বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৭

নির্বাচনে বামপন্থীরা অপ্রাসঙ্গিক নয়, পরিস্থিতির শিকার

জাহাঙ্গীর হোসেন
নির্বাচনে বামপন্থীরা অপ্রাসঙ্গিক নয়, পরিস্থিতির শিকার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন এটি। নির্বাচনটিই ছিলো অভ্যুত্থান-পরবর্তী মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এবারের নির্বাচনের পর আলোচনায় স্থান নিয়েছে বামপন্থীরা। যদিও নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্ব মুহূর্তে বামপন্থীদের নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ভোটারদের মাঝে উল্লেখ করার মতো আকর্ষণ ছিলো না। কিন্তু নির্বাচনে অল্প সংখ্যক ভোট পেয়ে বেশ আলোচনায় বামপন্থী প্রার্থীরা।

জনমনে প্রশ্ন, বামপন্থীদের ভোটের মাত্রা ক্রমাবনতি কেন? বামপন্থীরা কি জনবিচ্ছিন্ন?

আবার কেউ কেউ আলোচনায় এনেছেন, দেশের সংকটময় মুহূর্তে অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে হলেও রাজপথে সরব, তাহলে ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থীরা কেন পিছিয়ে? ভোটের রাজনীতিতে বামপন্থীরা কি অপ্রাসঙ্গিক? এ ক্ষেত্রে অনেক বিশ্লেষক ও ভোটাররা ভোটারদের আদর্শমান, নীতি-নৈতিকতা নিয়ে ঢের প্রশ্ন তুলছেন। বামপন্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় ভোটাররা নীতিবিবর্জিত কাজ করছেন বলে বিশ্লেষক মহল তীর্যক সমালোচনা করছেন। বিশ্লেষক তথা পর্যবেক্ষক মহল পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, এবারের ভোট ন্যূনতম ১০০/৩০০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। আবার অনিচ্ছাকৃত সত্ত্বেও প্রার্থীদের দায়িত্বশীল নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে ভোটাররা ভয়ে উৎকোচ নিতে বাধ্য হয়েছে। পরে উৎকোচ গ্রহণকারী অনেকেই মানসিকভাবে দায়বদ্ধতায় আটকে গেছে।

যাই হোক, এবার অনেকেরই ধারণা ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বামপন্থীরা ভালো ফলাফল করবে। কোন কোন প্রার্থী বিজয়ী হয়ে চমক দেখাবে। এর কারণ হিসেবে দেখেছেন, বামপন্থীরা দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে রাজপথে সাধ্যমত থাকে। দেশকে প্রগতির ধারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভিশন বাস্তবায়নে বামপন্থীরাই প্রধান ভূমিকা পালনকারীÑএটা পর্যবেক্ষক মহলে পরিষ্কার। বামপন্থী প্রার্থীরা ত্যাগী, সৎ, আদর্শবান। মূলধারার বামপন্থীরা (বাম গণতান্ত্রিক জোট) ভণ্ড এবং প্রতারক নন। বাম গণতান্ত্রিক জোটের বিগত ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই-সংগ্রাম জনগণের কাছে পরীক্ষিত। সে কারণে সংসদে ১০/১২ জন চলে আসার সম্ভাবনা দেখেছিলেন সাধারণ মানুষ। তাতে করে নির্বাচনোত্তর সংসদে ভারসাম্য বিরাজ করবে। এমন পরিবেশ বিরাজ করলেও শেষতক তা হয়ে ওঠেনি। তার জন্য প্রধান দুটি কারণ আমার পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। প্রথমোক্ত: এবারের নির্বাচনে লড়ে যাবার মতো বামপন্থীরা বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে পর্যাপ্তভাবে হাজির হননি।

আর শেষোক্ত : বামপন্থীদের ভালো সংখ্যক ভোট পাওয়ার অবস্হা তৈরি হয়েও হয়নি। কারণ, আচমকা উদ্ভূত পরিস্থিতির শিকার। যা সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর বুর্জোয়াদের ভিতরগত ছক।

এখন আমি শেষোক্ত কারণ নিয়েই আলোচনা করবো। এবারের নির্বাচনে চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর-হাইমচর) আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে মার্কার হয়ে লড়েছি। এতে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থনও ছিলো। নির্বাচনে ভোট চাইতে গণসংযোগকালে আওয়ামী সমর্থিত ভোটাররা অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যাবেন নাÑএমনটি চাউর হয়েছিল। এমনকি বিএনপির উদারমনা সমর্থকদেরও ভোট প্রদানে অনীহা ছিল। পরে গণভোটের প্রশ্নে আওয়ামী সমর্থিত অনেক ভোটার ভোট প্রদানে কেন্দ্রে যাবেন মর্মে মানসিক প্রস্তুতি নেন। এখানে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র বিষয়টি আওয়ামী ভোটারদের মধ্যে যারা সচেতন তাদের কাছে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। আবার ভোট কেন্দ্রে না গেলে পরবর্তী সরকারের কাছে চিহ্নিত হয়ে যাবার মবোক্রেসি ভয়ও কাজ করছিলো অনেকের মাঝে। ফলে ভোটারের উপস্থিতি যে অন্তত ৫০ শতাংশ অতিক্রম করবে তা অনুমেয় ছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছিলো আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ হতে থাকলো বাড়ন্ত গতিতে। জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় চলে আসবে কিংবা এদেরকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে আসবেÑএ ধরনের ছক করা আছে বলে বেশ আলোচনা চলছিলো। জামাত ক্ষমতায় আসলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্টাংশই চিরতরে নিশ্চিহ্ন হবেÑএমনটি আখ্যান খুব জোরেসোরে চলছিলো। ফলে আওয়ামী সমর্থক, উদারপন্থী প্রগতিশীল ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মনস্তত্ত্বে ঐকমত্য সংগঠন গড়ে তোলেন। ফলে এদের ভোটগুলো একচেটিয়া ধানের শীষ ও তাদের এলাইন্সের প্রার্থীরা পেয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার ইস্যুতে বামপন্থী প্রার্থীদের গতিমুখে আর যাননি। ‘জামাত জোট ঠেকাও’ স্লোগান অবধারিতভাবে চলে আসে। ফলে বামপন্থার অনেক সম্ভাবনাময়ী প্রার্থীও ভোট অনেক কম পেয়েছেন। এবং এ ভোটের সংখ্যা খুবই হতাশাজনক। আমার নির্বাচনী এলাকার ভোটাররাও আমার ভোটের পরিমাণে কষ্ট পেয়েছেন। আরও কয়েকগুণ ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন।

আর এদিকে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদ’ উত্থান হবে এ প্রচারে বিএনপিতে অবস্থান করা ধর্মান্ধ ও উগ্র মনোভাবাপন্ন ভোটাররা জামাত এলাইন্সে ঘুরে দাঁড়ান এবং বিএনপিতে থাকা সচেতন কিছু ভোটার বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের আচরণে অতীষ্ঠ হওয়াটাও ভোট ডিপ্রাইভ করার অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে তড়িৎ গতিতে পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি আলাদাভাবে একাত্ন হয়। ফলে বামপন্থীরা এ হাইপের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। এর বিপরীতে বামপন্থীরা নিজেদেরকে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতি রক্ষার’ একমাত্র আশ্রয়স্থল কিংবা আস্হার জায়গা হিসেবে আবির্ভূত করতে না পারায় অতি সম্ভাবনাময়ী ভোটগুলোও তাদের পক্ষে আনা সম্ভব হয়নি। কারণ, নির্বাচনে এ ভোট আলোচনার ভিতর দিয়ে পক্ষে আনার মতো পর্যাপ্ত কর্মীবাহিনীও ছিলো না। তবে মানুষ এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ঠিক, কিন্তু ফিরে গেছে। তবে আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আগামীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উদ্ধারে বুর্জোয়াদের তকমা এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী উগ্র ডানপন্থী কিংবা মধ্য ডানপন্থীদের ধর্ম ব্যবসা আর বেশি দিন টিকবে না। এবার হয়তো জনগণ শেষবারের মতো সুযোগ করে দিয়েছে। ভাওতাবাজি আগামীতে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসবে।

এবার প্রথম কারণ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদ একটি চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়। এ অধ্যায়কে সামাল দিতে বামপন্থীদের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা আসনগুলোও প্রস্তুত নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সীমানা বড়, ভোটারও বেশি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যেতে পর্যাপ্ত প্রচারণা, সভা-সমাবেশের প্রয়োজন হয়। নিয়মিত অসংখ্য ছোট ছোট টিমে গণসংযোগে যেতে হয়। সেটা হয়নি। বাম গণতান্ত্রিক জোট এবারের নির্বাচনে আট-সাঁট বেধে নামার পদক্ষেপ ছিলো না। নির্বাচন তপশিলের পরও নতন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে অতিমাত্রায় মনোনিবেশ করার কারণে দলগুলোর মূল নেতৃত্ব নির্বাচনে নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন না। ফলত: দলগুলোর হেভিওয়েট নেতারাও নগন্য ভোট পান। নির্বাচনের চেয়ে নতুন করে জোট গঠনে একাত্ন হওয়ায় ভোটের দুর্গতি। নির্বাচনকালে জনজীবনের সংকট মোকাবেলায় লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় সময় দিতে পারেন নি বড় বড় নেতারা।

আর এদিকে মিডিয়া এবং প্রতিপক্ষের র‌্যাগিং মোকাবেলা করতে পর্যাপ্ত কর্মীবাহিনী থাকতে হয়। দলের কাঠামোতে অবস্থান করা নেতা-কর্মীকে আরও নিবেদিত, দায়িত্বশীল ও আন্তরিক হবার ঘাটতিও মূল কারণগুলোর একটি। তার সাথে রয়েছে কিছু কর্মীর সংকীর্ণতা ও হীনমন্যতা এবং দৃঢ় মনোবল না থাকাটাও আরেকটি কারণ।

প্রতিটি আসনেই লক্ষ্য করা গেছে যে, বুর্জোয়া দলগুলোর প্রার্থীর পেছনে মিডিয়ার ছুটাছুটি। বামপন্থী প্রার্থীরা বিত্তহীন কিংবা মিডিয়াকে টাকা না দেয়ায় তারা যথাযোগ্যভাবে নিউজ কভারেজ দেননি। এমনকি উপস্থিত জনতার সামনেও তারা বামপন্থী প্রার্থীকে উপেক্ষা করে বিত্তবান প্রার্থীদের পেছনে ছুটেছেন। এমন অবস্থা দৃষ্ট হয় যেন, বুর্জোয়া প্রার্থীর জন্য লাইলি-মজনু কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের মতো অপার প্রেম- ভালোবাসা! বামপন্থী প্রার্থীদেরকে জনসম্মুখে উপেক্ষা করা কিংবা গুরুত্ব কম দেয়াটাও এক ধরনের র‌্যাগিং প্রার্থীদের সাথে এমন বৈরী আচরণও ভোট কম পাওয়ার আর একটা কারণ।

অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে বামপন্থীরা অপ্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোতে ভোটাররা প্রার্থীর কর্মী হবার ক্ষেত্রে ও ভোট দিতে অর্থের বিনিময়ে মুখিয়ে থাকেন এমন অসদুপায় অবলম্বন নিশ্চয়ই বামপন্থীরা করবে না। কারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি আদর্শ বিবর্জিত হয়, তাহলে বামপন্থী প্রার্থীরাও মোটেও এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। যার কারণে বামপন্থীদের সশস্ত্র বিপ্লবই প্রধান পথ হতে পারে। কিন্তু বাহুল্য মোটেই নয় যে, মানুষ যতদিন নীতিনিষ্ঠ না হবে যতই বিপ্লব কিংবা অভ্যুত্থানই হোক না কেন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তাই হতাশায় নিমজ্জমান না হয়ে সাধারণ মানুষের বৃহৎ একটি অংশকে রাজনৈতিক জ্ঞান শক্তি বাড়াতে সাংগঠনিক কাজকে ত্বরান্বিত করতে হবে। তবেই রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভালো একটি সমাধান মিলবে। শেষপর্যন্ত মানুষের জনজীবনের সংকটময় মুহূর্তে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের যথাযথ মাধ্যম বামপন্থীরাই। আর কাউকেই পাওয়া যায় না।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উপর হামলার প্রতিবাদ ও দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলনে বামপন্থীরাই শ্রেষ্ঠ, বামপন্থীরাই উৎকৃষ্ট। এ নিবন্ধের শেষান্তে শিল্পী নচিকেতার একটি গানের লাইন টেনে শেষ করছি ‘বসতি আবার উঠবে জেগে, আকাশ আলোয় উঠবে ভরে। জীর্ণ মতবাদ সব ইতিহাস হবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে।’

জাহাঙ্গীর হোসেন : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, চাঁদপুর জেলা কমিটি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়