মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯

সাইকোলজিকাল থ্রিলার

ছায়াশিকারি

মিজানুর রহমান রানা
ছায়াশিকারি

সাত.

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মেঘ ডাকে। আকাশে ভাঙন নামে। শব্দ ফিরে আসে বৃষ্টির চোখের জল গড়িয়ে। বৃষ্টি ভাবছে ইরফান এখন কোথায়? তার রুমে, নাকি সে তার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে গুহার ভেতর গেছে? বৃষ্টি ভাবতে থাকে সেই কথা, ইরফানের বাবা-মায়ের কোনোই অস্তিত্ব নেই! তাহলে ইরফান এলো কোত্থেকে? তার পরিচয় জানা দরকার। সে বেরিয়ে ইরফানের রুমে গেল, কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। অনন্যা ও ইমতিয়াজের রুমে গেল, তারাও সেখানে নেই। তাহলে? বৃষ্টি ধীরে ধীরে বাইরে বেরুলো ইরফানের সন্ধানে—হয়তো আজই তার পরিচয় পেয়ে যাবে, এই আশায়।

গুহাটার মধ্যেই ইরফান বসে আছে, পাশে অনন্যা ও ইমতিয়াজ। এ সময় আরাধ জেগে উঠেছিল, কিন্তু এখনও জানে না সে কার পক্ষে।

তার চারপাশ নিঃশব্দ, অথচ ভেতরের শব্দ গর্জে উঠছে। গুহার দেওয়ালে ছায়া নড়ে ওঠে, যেন কারা পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, তাকিয়ে আছে তার সিদ্ধান্তের দিকে।

সে হাতের কালো লাঠিটা শক্ত করে ধরে, লাঠির মাথায় সাপটি নিঃশব্দে ফণা তোলে। ‘আলো... আলো...’ সেই ধাতব ফিসফিস আবার ফিরে আসে, কিন্তু এবার তাতে ভয় নয়, কেমন যেন স্মৃতির গন্ধ মেশানো।

আরাধ ভাবে, এই শব্দ কি তাকে বশ করবে, না সে এই শব্দকে পুড়িয়ে দেবে? দূর থেকে ভেসে আসে এক চাপা আন্দোলনের আওয়াজ, শব্দহীন, তবু ধ্বনি বহনকারী কাঁপন।

এ সময় সে পাশে তাকিয়ে দেখে ইমতিয়াজ ও অনন্যা নেই। শুধু ইরফান বসে আছে, খাতায় কী যেন লিখছে। সে ইরফানকে প্রশ্ন করে, ‘ওরা কোথায় গেল?’

ইরফান নিরুত্তর। সে লেখায় মনোযোগী। আরাধ ইরফানের খাতাটা লক্ষ্য করল। ইরফান লিখে চলেছে : “আমরা আর কতকাল চুপ করে থাকব? রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকরা দেশের সোনা-রূপা, ধন-দৌলত, গ্যাসক্ষেত্র—সবই লুটেপুটে খাচ্ছে। আর আমাদেরকে সামান্য কিছু খাবারের লোভ দেখিয়ে দমিয়ে রেখেছে। শুনেছি একশ’ বছর আগে মূক-বধিরতার আইন পাস হয়েছিল—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন ক্রমে ক্রমে এমনই দানব হয়ে উঠেছে, যা আজ মানুষের জন্য নিরাপত্তাহীনতায় পর্যবসিত হয়ে উঠেছে। এই আইন গত একশ’ বছরে কেউ সংস্কার করেনি। বিপ্লবের মন্ত্রে হাজার হাজার কিশোর-তরুণ শহীদ হয়েছে, স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে; কিন্তু একজনের পতনের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এই আইনকে আরও নিজেদের পক্ষে শক্তিশালী করেছে। নিজেরা এই আইনের বলে হয়ে উঠেছে এক-একটি দানব, তারা মানুষের কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখতে নিঃশব্দতার পথে নিয়ে গেছে। মানুষও কথা বলতে ভুলে গেছে। অফিস-আদালত সবখানেই নিঃশব্দতা, কোনো শব্দ নেই। রোবটের মতোই মানুষ কাজ করে চলছে, আর নিজের শ্রম নীতি-নির্ধারকদের পদতলে লুটিয়ে নিজেরা সামান্য কিছু ভিক্ষার ঝুটা গ্রহণ করছে...।”

আরাধ অবাক হয়, ইরফান এসব ইতিহাস কোথায় পেল? তার মস্তিষ্ক থেকে হাতের কলমে এগুলো কীভাবে আসছে? কোন শক্তি তাকে দিয়ে এসব লেখাচ্ছে?

ঠিক এ সময় শহরের কেন্দ্র থেকে অনন্যা নেতৃত্ব দিচ্ছে এক গোপন সম্প্রচারে, যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভব ছড়িয়ে দেওয়া হয় তরঙ্গফলকের মাধ্যমে।

একটি ছায়াপথ তৈরি হচ্ছে, একেকটি অনুভূতি একেকটি বার্তা হয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে চারপাশের যন্ত্রগুলোকে।

নাহার এবং বৃষ্টি এখন জনতার মাঝে, কিন্তু মুখে কিছুই বলছে না। তারা হাঁটছে হাতে ধরা সাদা কাগজে আঁকা মাত্র একটি রেখা নিয়ে, যেন কণ্ঠহীন বিপ্লবের বহমান পতাকা।

এদিকে রাষ্ট্র-নীতি-নির্ধারক আবাল সিং নতুন এক নির্বাহী আদেশ জারি করে : “শব্দ সৃষ্টি একটি রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। শব্দে প্রতিক্রিয়া হলে, তা গণদ্রোহ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ শব্দ করে কোনো দাবি আদায় আমরা মেনে নেব না।”

তবু শহরের ভেতরে এক পুরোনো ঘড়ি নিজে থেকেই বেজে ওঠে। টিকটিক করে একেকটি শব্দ যেন সময়কে বলে দেয়, আর সময় নেই...।

আরাধ সেই ঘড়ির শব্দ শোনে এবং ভাবে, এই শব্দ তো কারও বিরুদ্ধে নয়, তবু কতটা তীব্র! তার মনে পড়ে কবির মৃত্যু, তার নিজের জন্ম, আর সেই অভিশপ্ত অনুভব, ‘আমি তৈরি হয়েছি নিঃশব্দতার জন্য, কিন্তু বেঁচে আছি শব্দকে ধ্বংস করতে গিয়ে।’ তখনই সে অনুভব করে, সে হয়তো আর হাতিয়ার নয়, সে নিজেই একটা প্রশ্ন।

সে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে। শহরের দিকে হাঁটে। পথে তার সামনে এসে দাঁড়ায় এক শিশু; কানে একটা ছোট তরঙ্গফলক, চোখে কৌতূহল।

শিশুটি বলে না কিছু, কেবল তরঙ্গফলকে এক পংক্তি দেখায় : “যদি কেউ আবার শব্দ তুলতে চায়, তাকে একা ভাবো না।”

আরাধ থেমে যায়। তার ভেতরে কোথাও যেন এক ভেঙে পড়া কণ্ঠ আবার জেগে উঠে ফিসফিস করে, “তুমি তো দানব নও, তুমি তো ক্ষত। আর ক্ষতই তো সবচেয়ে গভীর স্মৃতির উৎস।”

ঠিক সে সময়ই বৃষ্টি আরাধকে ফাঁকি দিয়ে হাজির হয় গুহার অভ্যন্তরে। ইরফানকে দেখে সে তার লেখাগুলো পড়তে থাকে। তারপর লেখা পড়ে তাকে প্রশ্ন করে, ‘তোমার পরিচয় কী? বলো, আমাকে বলো। আমার খুবই জানা দরকার।’

ইরফান খাতা থেকে মুখ তোলে, বৃষ্টিকে দেখে হেসে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে খাতায় লেখে : ‘আমার পরিচয় আজ আমি তোমাকে দেব, তার আগে কিছু কথা জানা দরকার। জেনে নাও। ইরফান—একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ : প্রজ্ঞা, জ্ঞান, মেধা, সচেতনতা বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। এটি শুধু একটি নাম নয়, বরং এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও উপলব্ধির প্রতীক। ইরফান শব্দটি কখনো কখনো সুফিবাদের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়, যেখানে এটি আত্মজ্ঞান বা স্রষ্টাকে জানার গভীর উপলব্ধিকে বোঝায়। তবে আমার ভাবনা, কাজ, কবিতা এবং অনুভবের গভীরতা যেন এই নামের অর্থকেই বহন করে; এমন একজন, যিনি শব্দের বাইরেও অনুভব করতে পারেন এবং যার প্রতিটি উচ্চারণ এক ধরনের জাগরণ। তুমি কি আমার অন্য কোনো পরিচয় চাও?’

এ পর্যন্ত লিখেই ইরফান বৃষ্টির দু চোখের দিকে তাকায়। বৃষ্টি আর কোনো কথা বলতে পারে না। আসলেই সে ইরফানের পরিচয় পেয়ে গেছে। এর বাইরে আর কোনো পরিচয় তার কাছে অর্থবহ বলে মনে হয় না। এ সময় গুহায় প্রবেশ করে তাসফিয়া। ইরফান ও বৃষ্টিকে দেখে চমকে ওঠে।

হঠাৎ গুহাটায় জ্বালানো মোমবাতির আলো নিভে যায়। একরাশ গভীর অন্ধকার। বাইরে বজ্রপাতের আওয়াজ। সেই বজ্রপাতের আলোতে দেখা যায় একটি দশ-এগারো বছরের শিশু। হাতে পানির বোতল।

তাসফিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘কে তুমি?’

ছেলেটি অলৌকিক হেসে ওঠে। তারপর ফিসফিস করে বলে, ‘আমার নাম এই পানির বোতলটায় লেখা আছে। পড়ে দেখতে পারো।’ এই বলে সে পানির বোতলটা ছুঁড়ে দেয় তাসফিয়ার নিকটে। তাসফিয়া বোতলটা কুড়িয়ে নিয়ে দেখে তাতে লেখা আছে : ‘মুগ্ধ পানি’।

তাসফিয়া তাকায় ছেলেটার দিকে, তার শরীর বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে ছেলেটার কাছে আসে, কিন্তু তাকে ধরতে পারে না। আবারও ছেলেটা হেসে ওঠে, তারপর বলে, ‘তুমি কি একশ’ বছর আগের ইতিহাস পড়োনি? বিপ্লবীদের পানি পান করাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আমি প্রাণ হারাই। আজ তোমরা একশ’ বছর ধরে নিঃশব্দের শহরে চুপচাপ শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় আদেশ মেনে মূক-বধির হয়ে বসে আছ। আমাদের মতো নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিতে কি তোমাদের ভয় হয়?’

বৃষ্টি ও ইরফান ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই ছেলেটির অবয়ব মুছতে শুরু করে, ধীরে ধীরে সে অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে যায়। এরপর গুহার নিঃশব্দতা যেন আরও ঘন হয়ে আসে। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রশ্ন আর প্রতিজ্ঞার ওজনে। তাসফিয়া, বৃষ্টি আর ইরফান—তিনজনেই দাঁড়িয়ে থাকে সেই জায়গায়, যেখানে একটু আগেও ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক দাঁড়িয়ে ছিল। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তাদের চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি—ভয়ের নয়, বরং বোঝার, জেগে ওঠার।

এরপর একটি শব্দহীন কণ্ঠস্বর যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, ‘তোমরা যদি সত্যিই জেগে ওঠো, তবে শব্দ নয়, স্পন্দন দিয়েই বদলে দাও পৃথিবী।’

তাসফিয়া বোতলটা শক্ত করে ধরে। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জল দুর্বলতার নয়; স্মৃতির, দায়বদ্ধতার।

বৃষ্টি ধীরে ধীরে ইরফানের পাশে এসে দাঁড়ায়। সে আর প্রশ্ন করে না, কারণ সে বুঝে গেছে, ইরফান শুধু একজন ব্যক্তি নয়—সে এক চলমান চেতনা, এক জীবন্ত ইতিহাস।

শহরের অন্য প্রান্তে অনন্যা তরঙ্গফলকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক নতুন বার্তা, ‘শব্দ নয়, কিন্তু প্রতিধ্বনি হবে। নিঃশব্দ নয়, কিন্তু প্রতিরোধ হবে। আমরা মুখ খুলব না, কিন্তু চোখে আগুন জ্বলবে।’

ইমতিয়াজ শহরের পুরোনো ঘড়ির নিচে দাঁড়িয়ে; হাতে একটি সাদা পতাকা, তাতে কোনো শব্দ নেই, শুধু আঁকা একটি স্পন্দনের রেখা।

আরাধ হাঁটছে শহরের কেন্দ্রের দিকে, তার হাতে সেই কালো লাঠি, কিন্তু এবার সাপটি নিঃশব্দ—যেন সে জানে, লড়াই শুরু হয়েছে; তবে এবার শব্দ দিয়ে নয়, অনুভব দিয়ে।

আকাশে আবার মেঘ ডাকছে। কিন্তু এবার সেই ডাক ভয় নয়, বরং এক আহ্বান : ‘জেগে ওঠো, মনে রেখো, তুমি তো দানব নও, তুমি তো ক্ষত। আর ক্ষতই তো সবচেয়ে গভীর স্মৃতির উৎস।’

সেই রাতেও একটি খুন হয়। আকাশের মেঘের ঘর্ষণে জ্বলে ওঠা আলোয় মেয়েটির মুখ দেখা যায়। তার নাম অপরূপা। মেয়েটি এতই সুন্দরী ছিল যে, অন্ধকারেও তাকে স্পষ্ট দেখা যায়। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়