শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০১:৫৯

স্থানীয় সরকার নির্বাচন : নাগরিক ভাবনা-৩

দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না

........... নুরুন্নবী চৌধুরী

চাঁদপুর কন্ঠ রিপোর্ট
দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুন্নবী চৌধুরী (হাছিব)। দৈনিক প্রথম আলোতে দীর্ঘ ১২ বছর তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞানসহ নানান বিষয়ে লিখেছেন এবং ডিজিটালে বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল ভয়েসেসে’ নিয়মিত লিখছেন। তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক ৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ১৮টি দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা/সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন।

ফরিদগঞ্জের এই কৃতীসন্তানের বেড়ে উঠা ফরিদগঞ্জ এবং চাঁদপুরের মাটিতে। দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের শিশুকণ্ঠ হলো তাঁর লেখালেখির আঁতুড় ঘর। ‘নাগরিক ভাবনা’ বিষয়ক কথোপকথনে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরই বন্ধু নুরুল ইসলাম ফরহাদের

চাঁদপুর কণ্ঠ : অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

নুরুন্নবী চৌধুরী : বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা মোটামুটি মিশ্র, where ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুদিকই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ভোটের দিন মানুষ পরিবারসহ ভোটকেন্দ্রে যায়, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হয় এবং সামাজিকভাবে একটি মিলনমেলার আবহ তৈরি হয়। চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এই চিত্র প্রায়ই দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ আগ্রহ নিয়ে ভোট দিতে আসে। তবে এই ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে প্রভাব খাটানো, জোরপূর্বক ভোট আদায় কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়, তখন স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা বেড়ে যায়। কিছু এলাকায় অতীতে ভোটকে ঘিরে এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে।

আরেকটি বিষয় হলো, সব ভোটার তাদের ভোটাধিকার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করে। তবে এর মাঝেও ভালো উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীরা মানুষের আস্থা অর্জন করে নির্বাচিত হয়েছেন এবং পরে এলাকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সব মিলিয়ে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, এটিকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজন।

চাঁদপুর কণ্ঠ : স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় না দলীয় কোনটি আপনার পছন্দ?

নুরুন্নবী চৌধুরী : আমার দৃষ্টিতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়াই অধিক উপযোগী ও কার্যকর হতে পারে। কারণ স্থানীয় সরকার মূলত মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত; যেমন-রাস্তাঘাট, পানি নিষ্কাশন, health সেবা, শিক্ষা এবং স্থানীয় উন্নয়ন। এসব বিষয়ে কাজ করার জন্যে একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা ও নেতৃত্বগুণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, দলীয় পরিচয় নয়। দলীয় প্রতীক থাকলে অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনে এসে পড়ে। এতে করে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা আড়ালে পড়ে যায় এবং ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

অনেক এলাকায় দেখা গেছে, অনেক যোগ্য ও সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি দলীয় সমর্থন না পাওয়ায় নির্বাচনে পিছিয়ে পড়েন। এছাড়া দলীয় নির্বাচন অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে বিভাজন সৃষ্টি করে। একটি ছোট এলাকায় যখন জাতীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসে, তখন সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নির্দলীয় নির্বাচন হলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং প্রার্থীরা নিজেদের কাজ ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে জনগণের সমর্থন অর্জন করতে পারেন। তবে নির্দলীয় নির্বাচন সফল করতে হলে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, কারণ অনেক সময় গোপনে দলীয় প্রভাব কাজ করে। নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলে নির্দলীয় নির্বাচন আরও কার্যকর হতে পারে। এতে স্থানীয় নেতৃত্ব আরও জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি।

চাঁদপুর কণ্ঠ : নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বা কাকে আপনি দেখতে চান?

নুরুন্নবী চৌধুরী : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমি এমন প্রার্থী দেখতে চাই, যিনি সৎ, দায়িত্বশীল এবং জনগণের সমস্যার প্রতি আন্তরিকভাবে সংবেদনশীল। একজন ভালো প্রার্থী শুধু নির্বাচনের সময় সক্রিয় থাকবেন না বরং সারা বছর জনগণের পাশে থাকবেন এবং তাদের সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন।

প্রথমত, প্রার্থীর সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। দ্বিতীয়ত, প্রার্থীর শিক্ষাগত ও বাস্তব জ্ঞান থাকা জরুরি, যাতে তিনি এলাকার সমস্যাগুলো বুঝে কার্যকর সমাধান দিতে পারেন। চাঁদপুর জেলার ক্ষেত্রে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, কৃষি ও অবকাঠামোগত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে যিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দিতে পারেন, তাকে এগিয়ে রাখা উচিত। তৃতীয়ত, একজন প্রার্থীর মানুষের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকতে হবে। তিনি যেন সহজে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেন। এছাড়া সহনশীলতা ও ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা থাকা খুব জরুরি, কারণ স্থানীয় সরকারে কাজ করতে হলে সবাইকে নিয়ে এগোতে হয়। তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুন চিন্তা ও উদ্যম নিয়ে আসে, যা স্থানীয় উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

চাঁদপুর কণ্ঠ : স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আপনার নিজস্ব কোনো অভিমত থাকলে বলতে পারেন।

নুরুন্নবী চৌধুরী : আমার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। তারা যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ভোটের দিন যেন কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি বা অনিয়ম না ঘটে, সেজন্যে প্রশাসনকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত অর্থব্যয় অনেক সময় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নষ্ট করে এবং অযোগ্য প্রার্থীদেরও এগিয়ে নিয়ে আসে। এজন্যে প্রার্থীদের ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা উচিত। চতুর্থত, ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। মানুষ যেন বুঝে ভোট দিতে পারে, দেয় এবং ব্যক্তিগত লাভ বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করে। এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে, যেমন ডিজিটাল ভোটার তালিকা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা। সব মিলিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই স্থানীয় উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনি কি মনে করেন রাজনীতি সঠিক পথে এগুচ্ছে?

নুরুন্নবী চৌধুরী : বাংলাদেশের রাজনীতি সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না এটি একটি জটিল প্রশ্ন, যার উত্তর একপাক্ষিকভাবে দেওয়া কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

ইতিবাচক দিক হলো, দেশে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়েছে, যেমন অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং ডিজিটাল সেবার প্রসার। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদপুর জেলার ক্ষেত্রেও কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে।

তবে অন্যদিকে রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল, যা গণতন্ত্রের জন্যে ভালো নয়। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা এসব বিষয় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ মূলত শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন চায়। যদি রাজনীতি এই মৌলিক চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দেয় এবং জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে বলা যাবে রাজনীতি সঠিক পথে এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে রাজনীতিকে আরও ইতিবাচক পথে নিতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়