প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০১:০৩
১/১১-এর ভুক্তভোগী এক ছাত্রনেতার মানবেতর জীবনযাপন
চাঁদপুর-৩ আসনের এমপির সুদৃষ্টি কামনা

১/১১ ও নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চাঁদপুরের তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা নজরুল ইসলাম ফারুক। তাঁর ঘাম ঝরানো আন্দোলন-সংগ্রামে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। তাঁর আদর্শিক দল এখন ক্ষমতায়। কিন্তু তাঁর ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। ভাগ্যের চাকা যেনো থমকে আছে। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাঁকে। তৎকালীন সময়ের জাঁদরেল এই ছাত্রদল নেতা মাঠে সক্রিয় আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে তিনি বেকার জীবন পার করছেন। অথচ তার খোঁজ কেউ রাখছে না।
|আরো খবর
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নজরুল ইসলাম ফারুক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শাখার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী, জেলা ছাত্রদলের সাবেক কোষাধ্যক্ষ, ১৯৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চাঁদপুর শহরে গুলিতে নিহত শহীদ রাজুর অন্যতম সহযোগী ছিলেন। চাঁদপুর সদরের সাবেক সাংসদ প্রফেসর আব্দুল্লাহ, সাবেক সাংসদ এসএ সুলতান টিটু, সাবেক ছাত্রদল নেতা, বর্তমান শহর বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেন মাঝি, ছাত্রদলের সাবেক জেলা সভাপতি, বর্তমানে জেলা বিএনপি নেতা শরীফ মোহাম্মদ ইউনুছ, প্রয়াত এমপি জিএম ফজলুল হকের আস্থাভাজন তৎকালীন সময়ের এই ছাত্রনেতা সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের শাহতলী গ্রামের বনেদী মজুমদার পরিবারের সন্তান। নিজের পৈত্রিক সম্পত্তিটুকু আজ বেহাত থাকার কারণে বর্তমানে থাকছেন হাজীগঞ্জের টোরাগড় গ্রামের শ্বশুর বাড়িতে। হাজীগঞ্জ বাজারে স্ত্রীর ব্যবসা থাকার কারণে কোনোরকম ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছেন। একটা সময় রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক দিনকালের চাঁদপুর প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতেন।
নজরুল ইসলাম ফারুক বিএ (ফার্স্ট ক্লাস) ও এমএ পাস। হাজীগঞ্জ বাজারে নাবিলা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ছাত্রজীবনে রাজনীতি শুরু করেন ছাত্রদলের হাত ধরে। এই রাজনীতি করতে গিয়ে মামলা, হামলা আর পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যান।
নজরুল ইসলাম ফারুক চাঁদপুর পূর্বাঞ্চলীয় ছাত্রকল্যাণ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে সভাপতি পদে ছিলেন টানা ৩ বার, শাহতলী স্বজন সমাজকল্যাণ পরিষদের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও দপ্তর সম্পাদকের (১৯৮৭-২০০২খ্রি.) দায়িত্ব পালন করেন। চাঁদপুরস্থ কম্পন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাবেক সাহিত্য ও প্রচার সম্পাদক পদে ছিলেন দীর্ঘদিন। এছাড়া তিনি জেলা মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার জেলা কমিটির দপ্তর সম্পাদক পদে থেকে সামাজিক বহু কাজ করেছেন। সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন অ্যাড. আইয়ুব আলী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক কাজী শাহাদাত।
শ্রবণ প্রতিবন্ধী ফারুকের সাথে কথা হলে স্ত্রী ও কন্যার সহযোগিতায় তিনি জানান, ১৯৯০-এ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে চাঁদপুর শহরে চিত্রলেখার মোড়ে আমরা মিছিল বের করি। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি করে। এতে মিছিলে আমার পাশে থাকা রাজু গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হন। বর্তমানে বিএনপির জেলা নেতা শরীফ মোহাম্মদ ইউনুছকে চাঁদপুর শহরের ছায়াবাণী মোড়ে সন্ত্রাসীরা কোপানোর আগ পর্যন্ত আমি তাঁর সাথে রিক্সায় ছিলাম। তার ওপরে হামলার সময় আমি দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পাই। সর্বশেষ একটি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় আমার নামে ওয়ারেন্ট ছিলো, আমি জানতাম না। সেই মামলায় আমাকে ১/১১- এর সময় হাজীগঞ্জের শ্বশুরের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ। থানাতে নিয়ে ব্যাপক মারধর করার কারণে আমি শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হই, যে কারণে আমার শ্রবণশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সেই আটকে আমি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। কারাগারে আমার সাথে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি, সাবেক মেয়র শফিকুর রহমান ভূঁইয়া ভাইসহ কচুরার অনেক নেতা ছিলেন। শফিকুর রহমান ভূঁইয়া আমাকে বাইরে থেকে ঔষধপত্র এনে দিতেন, এমনকি তার জন্যে বাড়ি থেকে আনা খাবার আমাকে খাওয়াতেন।
সোনালী অতীতের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নজরুল ইসলাম ফারুক বলেন, ১৯৮৬ সালে শাহতলী রেল স্টেশনে মাসিক 'প্রয়াস' নামে একটি দেয়ালিকা সম্পাদনা করতাম। ১৯৮৭ সালে সাগরিকা ট্রেনটি শাহতলী স্টেশনে থামতো না। স্থানীয় সচেতন মহল আমাকে অহ্বায়ক করে একটি কমিটি করে। রেলের টিকেট ছাড়া কেউ যেনো গাড়িতে উঠতে না পারে আর ট্রেন যেনো শাহতলীতে থামে সেই ব্যবস্থা করায় পরের মাস হতে রেলের আয় দেখতে শুরু করে ট্রেনটি। ১৯৮৮ সালে চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন মিলনকে যখন সন্ত্রাসীরা মারাত্মক জখম করে পাট ক্ষেতে ফেলে রাখে, তখন আমি এবং আমার সহপাঠীরা মিলে তাকে উদ্ধার করে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করাই। ১৯৯১-৯২ সালের দিকে চাঁসক পূর্বাঞ্চলীয় ছাত্রকল্যাণ পরিষদের ব্যানারে জোরালো দাবি উঠে, কলেজ বাস চালু করতে হবে ও চাঁদপুর সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর করতে হবে। যার নেতৃত্বে আমি মুখ্য ভূমিকা পালন করাতে তৎকালীন সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাদেরকে একটি কলেজ বাস উপহার দেন এবং পরে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর করা হয়। ১৯৮৯ সালে ছাত্রদলের জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হওয়ার পর ১৯৯০-এর স্বৈরাচর বিরোধী আন্দোলনের সময় চাঁদপুর শহরে প্রচুর দেয়াল লিখন করেছি। তখন আমি, আমার সহপাঠী শাহজালাল মিশন, আব্দুল আজিজ, গিয়াস উদ্দিন, শামীমসহ তৎকালীন সভাপতি সেলিমসহ রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহরে এ কাজগুলো করেছি। দেয়াল লিখার সময় একদিন রাতে সন্ত্রাসীরা আমাকে আদালত পাড়ায় ছুরিকাহত করে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় অ্যাড. হারুনের নেতৃত্বে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল চাঁদপুর শহরে বের হয়, যা জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
উল্লেখ্য, ব্যক্তি জীবনে নজরুল ইসলাম ফারুক ৩ মেয়ে ১ ছেলের জনক। বড়ো মেয়ে এমএ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত, ছোট দুই মেয়ে যমজ নাবিলা-মেঘলা হাজীগঞ্জ মডেল কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে চাঁদপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়ছে। সবার ছোট ছেলে মেহেদী ইসলাম বায়েজীদ কোরআনে হাফেজ।
চার সন্তানের জনক নজরুল ইসলাম ফারুকের আকুতি এইখানে যে, যে দলের রাজনীতি করতে গিয়ে জীবন হয়েছে দুর্বিষহ, প্রতিবন্ধিত্বের কারণে বেকারত্ব হয়েছে অনিবার্য, সে দলের এখন সুসময়। এ সুসময়ে তিনি কি পেতে পারেন না রাষ্ট্রীয় কোনো সহযোগিতা, যাতে তার শ্রবণ প্রতিবন্ধিত্ব দূর হয় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতায় তিনি যেনো কর্মজীবী হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। এজন্যে তিনি চাঁদপুর-৩ আসনের এমপি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এমপি মহোদয়ের কৃপা দৃষ্টিতে বদলে যেতে পারে তাঁর জীবন। তাঁর সন্তানদের হতে পারে কর্মসংস্থান সহ আরো কতো কী।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








