শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১৩:১৮

প্রাথমিকের শিশুর ভাষা ও গণিত বিষয়ের আকর্ষণীয় পাঠদানের কৌশল ও চ্যালেঞ্জ

রাশেদা আতিক রোজী
প্রাথমিকের শিশুর ভাষা ও গণিত বিষয়ের আকর্ষণীয় পাঠদানের কৌশল ও চ্যালেঞ্জ

প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শেখানোর মূল চাবিকাঠি হলোÑকম পড়ানো, বেশি খাটানো। অর্থাৎ শিক্ষক নিজে কম কথা বলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কাজে যত বেশি ব্যস্ত রাখবেন, পাঠ তত বেশি আকর্ষণীয় হবে এবং শিক্ষকের পরিশ্রমও সার্থক হবে। এছাড়াও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শ্রেণী কক্ষে ধরে রাখা এবং প্রতিটি পাঠকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা একজন শিক্ষকের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। শিশুদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় প্রথাগত লেকচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়।

শিক্ষার্থীদের ভাষা ও গণিত বিষয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিচের কৌশলগুলো দারুণ ভূমিকা রাখে:

১ । খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা

শিশুরা খেলতে ভালোবাসে। শব্দগঠন, গণিতের ছোটখাটো হিসাব বা সাধারণ জ্ঞান যদি বিভিন্ন খেলার (যেমন পাজল, কুইজ, রোল-প্লে) মাধ্যমে শেখানো যায়, তবে তারা সহজে ক্লান্ত হয় না।

২ । দৃশ্যমান ও বাস্তব উপকরণের ব্যবহার

শুধু বইয়ের ছবি না দেখিয়ে বাস্তব বস্তু (যেমন-ফল, পাতা, কাঠি) বা রঙিন চার্ট, মডেল এবং ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহার করলে পাঠ সহজবোধ্য হয়।

৩ । ডিজিটাল ও আইসিটি কনটেন্ট

মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর বা স্ক্রিনে ছোট অ্যানিমেশন, শিক্ষণীয় কার্টুন (যেমন-মীনা কার্টুন) কিংবা ছড়ার ভিডিও দেখালে শিক্ষার্থীরা গভীর মনোযোগ দেয়।

৪ । গল্প বলা এবং ছড়া-গানের ব্যবহার

যেকোনো কঠিন বিষয়কে ছোট গল্পের ছলে উপস্থাপন করলে শিশুরা তা দীর্ঘদিন মনে রাখে। পাঠের শুরুতে ছড়া বা গান গেয়ে পরিবেশ হালকা ও আনন্দময় করা যায়।

৫ । দলগত কাজ ও সহপাঠী শিক্ষা

ছোট ছোট দলে ভাগ করে কোনো কাজ দিলে তাদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়ে এবং পড়াশোনাকে বোঝা মনে হয় না।

৬ । সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রশংসা

শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের ছোট ছোট সাফল্যেও “চমৎকার”, “খুব ভালো হয়েছে” বলে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করা।

একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল চার দেয়ালের শ্রেণীকক্ষ নয়, এটি মূলত শিশুদের কল্পনা আর কৌতূহলের এক জাদুর বাক্স। কিন্তু প্রতিদিন একই নিয়মে ক্লাস শুরু হলে, সেই বাক্সের জাদুকরী আলোটা ম্লান হয়ে যায়। শিশুরা তখন ক্লাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে মন খারাপের মেঘ গোনে।

শিক্ষাদান কোনো একতরফা বক্তৃতা নয়; এটি একটি জীবন্ত শিল্প। ক্লাসটি শুরু হতে হবে এমন এক চমকপ্রদ হুক বা টোপ দিয়ে, যা শিশুর মনকে ক্লাসরুমে বেঁধে ফেলবে। এরপর সেই পাঠকে টেনে নিয়ে যেতে হবে তাদের চেনা বাস্তব জীবনের উঠোনে, যেখানে বইয়ের অক্ষরগুলো প্রাণ ফিরে পাবে। ক্লাসরুমের একঘেয়েমি দূর করতে শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর তৈরি হবে এক নিবিড় মিথস্ক্রিয়া বা বোঝাপড়া। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে রঙ ছড়াবে চোখের সামনে ভেসে ওঠা দৃশ্যমান উপকরণ ও আনন্দের নড়াচড়া। সবশেষে, ক্লাস থেকে বিদায় নেওয়ার আগে থাকবে একটি মজার প্রতিফলন, যা শিশুর মনে সেই পাঠের আনন্দকে চিরস্থায়ী করে রাখবে। একটি সফল ক্লাসের রহস্য লুকিয়ে আছে পঁাচটি জাদুকরী সুতোয়।

০১. আকর্ষণীয় সূচনা-

ক্লাসে ঢুকেই “আজ আমরা পৃষ্ঠা নম্বর ১০ পড়ব” না বলে, এমন কিছু দিয়ে শুরু করুন যা দেখে শিশুরা চমকে যায় এবং তাদের মনে কৌতুহল তৈরি হয়। এটি হতে পারে কোনো গল্প, ধঁাধা, জাদু বা কোনো রহস্যময় বস্তু।

উদাহরণ: তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞানের ‘পানি দূষণ’ পড়ানোর আগে শিক্ষক ক্লাসে দুটি কঁাচের গ্লাস নিয়ে ঢুকলেন। একটিতে পরিষ্কার পানি, অন্যটিতে নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি। শিক্ষক কোনো কথা না বলে গ্লাস দুটি টেবিলের ওপর রাখলেন। শিশুরা কৌতূহলী হয়ে উঠবে। শিক্ষক তখন জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা তৃষ্ণার্ত হলে কোন গ্লাসের পানি খাবে এবং কেন? ব্যাস, শিশুরা পাঠের মূল বিষয়ে ঢুকে গেল!

০২. বাস্তব জীবনের সাথে সংযোগ-

বইয়ের পড়া যদি বাস্তব জীবনের চেনা জগৎ, পরিবার বা পরিবেশের সাথে না মেলে, তবে শিশুরা তা সহজে বুঝতে চায় না। তাই পড়াটাকে তাদের চারপাশের চেনা দুনিয়ার সাথে মিলিয়ে দিতে হবে।

উদাহরণ: চতুর্থ শ্রেণীর গণিতে ‘যোগ-বিয়োগ’ বা ‘টাকার হিসাব’ শেখানোর সময় বইয়ের কঠিন অংক না করিয়ে শিক্ষক বলতে পারেন, “মনে করো তোমার মা তোমাকে হাটে বা বৈশাখী মেলায় ১০০ টাকা দিয়ে পাঠালেন। তুমি ২৫ টাকার একটা আইচক্রিম আর ছোট ভাইয়ের জন্য ৬০ টাকার একটি প্লাস্টিকের গাড়ি কিনলে। এখন তোমার কাছে কত টাকা থাকবে? নিজের চেনা মেলার কথা শুনে শিশুরা খুব সহজেই অংকটি নিজের মনে করে সমাধান করবে।

০৩. মিথস্ক্রিয়া বা পারস্পরিক অংশগ্রহণ-

শিক্ষক শুধু একতরফা বলে যাবেন আর ছাত্ররা শুনবেÑএই পদ্ধতি এখন পুরোনো। ক্লাসে দলগত কাজ, কুইজ বা জোড়ায় জোড়ায় আলোচনার সুযোগ রাখতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু কথা বলার সুযোগ পায়।

উদাহরণ: দ্বিতীয় শ্রেণীর বাংলায় ‘খামার বাড়ির পশুপাখি’ পড়ার সময় শিক্ষক পুরো ক্লাসকে কয়েকটি দলে ভাগ করে দিলেন (যেমন: গরু দল, ছাগল দল, হঁাস দল)। এবার একেক দলকে তাদের নির্ধারিত পশুর ডাক এবং তারা কী খায় তা অভিনয় করে বা মুখে বলে অন্য দলকে বোঝাতে বললেন। এতে পুরো ক্লাস উল্লাসে মেতে উঠবে এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

০৪. দৃশ্যমান উপকরণ ও অঙ্গভঙ্গি :-

শিশুরা চোখের সামনে কিছু দেখলে বা নিজেরা নড়াচড়া করতে পারলে সবচেয়ে ভালো শেখে। আমাদের দেশে দামি প্রজেক্টর না থাকলেও ঘরের বা মাঠের সহজলভ্য জিনিস এবং শিক্ষকের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি/বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়েই চমৎকার দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব।

উদাহরণ: প্রথম শ্রেণীর ‘বর্ণপরিচয়’ বা ‘কাউন্টিং’ শেখানোর জন্য শিক্ষক ক্লাসরুমের বাইরে স্কুলের মাঠে নিয়ে গেলেন। সেখানে মাটিতে দাগ কেটে বা গাছের পাতা, ছোট ছোট পাথর কুড়িয়ে এনে বললেন, “চলো তো আমরা ৫টি করে পাথর আলাদা করি।” অথবা ‘কাক ও কলসি’র গল্প বলার সময় শিক্ষক নিজেই কাকের মতো ডানা ঝাপটানোর অভিনয় করে দেখাতে পারেন।

০৫. প্রতিফলন ও মজার পুনরাবৃত্তি-

ক্লাস শেষ হওয়ার ঠিক ৫ মিনিট আগে পুরো ক্লাসে কী শেখা হলো তা একঘেয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে না জেনে, কোনো মজার খেলা বা কুইজের মাধ্যমে ঝালিয়ে নিতে হবে।

উদাহরণ: ক্লাস শেষের আগে শিক্ষক একটি ছোট বল (কাগজের তৈরি গোল্লাও হতে পারে) নিয়ে ‘মিউজিক বল’ খেলা শুরু করলেন। শিক্ষক যখন হাততালি থামাবেন, বলটি যার হাতে থাকবে সে আজকের পাঠ থেকে একটি মজার তথ্য বলবে। অথবা “আজকে আমরা যা শিখলাম, তা বাড়ি গিয়ে কাকে বলবে এবং কীভাবে বলবে?”Ñএই প্রশ্নের মাধ্যমে ক্লাস শেষ করা। এতে শিক্ষকের মূল্যায়নও হয়ে গেল, আবার হাসিমুখে ক্লাসটি শেষ হলো।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি আদর্শ ক্লাসরুম হলো শিশুর আগামীর স্বপ্ন বোনার কারখানা। সেখানে শিক্ষক কেবল তথ্যের বাহক নন, বরং একজন দক্ষ জাদুকর। ওপরের পঁাচটি জাদুকরী সুতোÑআকর্ষণীয় সূচনা, বাস্তবতার ছেঁায়া, আনন্দময় অংশগ্রহণ, দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা এবং খেলার ছলে মূল্যায়নÑযখন একসাথে মিলেমিশে যায়, তখন পড়াশোনা আর চাপ বা মুখস্থবিদ্যার বৃত্তে বন্দি থাকে না। তা হয়ে ওঠে শিশুর প্রতিদিনের আবিষ্কারের আনন্দ।

যেদিন আমাদের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাবে, সেদিন আর কোনো শিশুকে ক্লাসরুমে বসে জানালার বাইরে মনখারাপের মেঘ গুনতে হবে না। বরং প্রতিদিন সকালে তারা এক বুক আগ্রহ নিয়ে স্কুলের দিকে ছুটবেÑনতুন একটি জাদুর বাক্সের খেঁাজে, নতুন কিছু শেখার আনন্দে।

বিষয়ভিত্তিক ভাষা শিক্ষা ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জনের আকর্ষণীয় পাঠদান কৌশলÑ

ক) ভাষা শিক্ষা (বাংলা ও ইংরেজি)Ñ

ভাষা শেখার মূল ভিত্তি হলো আনন্দদায়ক উপায়ে শব্দভাণ্ডার বাড়ানো এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।

শব্দ ছক ও ফ্ল্যাশকার্ড

প্রতিদিন বোর্ডে একটি নতুন শব্দ লিখে সেটি দিয়ে বাক্য তৈরির খেলা খেলা যেতে পারে। বর্ণ বা শব্দ লেখা ফ্ল্যাশকার্ড উল্টে রেখে শিশুদের তা খুঁজে বের করতে বলা বেশ কার্যকর।

অভিনয়ের মাধ্যমে গল্প বলা

বইয়ের কোনো গল্প বা সংলাপ শুধু রিডিং না পড়িয়ে, শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট চরিত্রে ভাগ করে অভিনয় করতে দিলে তারা বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করতে পারে।

ছবি দেখে গল্প বলা: বইয়ের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করাÑ”বলতো এখানে কী হচ্ছে?” এতে শিশুদের কল্পনাশক্তি ও কথা বলার জড়তা কেটে যায়।

খ) গণিত শিক্ষা

গণিত অনেক শিশুর কাছে ভয়ের কারণ হতে পারে, তাই এটিকে বাস্তব জিনিসের সাথে মিলিয়ে দেওয়া জরুরি।

ক। বাস্তব উপকরণের ম্যাজিক

যোগ-বিয়োগ বা গুণের ধারণা দিতে কাঠি, মার্বেল, পাতা বা চকলেট ব্যবহার করুন। ৩টি কাঠির সাথে ২টি কাঠি মেলালে ৫টি হয়Ñএটি চোখে দেখলে তারা সহজে ভুলবে না।

খ । গণিতের ছড়া ও খেলা: সংখ্যার ছড়া বা “নামতার গান” গেয়ে গেয়ে মুখস্থ করালে তা আনন্দদায়ক হয়। এছাড়া “লুডু” বা “ছক্কা” খেলার মাধ্যমে যোগ-বিয়োগের প্রাথমিক ধারণা খুব দ্রুত দেওয়া । এক্ষেত্রে কঠিন

চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দামী উপকরণের অভাব।

সব সময় প্রজেক্টর বা দামী চার্ট পেপার পাওয়া যায় না।

সমাধানÑ’বিনা মূল্যের উপকরণ’(লো কস্ট+ নো কস্ট) প্রকৃতি ও চারপাশ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করুন। খালি ম্যাচ বক্স, প্লাস্টিকের বোতলের ছিপি (গণনার জন্য), পুরানো ক্যালেন্ডারের উল্টো পিঠ (বড় চার্ট লেখার জন্য) বা খবরের কাগজের ছবি কেটে চমৎকার শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা যায়। এর জন্য কোনো বাড়তি ফান্ডের প্রয়োজন হয় না।

রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি ), চঁাদপুর সদর।

ছবি : ০৮

শিশুর নিরাপত্তায় গুড টাচ্ এবং বেড টাচ্ সম্পর্কে সচেতনতা ও করণীয়

রোকেয়া সুলতানা

শিশুদের সাথে কথা বলতে হবে সহজ সাবলীল ভাষায়।কঠিন কথাকে সহজভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা কেবল পাণ্ডিত্য নয়, এটি একটি অনন্য শিল্প। মার্জিত শব্দচয়নই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের আসল দর্পণ।শব্দ দিয়ে মানুষকে জয় করা যায়, আবার শব্দ দিয়েই দূরত্বের সৃষ্টি হয়। সুন্দর করে কথা বলা এবং সঠিক শব্দের প্রয়োগই মানুষকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের ‘গুড টাচ’ (নিরাপদ স্পর্শ)এবং ‘ব্যাড টাচ’ (অনিরাপদ স্পর্শ)সম্পর্কে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জরুরি একটি বিষয়। শিশুরা সরল ও অবুঝ হওয়ায় অনেক সময় নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বুঝতে বা কাউকে বলতে পারে না।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরির মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১.। আত্মরক্ষা ও সচেতনতা তৈরি

শিশুরা সাধারণত পরিচিত বা অপরিচিত সবার আচরণকেই স্বাভাবিক মনে করে। গুড টাচ এবং ব্যাড টাচের সুস্পষ্ট পার্থক্য বুঝতে পারলে তারা বুঝতে পারে কোন স্পর্শটি ভালোবাসার আর কোনটি ভয়ের বা অস্বস্তির। এই জ্ঞান তাদের নিজেদের শরীর সম্পর্কে সচেতন করে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করে।

২ । গোপনীয়তা এবং নিজের শরীরের ওপর অধিকার

শিশুদের খুব ছোট থেকেই শেখানো উচিত যে, তাদের শরীর সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব।

৩ । সুইমস্যুট রুল

শিশুদের সহজে বোঝানোর জন্য বলা যায়Ñশরীরের যেসব অংশ আমরা পোশাক বা সঁাতার কাটার পোশাক দিয়ে ঢেকে রাখি, সেগুলো অত্যন্ত ব্যক্তিগত।

* চিকিৎসক (বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে) ছাড়া অন্য কারো এই অংশগুলোতে স্পর্শ করার বা দেখার কোনো অধিকার নেইÑএই বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।

৪ । ভয় ও নীরবতা ভাঙা

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার শিকার হলে ভয়ে বা অপরাধবোধে চুপ হয়ে যায়। কারণ তারা বুঝতে পারে না দোষটি আসলে কার। স্কুল থেকে যখন শিক্ষকরা এই বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন, তখন শিশুরা অভয় পায়। তারা বুঝতে শেখে যে এমন কিছু ঘটলে দোষ তাদের নয় এবং এটি লুকিয়ে না রেখে বড়দের জানানো উচিত।

৪। নিরাপদ মানুষ চিহ্নিত করা

শ্রেণীকক্ষে এই বিষয়ে আলোচনার সময় শিশুদের শেখানো হয় যে, যদি কখনো তারা কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তবে তারা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ৩টি কাজ করে:

১. না বলা

জোরালো গলায় “না” বলা বা চিৎকার করা।

২. পালিয়ে যাওয়া

সেই স্থান থেকে দ্রুত সরে যাওয়া।

৩ . কাউকে বলা

বিশ্বাসযোগ্য কোনো বড় মানুষকে জানানো।

বিদ্যালয় থেকেই তাদের শিখিয়ে দেওয়া দরকার যে তাদের বাবা-মা, শিক্ষক বা নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিই হলেন তাদের ‘নিরাপদ মানুষ’/ সেফ জোন যাদের কাছে তারা যেকোনো গোপন কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে।

৫। শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের দায়িত্ব

যেহেতু শিশুরা দিনের একটি বড় সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাটায়, তাই শিক্ষকদের প্রতি তাদের গভীর বিশ্বাস থাকে। অনেক সময় যে কথাটি তারা বাবা-মার কাছে বলতে দ্বিধা বোধ করে, তা একজন স্নেহশীল শিক্ষকের কাছে সহজে বলে ফেলে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই সচেতনতা তৈরি করা প্রতিটি বিদ্যালয়ের অন্যতম সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

শিক্ষকদের জন্য পরামর্শ (শিক্ষার্থীদের যেভাবে বলবেন):

১। বিষয়টি শিশুদের শেখানোর সময় কোনো প্রকার ভীতি বা জটিল বৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার না করে

২। গল্প, ছড়া, পুতুল বা ছবির মাধ্যমে

অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা উচিত। যেমনÑমা যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দেন বা শিক্ষক যখন পিঠ চাপড়ে সাবাশ বলেন, সেটা গুড টাচ। কিন্তু কেউ যদি এমনভাবে স্পর্শ করে যা তোমার ভালো লাগে না বা তোমাকে ভয় দেখায়, সেটাই ব্যাড টাচ।

প্রাথমিক স্তর থেকেই এই বুনিয়াদি শিক্ষা দেওয়া গেলে শিশুদের শৈশব যেমন নিরাপদ হবে, তেমনই একটি সচেতন ও সুরক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে শ্রেণী কক্ষে শিশুদের শুধু লেকচার দেওয়াই শেষ কথা নয়, শিক্ষককে ক্লাসরুমের পরিবেশ এমন রাখতে হবে যেন শিশুরা আশ্বস্ত বোধ করে।

নিরাপদ সার্কেল তৈরি

বোর্ডে একটি বৃত্ত এঁকে সেখানে মা, বাবা, শিক্ষক ও নির্ভরযোগ্য আত্মীয়দের নাম লিখুন। শিশুদের জানান, এরা তাদের নিরাপদ মানুষ। যেকোনো সমস্যায় এদের কাছে নির্দ্বিধায় বলা যাবে।

বন্ধুসুলভ আচরণ ও ধৈর্য ধরে শোনা

কোনো শিশু যদি কখনো একা এসে শিক্ষককে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনার কথা বলতে চায়, তবে শিক্ষককে অত্যন্ত ধৈর্য ধরে, স্নেহের সাথে তার কথা শুনতে হবে। শিশুকে কোনোভাবেই ধমক দেওয়া বা থামিয়ে দেওয়া যাবে না।

শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা: কোনো শিশু হঠাৎ ক্লাসে খুব চুপচাপ হয়ে গেলে, একা একা থাকলে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেললে বা স্কুল আসতে ভয় পেলে শ্রেণী শিক্ষক হিসেবে তার সাথে আলাদাভাবে পরম স্নেহে কথা বলতে হবে। কারণ এগুলো ট্রমা বা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার লক্ষণ হতে পারে।

অভিভাবক সমাবেশ

মা-বাবার সাথে মিটিংয়ের সময় তাদেরও অনুরোধ করা যেন তারা ঘরে শিশুদের সাথে প্রতিদিন খোলামেলা কথা বলেন এবং শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।

এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোনো দ্বিধা বা লজ্জা কাজ করতে দেওয়া যাবে না। একজন শিক্ষকের একটু সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা একটি কোমলমতি শিশুকে বড় কোনো বিপদ থেকে আজীবন সুরক্ষিত রাখতে পারে।

রোকেয়া সুলতানা : প্রধান শিক্ষক, হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চঁাদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক ২০২৬।

ছবি:

আমার ভালো লাগে

সাদিয়া মজুমদার

আমার ভালো লাগে

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে যেতে

নানা সুরে পাখিদের গান শুনতে

বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে

গ্রামের জনশূন্য পথে একা একা হঁাটতে।

আমার ভালো লাগে

বর্ষা এলে ফর্সা পানিতে গোসল করতে।

রোদেলা বিকেলে নৌকায় করে

বিলের জলে শাপলা তুলতে

ভিজতে ভালো লাগে আষাঢ়ের জুম বৃষ্টিতে।

আরো ভালো লাগে জোসনা রাতে

নৌকায় করে বেড়াতে যেতে

নৌকায় বসে পানির কল কল শব্দ শুনতে।

আমার ভালো লাগে দেখতে

বাতাস যখন ঢেউ তুলে আমন ধানের ক্ষেতে

আমার ভালো লাগে-যখন মৃদু বাতাসে

নানা গাছের পাতা থেকে নানান সুর ভেসে আসে

ভালো লাগে দলবেঁধে খেলতে যেতে।

নির্জনে বসে রাতের তারা ভরা আকাশ দেখতে।

সন্ধ্যার আড্ডায় রূপকথার গল্প শুনতে।

আমার ভালো লাগে ছোট বেলার খেলার সাথীদের নিয়ে আড্ডা দিতে, স্কুলের মাঠে খেলতে।

ছবি-

আপনি আমার এক কাঠগোলাপী প্রেয়সী

ইসরাত জাহান তন্নি

আমি তো লেখালেখির সূচিটা কীভাবে করবো সেটাও ভুলে গিয়েছিলাম!

এক গভীর বাস ভবনে নিজের রাজত্ব ও শুরু করেছিলাম!

চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু সবুজ বনলতার খুন শুঁটি দেখতাম!

যেনো কোন দিন আমি কবিত্বময় জীবন বহন করিনি সেই পথে হঁাটা শুরু করেছিলাম!

কিন্তু না এ ঘোর আমার শতভাগের হলেও মনের কোথায় যেনো আপনি রয়েই গিয়েছিলেন!

তাইতো নির্বাসনে অবস্থান করেও আপনার ছবি পূর্নিমার আলোর মতো চকচক করে উঠল আমার মনের আঙ্গিনায়!

আমি যেনো প্রান ফিরে পেলাম!

আবার কড়া নাড়লো আমার ঘরে শব্দেরা!

আমি ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হলাম!

আপনি নামক কাঠগোলাপীর রূপে মগ্ন হয়ে ফিরে এলাম কবিতার শহরে!

আপনার নাম নিতেই হৃদপিণ্ড পরিমিত ভাবে চলা শুরু করলো!

আমার সকল অমাবস্যা কেটে গেলো!

আমি সন্ধি করে নিলাম শব্দ চয়নের সাথে!

সেই থেকে বুঝে নিলাম প্রিয়দের কঁাচে বঁাধা থাকে সকল বসন্ত গুলো!

শুধু প্রকাশের স্বাধীনতা একেক সময় একেক রকমের হয়!

প্রিয় হৈমন্তী আমি হঠাৎই মায়ায় পড়ে ছিলাম আপনার!

শত আবেগের দূর্যোগ মোকাবেলা করে প্রেমের রাজত্ব ও গড়েছিলাম!

যা কাব্যের কাহিনিবিস্তারে সাক্ষরীত!

ম-ম রূপী সম্রাজ্ঞী ইন্দ্র রাণী মুহেবিয়া,

আপনার সিল্কি চুলের ভঁাজে এক গুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া গুঁজে দিতে চাই!

সোনালুর হলুদরঙের ফুলে কান জুড়ে ঝুমকোলতা একে দিতে চাই!

লাল রঙের সাজপোশাকে আপনার মুখ খানি আবার দেখতে চাই!

দেখে দেখে আবার ফিরতে চাই মায়ার মোহনজালে!

ফিরতে চাই আপনার শহরে!

যে শহরে আমি নীরবে নিভৃত ভাবে আমি আমার সেই প্রথম দেখার কাঠগোলাপীকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারবো!

উৎসর্গ : রাবেয়া আক্তার (মুক্তা)

০৭/০৬/২০২৬

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়