মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৪

কারিকুলামই কি আমাদের সমস্যা?

মাছুম বিল্লাহ
কারিকুলামই কি আমাদের সমস্যা?

শিক্ষায় হাজারো সমস্যার মধ্যে আমাদের মূল সমস্যাগুলোতে হাত দিতে হবে। এক বিরাট অংশের শিক্ষার্থীরা নিজ ক্লাসের বাংলায় লেখা বইগুলো দেখে বাংলা পড়তে পারে না, আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীরা নিজ শ্রেণির ইংরেজি দেখে পড়তে পারে না। এই চিত্র শুধু গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নয়, ঢাকা শহরেও। বছর খানেক আগে সহকর্মী গৌতম রায়, জানাশোনা ইংরেজির শিক্ষক, বহু বছর এনসিটিবিতে কর্মরত ছিলেন। চাকুরির শেষের দিকে যখন কবি নজরুল কলেজে বদলি হলেন। একদিন ক্লাসে গিয়ে দু’একজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজি বই পড়তে বললেন। উনি দেখলেন যে, তারা বই দেখে পড়তে পারছে না। উনি বহু বছর পর শিক্ষকতায় গিয়ে অবাক হয়েছিলেন। এটি ঢাকার একটি সরকারি কলেজের চিত্র। আমি ঢাকার আরও কিছু স্কুল ও কলেজের চিত্র সম্পর্কে জেনেছি এবং দেখেছি শিক্ষার্থীদের একই অবস্থা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আরও করুণ অবস্থা!

শিক্ষার্থীরা বই দেখে কেনো পড়তে পারে না? তাদের পড়ার অভ্যেস নেই, পড়ার প্রয়োজনও হয়না, কোনোদিক থেকে পড়ার তাগিদও আসে না, না বাসায় , না শ্রেণিকক্ষে না কোচিং সেন্টারে। তাদের পড়ার দরকারই হয় না। নামী-দামী সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি থাকে বলে শিক্ষক কখনও কেউ বই পড়তে পারে কিনা তা দেখার সময় পাননা, ডিসিপ্লিন রক্ষা, রোল কল করা আর কিছু পড়ানো বা বুঝানো আর তার ফাঁকে ফাঁকে ‘শাউট’ করে শিক্ষার্থীদের থামতে বলার মধ্যেই ক্লাস শেষ। কে কি বুঝলো সেটি শিক্ষকের দেখার সময় ও সুযোগ হয় না বাস্তব কারণে, এ ঘটনা অধিকাংশ নামী-দামী প্রতিষ্ঠানে ঘটে থাকে।

একজন শিক্ষার্থী যদি বই ভালভাবে পড়তেই না পারে তাহলে সে কিভাবে ভেতরের মেসেজ বুঝবে। প্রতিটি বিষয়ের তথ্য ও ধারণা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য উৎস থেকে আহরণ করতে হয় কিন্তু তাদের পড়ার আগ্রহ ও তাগিদ না থাকায় তারা তা করে না। তাদের কি অ্যাসেস করবো?

আমাদের চিন্তা, গবেষণা আর আলোচনার বিশাল অংশ জুড়ে থাকে অ্যাসেসমেন্ট! কিন্তু অ্যাসেসটা করবো কি? বিষয় যাই হোক খাতা না দেখে, না পড়ে নম্বর দেয়ার ট্রাডিশন শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। কারণ খাতা পড়লে বা শিক্ষার্থীরা কি লিখেছে তা পড়লে পাসের হার বিশের নীচে চলে আসবে। সেই চিত্র সংশ্লিষ্ট কেউ দেখতে চায় না বলে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য, সহানুভূতির সাথে খাতা দেখে ‘খয়রাতির’ পাস করাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এ কারণে শিক্ষকরাও পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ না পড়ে তারা ক্লাস করাতে পারেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা বা জানার আগ্রহ হারিয়ে গেছে বহু আগে। এই সমস্যাগুলোতে হাত না দিয়ে আমরা সবাই কারিকুলামের দোষ দিই! কারিকুলাম কি করেছে। আমরা বহু অর্থ ও সময় ব্যয় করে কারিকুলাম তৈরি করি। কিন্তু কারিকুলাম থাকে কারিকুলামের জায়গায় আর শিক্ষার্থীরা থাকে তাদের জায়গায়। মাঝখানে বিশাল শূন্যতা। কে পুরণ করবে সেই গ্যাপ? গরিরের পুষ্টির জন্য যেমন সুষম খাবার দরকার। সেই সুষম খাবার এক এক অঞ্চলের মানুষের এক এক ধরনের। বাঙালীর সুষম খাদ্য হলো ভাত, মাছ, শাক সবজি। নরওয়ে শীত প্রধান দেশ, নেদারল্যান্ডস শীতপ্রধান দেশ উন্নত, সেখানাকর সুষম খাবার আমাদের রুচিতে ধরবে না, আমাদের শরীর ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাবেনা। পূর্ববতী সরকার ভিনদেশি সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের খাওয়াতে চেয়েছিলো কিন্তু সেটি কোনওভাবে এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য খাবার হবেনা এবং হয়নি।

তারা একটি সিটির সমস্ত দালান কোঠা ভেঙ্গে চুরমার করে সব পরিবর্তন করতে চেয়েছিলো। একটি বৃহৎ বিল্ডিং বানাতে হলেও কয়েক বছর লেগে যায়। সেই বিল্ডিং তৈরি করার সময় পাশে একটি টিনশেড দিয়ে অস্থায়ী বাসস্থান বানানো হয় যাতে মানুষ বিল্ডিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকতে পারে। পূর্ববর্তী সরকার সেটিও করতে পারেনি বরং পুরো শহরের সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার করে, শিক্ষকদের ক্লাস থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলো বৃহৎ কিছু করানোর জন্য। কিছুই হয়নি। শিক্ষকরা ক্লাসে না থাকলে শিক্ষার্থীরাও থাকবেনা। থাকেওনি। সবাইকে বের করে সব কিছু তছনছ করে সেই ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে থেকে শুরু করে বৃহৎ পরিবর্তনে বয়ান এবং ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সেই নিয়ে বিভিন্ন খেলায় মেতেছিল। ফলে না পড়া শিক্ষার্থীরা ঢোলের বারি শুনে বই পুস্তকের সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাদের কোন ধরনের পরীক্ষায় বসতে হবে না, তারা আনন্দের মাধ্যমে শিখবে! সেই আনন্দ করতে গিয়ে না পড়া শিক্ষার্থীরা এখন আর পড়তে পারে না। বোর্ড পরীক্ষায় খাতা দাগাদাগি করে এলেও পাস, বাংলা খাতায় কৃষিবিজ্ঞান লিখলেও পাস। অতএব তারা পড়বে কেনো? পরিবর্তন দরকার এসব ক্ষেত্রে।

কারিকুলামের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারিকুলাম যা আছে সেটি যদি শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পড়ানো যায় তাহলেই তারা অনেকদূর এগিয়ে যাবে। কারিকুলাম পরিবর্তনের নামে বছরের পর বছর সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এক সাসপেন্সের মধ্যে রেখে কোনো কুল কিনারা করা যায়না পরে। ভাল ভাল খাবারের উপাদান আনা হলে সে ধরনের পাচক না থাকলে কে রান্না করবে, আর কে সুস্বাদু খাবার তৈরি করবে? লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর জন্য কতজন উপযুক্ত শিক্ষক আছেন। এটি বাস্তবতা! এত বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীকে পড়ানোর জন্য এত সংখ্যক ভাল ও উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া যাবেনা , এটিই স্বাভাবিক, এটিই বাস্তবতা!

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা হয় কারণ শিক্ষকদের জবাবদিহিতা আছে এবং আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। তাই তারা একাডেমিকসহ সকল ধরনের কার্যাবলী সঠিকভাবে করার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে কিছু আছে বিশেষভাবে বিখ্যাত, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে আসতে হয়, লেখাপড়ার চাপ থাকে, দেখেশুনে ভাল শিক্ষক রাখার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পুরো দেশে হাতেগোনা কয়েকটি। তারাও সকল শিক্ষার্থীকে পড়া দেখতে বা ধরতে পারেনা। এসব কারণে যেসব শিক্ষার্থীকে পড়তে পারার কথা তারাও পারেনা। আর বাকি হাজার হাজার বিদ্যালয়ের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ঢাকাসহ নিজ শ্রেণির বই দেখে পড়তে পারে না। একইভাবে বাংলা ও ইংরেজি কোনটিই নিজেরা লিখতে পারেনা। ফলে এক বিরাট অঙ্কের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়তেই হয়, বাজারের নোট-গাইড পড়তেই হয়। তবে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেতন বেশি। কারণ ভাল শিক্ষক রাখার চেষ্টা, বিভিন্ন ধরনের জন্য একাডেমিক ও কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি করানো হয় নিয়মিত। সরকার একটি যুক্তিযুক্ত নিয়ম করে দিতে পারে কোনো প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ফি যাতে আদায় না করে। কিন্তু কোনো ধরনের ফি আদায় করা যাবেনা, পুনভর্তি ফি আদায় করা যাবেনা কথাগুলো খুব সাধারণ হয়ে যাচেছ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে তুলনা করলে হবেনা। সেখানে শিক্ষার্থী বেতন নেই বললেই চলে (বিশ/ত্রিশ টাকা)। ফলে তারা শুধুই প্রাইভেট পড়ে আর কোচিং-এ পড়ে। এখানকার শিক্ষকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো এত জবাবদিহিতাও নেই।

রমজানে এবার কথা ছিল অন্তত মার্চের ৫ তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম কম করে হলেও চলবে। কারণ শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০ দিন ক্লাস করার সুযোগ পায়। তা ঐ উন্নতমানের এবং চাপে রাখা প্রতিষ্ঠানগুলো মোটামুটি ভালভাবে করিয়ে থাকে। কিন্তু সরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ঐ ১২০দিন ক্লাসও ঠিকমতো করাতে পারেনা। ফলে শিক্ষার্থীরা দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের মতো সারাজীবনই একাডেমিক অপুষ্টিতে ভোগে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু বন্ধ হয়ে গেছে, প্রাইভেট পড়ানো শিক্ষকদের হয়েছে ’ পোয়াবারো’। শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই ৩৮ দিন বন্ধে তাদের বাচ্চাদের বসিয়ে রাখবেন না। তারা প্রাইভেট টিউটরদের কাছে পাঠাবেন আরও বেশি হারে, কোচিং সেন্টারগুলোতে পাঠাবেন। আর সবাই কিন্তু নোট ব্যবহার করেন, গাইড ব্যবহার করেন কারণ সেখানে বিস্তারিত সবকিছু দেয়া আছে। আমরা রাষ্ট্র থেকে প্রায়ই বলে থাকি কোচিং করানো যাবেনা, নোট-গাইড পড়া যাবেনা। কোচিং আর নোট গাইড় পড়ার বিষয়টি এখন সকল শিক্ষার্থীকে মধ্যে বিদ্যমান আমাদের সমস্যা কারিকুলাম নয়, প্রচলিত কারিকুলাম যেভাবে আছে তাই যদি অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা যেত তাহলে কোনো সমস্যা থাকতো না। আমরা মনে করি, কারিকুলাম পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন, ঠিকভাবে পাঠদান, মুল্যায়ন। খয়রাতির পাস না করানো শিক্ষার্থীরা যা উত্তর দিয়েছে সেই নম্বরই পাবে।

এমনটি নয় যে আমাদের কারিকুলামের উপর লিখিত পুস্তকাদি পড়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হতে পারবে না, ডাক্তার হতে পারবেন বা প্রকৌশলী হতে পারবে না, গবেষক হতে পারবে না, বিদেশে পড়াশোনা করতে পারবে না। যারা সিরিয়াস, যারা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে পড়ে এবং অভিভাবক একটু খোঁজখবর নেয় তারা এই কারিকুলাম পড়েই কিন্তু বিদেশে যাচ্ছে এবং গিয়েছে, বিদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে এবং সফলতার স্বাক্ষরও রাখছে। বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে ম্যাক্সিমাম নাম্বার অব শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যাতে এই বিষয়গুলো ঘটে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়