শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৫

বই আলোচনা

কালপুরুষের ঘুম: আগুন, ঘুম ও একাকিনী রাধা

শান্ত সূত্রধর
কালপুরুষের ঘুম: আগুন, ঘুম ও একাকিনী রাধা

‘কালান্তক অগ্নিতে পুড়ে শয়নমন্দির

অগ্নিতাপে পিতার স্বপ্ন গলে

মায়ের চোখে বিরজা নদী’

এই পঙ্ক্তিগুলো পাঠককে কোনো কবিতার ভেতরে নয়, সরাসরি সময়ের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করায়। ‘কালান্তক অগ্নি’ কবিতাটি ‘কালপুরুষের ঘুম’ কাব্যগ্রন্থের এমন এক আগুন, যার তাপে গোটা বইটি জ্বলতে থাকে-নীরবে, গভীরে। এখানে আগুন কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্র, লোভ, ক্ষমতা ও মানবিক অবক্ষয়ের দীর্ঘস্থায়ী দহন। শয়নমন্দির পুড়ে যায় মানে কেবল একটি ঘর নয়Ñপুড়ে যায় আশ্রয়ের ধারণা, উত্তরাধিকার, ভবিষ্যৎ।

সঞ্জয় দেওয়ানের এই গ্রন্থে ঘুম কোনো আরাম নয়। ঘুম এখানে ক্লান্তির নাম, বিস্মৃতির নাম, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নাম। শিরোনাম কবিতা ‘কালপুরুষের ঘুম’-এ কালপুরুষ যেন ইতিহাস বয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় থেমে যায়Ñ“কালপুরুষ ঘুমায় আজও, বসন্তের স্বপ্ন ভুলে”। এই ঘুম আসলে আমাদের সময়ের ঘুমÑযেখানে অন্যায় চোখের সামনে ঘটলেও আমরা নিদ্রিত।

রাধা, প্রেমের চেয়ে বড় এক অপেক্ষা: এই গ্রন্থের এক অনন্য দিক হলোÑএখানে প্রেম আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই। বিশেষ করে রাধাকে ঘিরে লেখা কবিতাগুলো গ্রন্থের আবেগগত ভিতকে আরও গভীর করে তোলে। “বসন্তের ভায়োলিন” কবিতায়Ñ“অশোকবনে কুহুতানে ঘর ছাড়ে একাকিনী রাধা”। এই রাধা কোনো পৌরাণিক প্রেমিকার পুনরাবৃত্তি নন। তিনি একাকিত্বের প্রতীক, অপেক্ষার প্রতিমূর্তি। কৃষ্ণের অনুপস্থিতি এখানে সবচেয়ে প্রবল উপস্থিতি। বসন্ত আসে, সুর বাজে, তবু রাধার একাকিত্ব কাটে না। প্রেম এখানে পূর্ণতা নয়-বরং দীর্ঘ প্রশ্ন। এই রাধা আবার ফিরে আসেনÑ‘কালান্তক অগ্নি’ কবিতার শেষেÑ‘শ্যামশরীরে বিরহতাপ, রাধা কি সব খবর রাখে?’ এই প্রশ্ন অলংকার নয়; এটি এক তীব্র নৈতিক প্রশ্ন। আগুন যখন নগর পোড়ায়, শিশুর কান্না যখন আকাশে ওঠে-তখন প্রেম কি নির্বিকার থাকতে পারে?

পুরাণ, শরীর ও সহিংসতার ভাষা: ‘দ্রৌপদীর শাপ’ কবিতায় সঞ্জয় দেওয়ান পুরাণকে ব্যবহার করেন সমকালের নিষ্ঠুরতা উন্মোচনের জন্য। নারীদেহ এখানে যুদ্ধক্ষেত্রÑ‘মুঠোবন্দি হয় স্তনফুল, দ্রৌপদীর শাপে চন্দ্রগ্রহণ কুরুক্ষেত্রে’

দ্রৌপদী এখানে কেবল মহাভারতের চরিত্র নন; তিনি আজকের প্রতিটি নির্যাতিত নারীর প্রতীক। কবি দেখান-যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু লাঞ্ছনা শেষ হয় না।

নাট্যশালা ও দর্শকের মুখোশ: ‘কুররী পাখির আর্তনাদ’ কবিতায় রাষ্ট্র ও ক্ষমতা যেন এক নাট্যশালা। দর্শক হাসে, কাঁদে, হাততালি দেয়-এমনকি ফাঁসির দৃশ্যেও। নাটক শেষে সবাই ঘরে ফেরে, কিন্তু ইতিহাস থেকে যায়। ‘কুররী পাখির আর্তনাদ’ আসলে বিবেকের কান্নাÑযা আমরা শুনি, কিন্তু শুনেও উপেক্ষা করি।

উদ্বাস্তু মানুষ, উদ্বাস্তু মন: গ্রন্থের শেষ প্রান্তে থাকা ‘শরণার্থী’ কবিতাটি নিঃশব্দে পাঠককে ভেঙে দেয়। দেশ, শিকড় ও স্মৃতি নিয়ে কবির প্রশ্নÑ‘দেশ কি মনে রাখে ছিন্নমূল মানুষের কথা?’ এখানে শরণার্থী শুধু সীমান্ত পেরোনো মানুষ নয়Ñসে আমাদের সবার ভেতরের ভ্রাম্যমাণ সত্তা।

‘কালপুরুষের ঘুম’ কোনো সহজ পাঠ নয়। প্রতীক ও বিমূর্ততার ঘনত্ব পাঠকের ধৈর্য দাবি করে। কিছু কবিতায় বিষণ্নতা ও আগুনের পুনরাবৃত্তি দীর্ঘ পাঠে ভারী লাগে। তবু এই ভারই গ্রন্থের শক্তি। কারণ এই কবিতা পাঠককে আরাম দিতে চায় নাÑবরং তাকে দায়ী করে। ‘জলের ক্যালিগ্রাফি’ থেকে ‘কালপুরুষের ঘুম’Ñএই যাত্রায় সঞ্জয় দেওয়ান স্পষ্টতই হয়তো আরও সংযত, আরও রাজনৈতিক, আরও দর্শনমনস্ক কবি হয়ে উঠেছেন।

সমকালীন বাংলা কবিতায় ‘কালপুরুষের ঘুম’ এমন এক গ্রন্থ, যেখানে আগুন জ্বলে, রাধা অপেক্ষা করে, আর কালপুরুষ ঘুমিয়েও আমাদের ঘুম ভাঙাতে চায়।

গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।

প্রকাশক: সময় প্রকাশন ।

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

মূল্য ২০০ টাকা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়