প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৩
সিদ্ধান্ত নাকি নীরবতা?

প্রশ্নটা পড়তেই কি আপনি হোঁচট খেয়ে পড়বেন, নাকি হাস্যকরভাবে এড়িয়ে যাবেন? কিন্তু আর কত দিন, বাপু? এটা তো বাবা-মায়ের হোটেল নয়, এটা একটা দেশ। এই ভূখণ্ডে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বসবাস। তারা সংসদে ৩৫০ জন প্রতিনিধি পাঠিয়েছে দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে, ভেলকি দেখার জন্য নয়। আমি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কথা বলছি। হচ্ছেটা কী?
দেশটা ধ্বংস হয়েছে আগেই, সেটা আমি জানি। কিন্তু আপনারা কী করছেন, সেটা কি ভাবার সময় হয়েছে; নাকি এখনো লুটপাট, ক্ষমতার হিসাব আর নিজেদের অবস্থান শক্ত করার কাজেই ব্যস্ত? আমার এই লেখা পড়ে আপনাদের মেজাজ খারাপ হতে পারে। হয়তো ভাববেন, কীভাবে আমাকে দমন করা যায়, কীভাবে আমাকে থামানো যায়। কিন্তু না, সে চেষ্টা করার কোনো দরকার নেই। কারণ, আমি আপনাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুর্নীতি, অনীতি, চাঁদাবাজি কিংবা সন্ত্রাস আমার সঙ্গে বসবাস করে না। অতএব, আমার পেছনে সময় নষ্ট না করে বরং নিজেদের নিয়ে ভাবুন। বাকি সময়টা দেশের জন্য ব্যয় করুন। জানি না খুব ভালো কিছু করতে পারবেন কি না, তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?
একটা দরিদ্র দেশ যখন অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে দেখছে। সাধারণ মানুষ বাজারের দাম, জ্বালানি, চাকরি, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; অথচ রাষ্ট্রের বড় বড় ব্যয়, ক্ষমতার প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যেন থামছেই না। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হবে, উন্নয়ন হবে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হবে, রাষ্ট্রের আধুনিকায়নও হবে—কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের অগ্রাধিকার কোথায়?
যে দেশের মানুষের জীবনে নিত্যদিনের সংগ্রাম, সে দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতিটি টাকার হিসাব জানার অধিকার জনগণের আছে। বিমান কেনা হবে, অস্ত্র কেনা হবে, বড় প্রকল্প হবে, প্রশাসনিক ব্যয় হবে—সবই হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে জানতে হবে, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো। একজন কৃষক কী পেলেন, একজন শ্রমিক কী পেলেন, একজন বেকার তরুণ কী পেলেন, একজন রোগী হাসপাতাল থেকে কী পেলেন, একজন শিক্ষার্থী তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী হলো?আর সংসদ? সংসদ কি শুধু আইন পাস করার জায়গা? সংসদ তো সরকারের জবাবদিহির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ৩৫০ জন প্রতিনিধি যদি জনগণের হয়ে কথা বলেন, তাহলে জনগণের প্রশ্ন সংসদে উঠবে না কেন? প্রশাসন কী করছে, আইনশৃঙ্খলা কোথায় দাঁড়িয়ে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সাংবাদিকেরা নিরাপদে কাজ করতে পারছেন কি না—এসব প্রশ্ন সংসদে উঠতেই হবে। সংসদ কোনো নাট্যমঞ্চ নয়, আর জনগণও কোনো দর্শক নয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি পুলিশকে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন। কথাগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা বক্তব্যে নয়, বাস্তবে। রাজনৈতিক পরিচয় যদি সত্যিই বিবেচ্য না হয়, তাহলে যে দলেরই হোক, যে পরিবারেরই হোক, যে প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক—অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।
কারণ, অপরাধী বিএনপির হলেও তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না, অন্য দলের হলেও দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না। আইনের শাসনের অর্থই হলো ক্ষমতাবান এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য আইনের মানদণ্ড এক হওয়া।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, ৫৬ জন নিহত এবং ৫,২৪৬ জন আহত হওয়ার তথ্য এসেছে। একই প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছে, একটি পরিবার আছে, একটি জীবন আছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা শুধু একজন সাংবাদিককে আঘাত করা নয়, এটি মানুষের জানার অধিকারকেও আঘাত করে। সাংবাদিক যদি সত্য লিখতে ভয় পান, তাহলে নাগরিক কীভাবে সত্য জানবে? আর নাগরিক যদি সত্য না জানে, তাহলে গণতন্ত্র কীভাবে জবাবদিহিমূলক হবে?
আর তারেক রহমানের কথা বলতেই হয়। কারণ, তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতার দায়িত্বে। তাঁর অতীত, দীর্ঘ বিদেশবাস, দেশে ফিরে রাজনৈতিক উত্থান এবং বর্তমান রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নিয়ে মানুষের নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি ও অর্থপাচারসহ মামলা ও দণ্ডের ইতিহাস ছিল; পরবর্তী সময়ে আদালতের বিভিন্ন রায়ে তিনি খালাস পেয়েছেন বা আগের দণ্ড বাতিল হয়েছে। তাই আজকের প্রশ্নটি আরও পরিষ্কার হওয়া দরকার : ক্ষমতায় এসে তিনি কী করছেন? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করছেন? জনগণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষিত অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে? এসব প্রশ্ন করা কোনো অপরাধ নয়; বরং গণতন্ত্রে এগুলো নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার।
আরও একটি কথা খুব পরিষ্কার করে বলা দরকার। শিক্ষিত মানুষ মানেই সৎ মানুষ নয়। ডিগ্রি থাকলেই বিবেক তৈরি হয় না। রাষ্ট্রের বড় পদে বসতে পারলেই চরিত্র বড় হয় না। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে, সুন্দর ভাষায় কথা বলতে পারে, স্যুট পরে বড় গাড়িতে চলতে পারে, ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করতে পারে—অথচ একই সঙ্গে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত থাকতে পারে। এরা গাধা নয়, বোকাও নয়। অনেক সময় এরা অত্যন্ত চালাক, শিয়ালের মতো ধূর্ত। তাই দুর্নীতিকে দুর্নীতি বলতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, চাঁদাবাজিকে চাঁদাবাজি বলতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। অপরাধীকে অপরাধী বলার সাহস না থাকাই বরং সমাজের জন্য বড় বিপদ।
তবে ব্যক্তিআক্রমণ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এক জিনিস নয়। একজন মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহজ, কিন্তু একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বদলানো কঠিন। আমাদের সেই কঠিন কাজটাই করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবের বাইরে আনতে হবে, পুলিশকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রেখে কাজ করতে দিতে হবে এবং সংসদকে সত্যিকারের জবাবদিহির জায়গায় পরিণত করতে হবে।
দেশ কোনো পরিবারের সম্পত্তি নয়। দেশ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। দেশ কোনো নেতার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। দেশ জনগণের। জনগণ সরকার বানায়, জনগণ কর দেয়, জনগণ রাষ্ট্র চালানোর খরচ বহন করে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণই প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দেয়। তাই জনগণ প্রশ্ন করবে, প্রশ্ন করতেই থাকবে।
যাঁরা আজ ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের মনে রাখা দরকার—ক্ষমতা কোনো রাজমুকুট নয়, ক্ষমতা একটি দায়িত্ব। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্মান বা পরিবারের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য নয়, জনগণের জীবনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য। জনগণ যদি পেটে খাবার না পায়, যদি চাকরি না পায়, যদি চিকিৎসা না পায়, যদি নিরাপত্তা না পায়, যদি সত্য কথা বলতে ভয় পায়—তাহলে শুধু বড় বড় রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না।
তাই আমার প্রশ্ন খুব সরল : আপনারা কি সিদ্ধান্ত নেবেন, নাকি নীরব থাকবেন? কারণ, নীরবতাও একধরনের সিদ্ধান্ত। সমস্যা দেখে চুপ থাকা সিদ্ধান্ত, অন্যায় দেখে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি দেখে চোখ বন্ধ রাখা সিদ্ধান্ত, চাঁদাবাজি দেখে মুখ বন্ধ রাখা সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে নিশ্চুপ থাকাও সিদ্ধান্ত।
কিন্তু জনগণ আর শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকতে চায় না। একটি দেশ যখন সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন নাগরিকদের কাছে শুধু ধৈর্য চাইলেই হবে না; তাদের সামনে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর রাষ্ট্রের বাস্তব প্রমাণও দিতে হবে।
তাই আর কত দিন? কত দিন জনগণ অপেক্ষা করবে? কত দিন প্রশ্নের বদলে স্লোগান শুনবে? কত দিন জবাবদিহির বদলে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা শুনবে? কত দিন একজনের অপরাধ অন্যজনের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ঢেকে রাখা হবে?
আর কত দিন?
সিদ্ধান্ত নাকি নীরবতা?
এখন সময় সিদ্ধান্তের। রাষ্ট্রকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিন। আইনকে সবার জন্য সমান করুন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করুন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের ব্যবস্থা নিন। সাংবাদিককে নিরাপদে কাজ করতে দিন। সংসদকে জবাবদিহির জায়গা বানান। আর জনগণকে মনে রাখুন।
কারণ, জনগণ ভুলে যায় না; ইতিহাসও ভুলে যায় না।
আমি কাউকে ভয় দেখাচ্ছি না, আমি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চাইছি না, আমি কোনো রাজনৈতিক পদ চাইছি না। আমি শুধু বলছি—কথা বলুন, প্রশ্ন করুন, জবাব দিন। রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের সামনে দাঁড় করান।
চুপ করে থাকলে ইতিহাস একদিন আমাদের সবাইকে প্রশ্ন করবে।
তাই আসুন কথা বলি, আসুন প্রশ্ন করি, আসুন রাস্তায় নামি নাগরিকের অধিকার, জবাবদিহি ও একটি মানুষের উপযোগী রাষ্ট্রের দাবিতে।
Lets speak up and hit the road together, কারণ দেশটা আমাদের সবার।
রহমান মৃধা : গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। [email protected]






