প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৫
সাক্ষাৎকার : তৌহিদুল আলম
শিক্ষার্থীদেরকে মানবিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই

মতলব সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। শিক্ষকতা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের সাথে কথা বলেন।
চাঁদপুর কণ্ঠ : একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী?
তৌহিদুল আলম : একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদেরকে আগ্রহী করে তোলা, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে গড়ে তোলা। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদেরকে মানবিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলা।
চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনার প্রিয় শিক্ষক কে? কেন প্রিয়?
তৌহিদুল আলম : প্রিয় শিক্ষকের নাম বলতে গেলে প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অনেক শিক্ষকদের নাম বলতে হয়। আমি ওনাদের সবার কাছে ঋণী। তবে কিছু নাম না বললেই নয়, যেমন : প্রাথমিক পর্যায়ে আমার বাবা জনাব রমিজ উদ্দিন মাস্টার, এরপর আমাদের সবার প্রিয় জনাব মোবারক হোসেন স্যার, মাধ্যমিক পর্যায়ে সদ্য প্রয়াত জনাব আবুল হোসেন খন্দকার, মরহুম আব্দুল মান্নান ও জনাব হাবিবুর রহমান স্যারের কথা খুব মনে পড়ে। কলেজ পর্যায়ে চাঁদপুর কলেজের ইংরেজি বিভাগের মরহুম ওয়ালিউল্লাহ স্যার, খোরশেদুল ইসলাম স্যার, বাংলা বিভাগের মরহুম খলিলুর রহমান স্যার, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মরহুম আলী আজগর স্যার, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মরহুম ইউনুছ স্যার আমার ভীষণ প্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের আমার থিসিস গাইড প্রফেসর এবিএম এনায়েত হোসেন, প্রফেসর জাহেদ উদ্দিন মাহমুদ খান, প্রফেসর আবুল খায়ের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মরহুম নূরুল ইসলাম, মরহুম হাদিউজ্জামান, মরহুম সালার খানসহ অনেকে আমার প্রিয় শিক্ষক। ওনাদের জ্ঞানের গভীরতা, বাচনভঙ্গি আর বিষয়ভিত্তিক চমৎকার উপস্থাপনা আর সহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে আমার খুবই প্রিয় শিক্ষক।
চাঁদপুর কণ্ঠ : শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ ও মনোযোগ বাড়াতে শিক্ষকদের কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত?
তৌহিদুল আলম : একাডেমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমে যে বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত সেটি হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর শিক্ষকদের প্রচুর পড়াশোনা করা, জানাশোনার পরিধি থাকতে হবে অনেক। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বিভিন্ন জার্নাল, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এসব থেকে নির্যাস নিয়ে চুম্বক অংশটুকু শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থাপন করতে পারলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী হয়। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলে শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হয়। তাছাড়া শিক্ষক শিক্ষার্থী শ্রদ্ধা মেশানো ভালোবাসা, তাদের সাথে ভীতিহীন ব্যক্তিগত যোগাযোগ পড়াশোনাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : মতলব সরকারি কলেজের ফলাফল ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে কিছু বলুন।
তৌহিদুল আলম : মতলব কলেজ ১৯৬৪ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ। বরেণ্য শিক্ষাবিদ মরহুম য়ালিউল্লাহ পাটোয়ারী, দেওয়ান মোহাম্মদ জাফর, মরহুম এ বি খানসহ অনেক প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্ম হয়েছে জাতীয় জীবনে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং সে ধারা আজ ও বহমান।
কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখার জন্য এখানে আলাদাভাবে “আলোকরশ্মি” নামে আলাদা একটি সংগঠন আছে। শুদ্ধধারার সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রতিভা বিকাশে এ সংগঠনের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। সংগীত চর্চা, আবৃত্তি, শানিত বিতার্কিক তৈরি করা, শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত চর্চা সর্বোপরি জীবনঘনিষ্ঠ ও মানবিক সংগঠন হিসেবে এর অবদান অনস্বীকার্য। তাছাড়া নিয়মিত ম্যাগাজিন প্রকাশ, শিক্ষাসফর, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন, যথাযথ মর্যাদায় ধর্মীয় দিবস উদ্যাপন, আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ, বিএনসিসির সুশৃঙ্খল উপস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, সুবিশাল শহীদ মিনার চত্বর, নান্দনিক খেলার মাঠ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নিয়মিত খেলাধূলার চর্চা কলেজের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিচয় বহন করে। নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এসব কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ সাহেবের মেধা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
চাঁদপুর কণ্ঠ : একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য কোন গুণগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
তৌহিদুল আলম : শিক্ষকতা পেশা অন্যান্য পেশার চেয়ে একটু আলাদা। এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যক্তি সততা, নিজের কাছে নিজেকে সৎ রাখা। সবসময় পড়াশোনার চর্চার মধ্যে থাকতে হয়। কেননা সুশিক্ষক মানে আজীবন ছাত্র। শিক্ষার্থীদেরকে একাডেমিক ক্ষেত্রে সৎ রাখার অনুশীলন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সৎ ক্ষেত্রে ধাবিত করতে হয়। নিজের সক্ষমতা, সৎ সাহস আর বিশ্বাসের উপর আস্থা থাকাটা জরুরি। স্থূল চাটুকারিতা, অসহনীয় লেজুড়বৃত্তি একেবারেই কাম্য নয়।
চাঁদপুর কণ্ঠ : প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?
তৌহিদুল আলম : প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে অবশ্যই ইতিবাচক প্রভাব রাখে। তবে সেটি যেন নেতিবাচক দিকে না যায় সেদিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একই বিষয়ের একাধিক স্বনামধন্য শিক্ষকের লেকচার শুনতে পারে, ভুলে গেলে বার বার শুনতে পারে। ফলে পড়াশোনা আত্মস্থ করতে অনেক সুবিধা হয়। তাছাড়া বর্তমান প্রযুক্তি অগাধ জ্ঞানের ভাণ্ডার। এখানে থেকে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু জানতে পারে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের করণীয় কী হওয়া উচিত?
তৌহিদুল আলম : ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার আগে শিক্ষকদেরকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে, শিক্ষকদের সম্মানজনক আর্থিক নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কোন ভারী বস্তুকে উপরে উঠাতে হলে উপর থেকে যেমন টানতে হয় আবার নিচের দিক থেকেও ধাক্কা দিতে হয় তবেই সুফল পাওয়া যায়। মানবিক প্রজন্ম গড়তে কেবল শিক্ষকদেরকে একা দায়িত্ব দিলেই হবে না, প্রত্যেক অভিভাবকদেরকে সচেতন হতে হবে, প্রতিটি বাবা-মাকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। কেননা শিশুরা মানবিক দিকগুলো নিজের পরিবার থেকেই সর্বপ্রথম শেখে। দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দরকার আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ আর প্রশিক্ষিত শিক্ষকদেরকে নিজের শেখা বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়।
চাঁদপুর কণ্ঠ : পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদের ভূমিকা আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
তৌহিদুল আলম : পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদেরকে পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন আগ্রাসী বৃক্ষ পরিহার করতে হবে। নতুন চরাঞ্চল ও পতিত জমিতে বৃক্ষরোপণ করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে।
চাঁদপুর কণ্ঠ : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণে আমাদের কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত?
তৌহিদুল আলম : দেখুন জলবায়ু পরিবর্তন এখন কোন একক দেশের সমস্যা নয়। এ এক বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত বিশ্ব সমস্যা সৃষ্টি করে আর ভোগান্তির শিকার হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো। তবে আমাদের সমস্যার জন্য আমরাও কম দায়ী নই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট ভূমির ২৫% বনভূমি থাকা দরকার। আমাদের সর্বসাকুল্যে আছে ১০-১২%, তারপর আবার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলি ১৭-১৮%। সেটি কি যথেষ্ট? মোটেও নয়। আমরা যথেষ্ট পরিমানে বন সৃজন করছি না আবার সংরক্ষিত বনাঞ্চল জবরদখল ও উজাড় করে ফেলছি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের ফলদ, বনজ, ঔষধি, আর কাঠ প্রদানকারী বৃক্ষ রোপণ করতে হবে আবার সেগুলোর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিচর্যা করে যেতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নরোধ, নির্মল বায়ুর সহজলভ্যতা, সুস্বাস্থ্য রক্ষা আর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিকল্প নেই। এগ্রো ফরেস্টি, সোশ্যাল ফরেস্টি, হোমস্টীড ফরেস্টির মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। আশার কথা হলো, সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই আমরা এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবো বলে মনে করি।








