিতাকে একটি অচেনা গলির পুরোনো বাড়িতে নিয়ে গেলো। সুচরিতা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করছিলো, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি? এখানে কেন?’ অসীম তখনো মিষ্টি হেসে জবাব দিয়ে ছিলো, ‘এটা আমার এক বন্ধুর বাড়ি। আজ রাতটা এখানেই থাকি, কাল সকালে আমরা মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে বিয়ে করে নেবো।’

কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে অসীমের চেহারার পরিবর্তন দেখতে পেলো সুচরিতা। অসীমের সেই মিষ্টি হাসি, সেই আদুরে কণ্ঠস্বর যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে হাজির হলো অন্য এক অধঃপতিত নারী ও কয়েজন অপরিচিত লোক। অসীম অত্যন্ত নির্দয়ভাবে সুচরিতার হাতটা ধরে টেনে তাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো।

সুচরিতা ভয়ে কেঁপে উঠে অসীমকে শক্ত করে চেপে ধরলো, ‘অসীম, এ এরা কারা? তুমি ওদের সাথে এভাবে কথা বলছো কেন?’

অসীম কুরুচিপূর্ণ হেসে তার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বললো, ‘বেশি কথা বোলো না। এখন থেকে এটাই তোমার জগৎ। তোমাকে আমি বিক্রি করে দিয়েছি।’

সুচরিতার পায়ের তল থেকে যেন মাটি সরে গেলো। সে কান্নায় ভেঙে পড়লো, অসীমের পায়ে ধরে ভিক্ষা চাইলো, ‘তুমি এমন করতে পারো না! আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম! তোমার জন্যে সব ছেড়ে এসেছি!’

কিন্তু অসীমের মনে কোনো দয়া হলো না। সুচরিতাকে এক অন্ধকার ঘরের ভেতর বন্ধ করে দিয়ে টাকার বান্ডিল পকেটে পুরে অসীম সেখান থেকে চম্পট দিলো। সেই রাত থেকেই সুচরিতার জীবনে নেমে এলো এক অন্ধকার নরক যাতনা। ভালোবাসার চরম মূল্য তাকে দিতে হচ্ছিলো এক পতিতালয়ের চার দেয়ালের আড়ালে।

প্রতিটি দিন ও রাত সুচরিতার জন্যে ছিলো নির্মম লাঞ্ছনার। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সুচরিতার বেঁচে থাকার এবং ন্যায়ের জন্যে লড়াই করার ইচ্ছাটা একদম মরে যায়নি। সে সুযোগ খুঁজতে লাগলো এই নরক থেকে বের হওয়ার।

অবশেষে এক রাতে, পতিতালয়ে আসা এক সহৃদয় ব্যক্তির নজরে আসে সুচরিতার এই করুণ অবস্থা। সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে তাকে সব ঘটনা খুলে বলে এবং তাকে বাঁচানোর আকুতি জানায়। লোকটির মনে দয়া হয়। তিনি গোপনে স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেন। পরদিন সকালে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেই নরক থেকে সুচরিতাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।

পুলিশ সুচরিতার কাছ থেকে সমস্ত ঘটনা শুনলো। সুচরিতার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অসীমের বিরুদ্ধে নারী পাচার ও প্রতারণার মামলা দায়ের হলো। সুচরিতা স্পষ্ট করে অসীমের চেহারার বিবরণ এবং তার সম্ভাব্য লুকিয়ে থাকার আস্তানা পুলিশকে জানিয়ে দিলো।

তদন্ত শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অসীমকে শহরের এক গোপন আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময়ও অসীমের মুখে কোনো অপরাধবোধ ছিলো না, তবে পুলিশের হাতকড়া পরা অবস্থায় তার সেই ভণ্ড রূপটা জনসমক্ষে প্রকাশ পেয়ে গেলো।

আদালতে অসীমকে হাজির করা হলে সুচরিতা সাহসের সাথে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অসীমের মুখোশ খুলে দিলো। সে বললো, ‘যে ভালোবাসার নামে বিশ্বাস করে নিজের সবকিছু উজাড় করে দেয়, তাকে এভাবে বিক্রি করে দেওয়া কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। এই রূপবান চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাক্ষসটার কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি চাই।’

গ্রামের মানুষ ও আদালত প্রাঙ্গণের সকলেই স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ছিলো এই নির্মম ভালোবাসার গল্প শুনে। মিষ্টি কথা আর সুন্দর চেহারার আড়ালে যে এতোটা ভয়ংকর কদর্যতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা অসীমকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারতো না।

অসীমের মামলা বিচারধীন রইলো এবং প্রশাসন তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দিলো। অন্যদিকে, সুচরিতাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানো হলো, যাতে সে তার মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠে আবার একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনে ফিরতে পারে।

সুচরিতার জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, মিষ্টি কথা আর সুন্দর চেহারা দেখে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা কতোটা বিপজ্জনক হতে পারে। চেহারার সৌন্দর্য কখনোই মানুষের চরিত্রের পরিচয় হতে পারে না। ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য সেই মানুষটিই, যে বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে জানে, ছলনা করতে নয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়