প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০০:০০
চাহিদার বিপরীতে মিলছে অর্ধেক বিদ্যুৎ
গরমে অতিষ্ঠ গ্রাহকরা, রাতের অন্ধকারে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা

তীব্র গরম আর অসহনীয় লোডশেডিংয়ের যুগপৎ চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চাঁদপুরের পাঁচটি উপজেলার জনজীবন। গত এক মাস ধরে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন এলাকাগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। দিন-রাতের দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ গ্রাহকরা।
|আরো খবর
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্রে জানা গেছে, হাইমচর, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার মোট ৪ লাখ ৫০ হাজার ১২০ জন গ্রাহক বর্তমানে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলমান তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়েনি। বর্তমানে দিনে প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে রাতের বেলায় চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ মেগাওয়াটে, যেখানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন গড়ে ৩০ মেগাওয়াটেরও বেশি ঘাটতি থাকছে।
চাঁদপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ মূলত রামগঞ্জ, চাঁদপুর ও কচুয়া গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ঘাটতির কারণে এসব গ্রিড থেকেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জন ২০২৬) চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রয়োজন প্রায় ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট। প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না। সব এলাকায় প্রায় সমানভাবে লোডশেডিং বণ্টন করা হচ্ছে। মূলত জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী ইউনুস আলী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাই, সেটিই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিতরণ করি। কোনো এলাকাকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় না। তবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, তাপমাত্রা কমে গেলে এবং বৃষ্টিপাত বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে, ফলে পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো অনেকাংশে গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো চাঁদপুরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও।
এদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। অনেক এলাকায় রাতে টানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমহীন রাত কাটাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, অনলাইনভিত্তিক কাজ এবং গৃহস্থালির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। অনেক এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ এখন ‘বিদ্যুৎ কখন যাবে’ সেই চিন্তা নয়, বরং ‘বিদ্যুৎ কখন আসবে’ সেই অপেক্ষায় দিন পার করছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ১৯টি অফিসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আবহাওয়া অনুকূলে এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কর্মকর্তারা।
তবে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় গরমের এই মৌসুমে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।







