প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫৪
আম্মু আসলে কার

তালহা আর নুসায়েরÑদুজন আপন ভাই। তালহা ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে, আর নুসায়ের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে, নরম শান্ত স্বভাবের ছেলে। দুজনের মাঝে ভালোবাসা থাকলেও, অজান্তেই কিছু ছোট ছোট ব্যাপার নুসায়েরের মনে কষ্ট জমিয়ে আছে।
সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে নুসায়েরের শরীরটা খুব খারাপ লাগছিল। মাথা গরম, চোখ লাল, শরীর জ্বরে কঁাপছে। ব্যাগটা এক কোণে ছুড়ে দিয়ে সে চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে এক ক্লান্তি আর অভিমান জমে আছে।
পাশের বিল্ডিং থেকে সামিনের আম্মু দেখতে এলেন। বাসায় ঢুকেই তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন,
Ñ“তালহার আম্মু, বাসায় আছেন?”
নুসায়ের বিছানায় শুয়ে ছিল। সে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি, মুখে গাম্ভীর্য। সামিনের আম্মু কাছে এসে নরম গলায় বললেন,
Ñ“কি বাবা, শরীর খারাপ? জ্বর এসেছে?”
Ñ“ওষুধ খেয়েছো?”
Ñ“স্কুলে কি হয়েছে?”
কিন্তু নুসায়ের একটাও প্রশ্নের উত্তর দিল না। শুধু তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যেন তার ভেতরে কিছু একটা গুমরে উঠছে, কষ্টে তা বলতে পারতেছে না , প্রকাশ করতে পারছে না।
কিছুক্ষণ পর সামিনের আম্মু চলে গেলেন। ঘরে নীরবতা নেমে এল।
নুসায়েরের আম্মু ছেলের পাশে এসে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে মায়া ভরা কণ্ঠে বললেন,
Ñ“বাবা, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?”
নুসায়ের মাথা নাড়ল,
Ñ“না, আম্মু।”
Ñ“তাহলে তুমি সামিনের আম্মুর কোন কথার জবাব দিলে না কেন? উনি তো তোমাকে খারাপ ভাববেন।”
নুসায়ের কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ করেই বলল,
Ñ“আগে বলো, তুমি কার আম্মু?”
প্রশ্নটা শুনে নুসায়ের আম্মু একটু থমকে গেলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন,
Ñ“আমি তো তোমার আম্মু, বাবা।”
নুসায়ের আবার জিজ্ঞাসা করল,
Ñ“তাহলে সবাই তোমাকে ‘তালহার আম্মু’ বলে ডাকে কেন? তুমি কি শুধু ভাইয়ার আম্মু? আমি কি তোমার ছেলে না?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখে পানি এসে গেল। এতদিনের জমে থাকা ছোট্ট অভিমান যেন একসাথে বেরিয়ে এল।
মায়ের হৃদয়টা কেঁপে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই ছোট্ট ছেলেটার মনে কত বড় কষ্ট জমে আছে। তিনি নুসায়েরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
Ñ“না বাবা, তুমি আর তালহাÑদুজনেই আমার সমান। আমি তোমাদের দুজনেরই আম্মু। কেউ যদি শুধু তালহার আম্মু বলে, সেটা তাদের দোষ, কিন্তু আমার কাছে তোমরা দুজনই এক।”
সেদিন রাতেই তিনি একটা ছোট্ট কাজ করলেন। বাসার দরজার সামনে একটা কাগজে বড় করে লিখে টাঙিয়ে দিলেনÑ
“আমি নুসায়ের ও তালহার আম্মু।”
পরদিন থেকে কেউ বাসায় এলে তিনি হাসিমুখে বলতেন,
Ñ“আমি কিন্তু দুইজনেরই আম্মুÑতালহা আর নুসায়ের।”
নুসায়ের দূর থেকে শুনত আর মুচকি হাসত। তার ছোট্ট মনটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে গেল।
জ্বরও কয়েকদিনের মধ্যে সেরে উঠল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপারÑতার মনের অভিমানটাও সেদিনই সেরে গিয়েছিল।







