প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৭
রাবেয়া বেগমের নীরব বিপ্লব কি রাজনীতির মোড় ঘোরাবে?
একটি ভোট, হাজারো প্রশ্ন!
১৭ বছরের ভোটাধিকার হরণের নীরব প্রতিবাদ অসুস্থ শরীর নিয়েও কেন্দ্রে রাবেয়া বেগম, গণতন্ত্রের এক জীবন্ত দলিল!

গণতন্ত্রের ইতিহাসে কিছু ঘটনা থাকে, যা কোনো স্লোগান ছাড়াই হাজারো ভাষণের চেয়ে বেশি কথা বলে। চাঁদপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাবেয়া বেগমের ভোট দিতে যাওয়া ঠিক তেমনই এক নীরব কিন্তু গভীর প্রতিবাদ। টানা ১৭ বছর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, অসুস্থ ও শয্যাশায়ী শরীর নিয়েও তিনি হাজির হন ভোটকেন্দ্রে—শুধু একটি ভোট দিতে নয়, বরং কেড়ে নেওয়া অধিকার ফিরে পাওয়ার সাক্ষ্য দিতে।
|আরো খবর
১৭ বছরের বঞ্চনা: ভোটকেন্দ্র ছিল দূরের স্বপ্ন
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের পর থেকে রাবেয়া বেগম আর কখনও স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পারেননি। একের পর এক জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন হলেও তার মতো সাধারণ ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রের দরজা যেন অলিখিতভাবে বন্ধই ছিল।
কখনও শুনেছেন—“ভোট হয়ে গেছে”, কখনও বা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই ভয়ভীতি, দখল আর অরাজকতার খবর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বাড়ির পথে। এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা শুধু একটি নাগরিক অধিকার হরণের গল্প নয়, বরং একটি প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
অসুস্থ শরীর, কিন্তু অদম্য ইচ্ছা
বর্তমানে রাবেয়া বেগম গুরুতর অসুস্থ। কথাবার্তা স্পষ্ট নয়, হাঁটার শক্তিও নেই। তবু তার মনে জমে থাকা আক্ষেপ মুছে যায়নি।
চাঁদপুর জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা কর্মী নয়ন মনি যখন তাকে দেখতে যান, তখনই সামনে আসে এই দৃঢ় মানসিকতার গল্প।
নয়ন মনি আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেন—
“শরীর খুব খারাপ ছিল ওনার। কিন্তু ভোটের কথা বলতেই চোখে আলাদা একটা আলো দেখা গেল। হাতের ইশারায় বললেন—ভোট দিতে যাবেন। অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু বললেন, ‘১৭ বছর ভোট দিতে পারি নাই। এবার শেষবার ধানের শীষে একটা ভোট দিতে চাই।’ তখন বুঝলাম, এটা শুধু রাজনীতি না—এটা ওনার জীবনের শেষ ইচ্ছা।”
পাঁজাকোলা করে কেন্দ্রে: একটি দৃশ্য, বহু প্রশ্ন
নয়ন মনি ও তার সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন—এই ইচ্ছা অপূর্ণ রাখা যাবে না। পাঁজাকোলা করে রাবেয়া বেগমকে নিয়ে যাওয়া হয় চাঁদপুর-৩ আসনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে।
ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত মানুষজন কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়ে যান। অসুস্থ শরীর, কাঁপা হাত—সবকিছুকে হার মানিয়ে ব্যালট পেপারে সিল দেওয়ার মুহূর্তে রাবেয়া বেগমের চোখে ছিল এক ধরনের বিজয়ের প্রশান্তি।
এটি ছিল শুধু একটি ভোট নয়। এটি ছিল ১৭ বছরের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ কিন্তু প্রবল প্রতিবাদ—যা কোনো মিছিল ছাড়াই রাজনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
গণতন্ত্রের জন্য কঠিন প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, রাবেয়া বেগমের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তোলে—কতজন রাবেয়া বেগম আজও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত? কতজন অসুস্থ, দুর্বল, নিরীহ নাগরিক শুধুমাত্র পরিবেশের কারণে কেন্দ্রে যেতে পারেন না?
তাদের মতে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিন ব্যালট বাক্স বসালেই পূর্ণতা পায় না; গণতন্ত্র বাঁচে তখনই, যখন রাবেয়া বেগমের মতো মানুষ ভয় ছাড়া, বাধা ছাড়া ভোট দিতে পারেন।
মানবিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত
এলাকাবাসীর একাংশ নয়ন মনি ও তার সহকর্মীদের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ের এমন মানবিক উদ্যোগই রাজনীতিকে আবার মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
রাবেয়া বেগমের সেই কাঁপা হাতে দেওয়া একটি ভোট হয়তো ফলাফল বদলায়নি। কিন্তু এটি ইতিহাসে থেকে যাবে—গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানো এক অসুস্থ বৃদ্ধার নীরব সাহসের সাক্ষ্য হিসেবে।
ডিসিকে/এমজেডএইচ








